Published : 21 Jul 2026, 09:42 PM
যৌনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিজেদের একান্ত মুহূর্তগুলো কীভাবে কাটাবেন, তা সম্পূর্ণ তাঁদের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। এই ব্যক্তিগত পরিসরে অন্য কারও অনধিকার প্রবেশ করা, উঁকিঝুঁকি দেওয়া বা কারও গোপন মুহূর্ত জনসমক্ষে নিয়ে আসা কেবল নীতিগতভাবেই অনুচিত নয়, বরং এটি ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল- যা একটি সুস্পষ্ট অপরাধ। রাষ্ট্র, সমাজ বা অন্য কোনো ব্যক্তির বিন্দুমাত্র অধিকার নেই কারও শোবার ঘরে অনাহূতভাবে ঢুকে বিচারকের আসনে বসার। প্রতিটি নাগরিকের এই গোপনীয়তা এবং যৌন স্বাধীনতার অধিকার সমাজ ও আইন-- উভয় ক্ষেত্রেই নিঃশর্তভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গোপনীয়তার এই অধিকার একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম ভিত্তি। তবে এই স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি নিয়ে কথা বলা আজ অত্যন্ত জরুরি।
কারণ, এখানে প্রশ্নটি কেবল একজন ব্যক্তির একান্ত মুহূর্তের নয়, বরং প্রশ্নটি ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতি-নৈতিকতার দ্বিমুখী রূপ এবং একজন জনপ্রতিনিধির চরম দ্বিচারিতার। গাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং দেশের সংসদের একজন আইনপ্রণেতা। যিনি এমন একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের রাজনীতির অন্যতম ভিত্তিই হলো ধর্মের নামে অন্যের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা। কথা বলা আরও জরুরি হয়ে ওঠে যখন সেখানে যুক্ত হয় রাজনৈতিক মিথ্যাচার ও ধামাচাপা দেওয়ার নগ্ন অপচেষ্টা।
একজন তরুণীর সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যাওয়ার পর কীভাবে একের পর এক অসত্য ও খোঁড়া অজুহাতের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা লক্ষণীয়। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই জামায়াতের স্থানীয় মিডিয়া সেল দাবি করে বসে, এটি নাকি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা এআই দিয়ে তৈরি করা একটি ভুয়া ভিডিও। যখন স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী (ফ্যাক্ট-চেকিং) প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিল ভিডিওটি সম্পূর্ণ আসল এবং এতে এআই প্রযুক্তির কোনো কারসাজি নেই, তখন দলটির বয়ান এক নিমেষে বদলে যায়। এবার জামায়াত নেতারা সুর বদলে দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী নাকি এমপির ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’! একই ঘটনায় প্রথমে প্রযুক্তির ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা এবং পরবর্তীতে তা ব্যর্থ হয়ে তাড়াহুড়ো করে 'দ্বিতীয় স্ত্রী'র বয়ান দাঁড় করানো--এটির মধ্যে কোনো নৈতিকতা নেই, আছে কেবল রাজনৈতিক দায় এড়ানোর এক দেউলিয়া প্রয়াস।

হিয়েরোনিমাস বোস্চস-এর চিত্রকর্ম
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া ১৮ বছর বয়সী সেই তরুণীর বায়োডাটাতে নিজেকে ‘অবিবাহিত’ বলেই উল্লেখ করা ছিল। আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো- সিসিটিভি ফুটেজের টাইমস্ট্যাম্প। সিসিটিভি ফুটেজে থাকা টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ভিডিওটি ২০২৩ সালের ১০ জুলাই ধারণ করা হয়েছিল। যদি এই তথ্য সত্যি হয়ে থাকে, ফুটেজটি যদি ২০২৩ সালের ১০ জুলাই ধারণ করা হয়ে থাকে এবং তরুণীটির বয়স যদি বর্তমানে ১৮ বছর ২ মাস হয়, তবে হিসাব অনুযায়ী ঘটনার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছরের কাছাকাছি। অর্থাৎ, তিনি তখন ছিলেন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী। দেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অনুযায়ী, একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের কোনো আইনি সম্মতি (Legal Consent) দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। ফলে এটিকে কোনোভাবেই 'পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ক' বা 'ব্যক্তিগত স্বাধীনতা' বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এটি একটি সুস্পষ্ট আইনি অপরাধ, যাকে আইনি ভাষায় 'স্ট্যাটিউটরি রেপ' (Statutory Rape) বলা হয়। যারা সমাজকে নৈতিকতা ও ধর্মের সবক দেন, তাদের একজন শীর্ষ জনপ্রতিনিধির দ্বারা এমন একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়া এবং পরবর্তীতে দলটির পক্ষ থেকে সেটিকে তড়িঘড়ি করে একবার এআই আবার 'দ্বিতীয় স্ত্রী' বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা কেবল দ্বিচারিতাই নয়, বরং একটি সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার নগ্ন চক্রান্ত।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিনিয়ত দেশে নিজেদের মতো করে নিয়ম-কানুন ও ধর্মীয় শাসন কায়েমের কথা বলে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে নারীদের চলাফেরা, পোশাক, স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্তের ওপর নানা ধরনের ফতোয়া ও ধর্মীয় শৃঙ্খল চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তাদের দীর্ঘদিনের। সাধারণ নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে যারা সদা তৎপর, নিজেদের দলের নেতাদের ক্ষেত্রে তাদের সেই তথাকথিত 'নৈতিকতার মাপকাঠি' কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
যিনি একজন জনপ্রতিনিধি ও আইনপ্রণেতা, তিনি যখন এমন দ্বিমুখী আচরণ করেন, তখন একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে--এদের হাতে কখনো দেশের ভার পড়লে রাষ্ট্রের পরিণতি কী হবে?
যারা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে প্রকাশ্যে মিথ্যা বলতে পারেন এবং ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারেন, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেলে তারা আইনকে নিজেদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষের জন্য তখন কোনো বিচার থাকবে না।
জনসম্মুখে যারা নারীদের পোশাক আশাক, জীবন যাপন কেমন হবে ঠিক করে দেন, তারা যে ক্ষমতায় এলে নারীদের শিক্ষা এবং ন্যূনতম অধিকার সম্পূর্ণভাবে হরণ করবেন তা বলাই বাহুল্য।
ব্যক্তি স্বাধীনতা ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন অধিকার সর্বদাই সম্মানযোগ্য এবং এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু যারা সারাজীবন অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, বিশেষ করে নারীদের স্বাধীনতার ওপর নিয়ম-নীতির পাহারা বসাতে চাওয়া যে-রাজনৈতিক দলগুলো আছে, তারা নিজেরা কতটা দ্বিমুখী নীতি লালন করে, ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতার রাজনীতি করে- তাদের এই নগ্ন দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি জনসমক্ষে তুলে ধরাটাও সমানভাবে জরুরি। জামায়াতের এই নেতার ভাইরাল ভিডিওর আলোচ্য ও নিন্দনীয় বিষয় তার যৌন জীবন নয় বরং তার দ্বিচারিতা, মিথ্যা এবং কুৎসিত মানসিকতা। এই দ্বিমুখী নীতি ও ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল রূপ সম্পর্কে সমাজ সচেতন না হলে, একটি প্রগতিশীল ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠন কখনোই সম্ভব নয়।