Published : 28 Dec 2025, 08:42 PM
ঘুম ভেঙে দেখি আমি মেঝেতে পড়ে আছি। খাট থেকে কখন পড়ে গেছি টের পাইনি। বুকের ভেতর পাঁজর ভাঙার মতো একটা শব্দ ক্রমাগত বেজে চলেছে। এই শব্দ কি আমার ভেতরকার, নাকি বাইরে ঝম ঝম বৃষ্টি যে পড়েছে, সেই শব্দ?
জানালা দিয়ে তাকালে মনে হয় আকাশ একটা বিশাল ধূসর চাদর, যার নিচে আমরা সবাই চাপা পড়ে আছি। বৃষ্টি থামবার কোনো লক্ষণ নেই। শীতকালে এমন বৃষ্টি এই জন্মে আমি আর দেখিনি। এই বৃষ্টি কি কোনোদিন থামবে? নাকি এই বৃষ্টিই আমাদের রক্ত আর অশ্রু, আর মেঘ হল ঘনীভূত দুধ? আমি জানি না।
আমার নাম রাত্রি। যদিও এই নামের কোনো অর্থ এখন আর নেই। নামের অর্থ থাকে ততদিন, যতদিন মানুষ তার নিজেকে অন্যের মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখে, অন্যের মুখে নিজের নামের ডাক শুনতে পায়। এখন আমি একা, কিংবা হয়তো একা নই। আমার সঙ্গে রেণু আছে, যে একটা আধমরা গাছের সঙ্গে কথা বলে, আর আছে নির্ঝর, যে নেই, অথচ সবখানেই আছে।
মেঝের হিমশীতল স্পর্শ আমার পিঠে। মনে হচ্ছে আমি যেন এক অনন্তকাল ধরে এই মেঝেতে শুয়ে আছি, আর সময় বৃত্তাকারে ঘুরছে। যা কিছু ঘটছে, তা আগেও ঘটেছে আর ভবিষ্যতেও ঠিক এভাবেই ঘটবে। এই ব্যথা, এই পড়ে থাকা, এই বৃষ্টি সবই এক অমোঘ চক্র। আমি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করি। শরীরে এক অদ্ভুত ভারী ভাব। যেন আমার পিঠে কোনো ডানার ভার নেই, বেদনা হয়ে আছে।
আমি উড়তে চেয়েছি। কিন্তু আমি উড়তে পারি না। যদি উড়তে পারতাম! আহা, যদি উড়তে পারতাম! তাতে কী? আমার তেমন কোনো দুঃখ নেই না উড়তে পারার। আমি তো জানি, যারা ওড়ে তারা মাটি চেনে না। আর যারা মাটিতে থাকে, তারা আকাশ চেনে না। আমি এই দুয়ের মাঝখানে ঝুলে থাকা এক প্রজাতি। এক অস্তিত্বহীন সংযোগ, যার এক প্রান্ত পশুত্বের দিকে, অন্য প্রান্ত যথা-অর্থে মনুষ্যত্বের দিকে, কিন্তু আমি আটকে আছি মধ্যখানে।
দরজা খোলার শব্দ হয়। রেণু। সে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। তার হাতে এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি। রেণুর চোখের নিচে কালশিটে দাগ, যেন কেউ জোর করে কাজল লেপটে দিয়েছে। রেণু আমার বোন নয়, বন্ধুও নয়, কেউই নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় সে আমারই একটা ছায়া, যে আমার থেকে একটু বেশি বাস্তববাদী, আবার আমার থেকেও বেশি পাগল। সে সেই সত্তা, যে জানে জীবন আসলে অর্থহীন, তবু সে একটা অর্থ তৈরি করতে চায় জোর করে।
রেণু বলে, ‘গাছটা আর বাঁচবে না রে, রাত্রি।’
‘কোন গাছটা?’
‘নিমগাছটা! টবের মধ্যে যেটা আমি আর আরিফ মিলে লাগিয়েছিলাম।’
রেণুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অদ্ভুত। আমরা একই বাড়িতে থাকি, কিন্তু আমাদের জগৎ আলাদা। রেণুর জগৎটা ওই টবের নিমগাছটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। নিমগাছ তো আর লেবু গাছ নয়, একদিন বড়ো হতে গিয়ে এই গাছ মরে যাবে, এ আমি আগেই জানতাম, রেণুও জানতো। কিন্তু মানুষ সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। মানুষ চায় সুন্দর মিথ্যে, চায় রূপকথা।
আমি উঠে বসি। কফির মগটা হাতে নিলাম। তিতা স্বাদ। জীবনের মতোই। এই কারণে আমি এসপ্রেসোই খাই।
‘রেণু,’ আমি বললাম, ‘তুই কি জানিস, আমরা যা কিছু ভালোবাসি, তা আমাদের ধ্বংস করবার ক্ষমতা রাখে? তুই নিমগাছটাকে ভালোবাসিস, তাই ওটার মৃত্যু তোকে মারছে।’
রেণু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার দৃষ্টিতে শূন্যতা, যেন সে কোনো অতল গহ্বরের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সেই গহ্বরও পালটা তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে বলে, ‘জানিস, আমাদের ত্বকের থেকে আমাদের পরনের কাপড়ের ওজন বেশি!’
আমি অবাক হয়ে তাকাই, ‘মানে?’
রেণু হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। আমি তাকাই টবের নিমগাছটার দিকে। পাতাগুলি কেমন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। যেন পৃথিবী তার সকল সবুজ হারিয়ে ফেলেছে।
রেণুর এই অদ্ভুত কথা আমাকে ভাবায়। ত্বকের চেয়ে পরনের কাপড়ের ওজন বেশি, কারণ ত্বক আমাদের জন্মগত, ওটা আমাদের সত্তা। আর কাপড় হল সমাজের নিয়ম, নৈতিকতা, সম্পর্ক, আর লোকলজ্জার ভয়। আমরা জীবনভর এই কাপড়ের ভার বইতে বইতে নুয়ে পড়ি, কুঁজো হয়ে যাই। রেণু আর আরিফের সম্পর্কটাও তেমন। ভালোবাসার ত্বক খসে গেছে অনেক আগেই, এখন শুধু পড়ে আছে সম্পর্কের ভারী কাপড়।
বিকেলবেলা। বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমেছে, কিন্তু আকাশ এখনো ভার হয়ে আছে। আমি আমার পুরোনো ডায়েরিটা খুলে বসি। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের ওপর প্রতিটি অক্ষর যেন সময়ের সাক্ষী। সেই দিনের কথা মনে পড়লে আমার হাসি পায়, ভাবি হাঁসপাখির কথা, ভাবি হাসতে হাসতে হাঁস হয়ে যাই, ইতিহাস হয়ে যায়, কিংবা হয়ে যাই অনেতিহাস। পরক্ষণেই তা বিষাদের এক গভীর রেখায় মিলিয়ে যায়। এই স্মৃতি যেন এক চুনী পাথর, ঝলমলে অথচ ঠাণ্ডা, যার আলোয় আজও আমার এই জীবন মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে, আর তার প্রতিটি স্নায়ুতে বাজে এক তীব্র বিষণ্ণতার সুর।
তেইশ বছর আগে নির্ঝরের ফোনে পাঠানো প্রথম চিঠি মানে টেক্সট মেসেজটা আমার পুরোনো ডায়েরির পাতায় আজও সযত্নে লিখে রাখা আছে‘তোমাদের ঘরখানি জানালায় বাঁধা, জানালায় বসে থাকো একা একা রাধা’।
সেই সময় আমরা ফোনে পাঠানো মেসেজকে চিঠি বলতাম, আমাদের তখন নোকিয়া ১১০০ মডেলের মোবাইল ফোন সেট ছিল, দুজনেরই। আমারটার রং স্কাই ব্লু, আর নির্ঝরেরটা কালো। আমি নির্ঝরের সব মেসেজ ডায়েরিতে লিখে রাখতাম। যখন যা পাঠাত, সে গভীর রাতে টেক্সট দিত, ‘ঘুম যাও’। আমি ডায়েরিতে ‘ঘুম যাও’, এই কথাটা লিখে রাতভর জেগে থাকতাম। নির্ঝর আর আমার মাঝখানে পথের দূরত্ব ছিল দুইশো একাত্তর কিলোমিটার।
নির্ঝর। নামটা মনে হতেই আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কেবল প্রেমের ছিল না, ছিল স্নেহ ও মমতার। মানুষ যখন নিজেকে দুর্বল ভাবে, তখন সে আশ্রয় খোঁজে। আর যখন সে নিজেকে শক্তিক্ষম ভাবে, তখন সে আশ্রয় দিতে চায়। নির্ঝর ছিল সেই শক্তি, বা হয়তো সে সেই শক্তির অভিনয় করত।
নির্ঝর প্রায়শই আমাকে বলত, ‘আমি তো তোমার মায়ের মতোই। আমার মা মরে যাবার পর আমিই সকলের মা হয়ে গেছি। তোমারও যেহেতু মা নেই, আমিই তোমার মা।’ কথাগুলি আমার মনে এক গভীর আশ্রয় তৈরি করত, যে আশ্রয় আমি আমার নিজের মায়ের কাছ থেকেও পাইনি।
কিন্তু এই আশ্রয়ই ছিল আমার কারাগার। যে আমাদের রক্ষা করে, সে-ই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্বলরা সবসময় সবলের দয়ায় বাঁচতে চায়, আর সবলরা সেই দয়া দেখিয়ে নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করে। নির্ঝরের এই মায়ের মতো ভালোবাসাও ছিল একার্থে ক্ষমতারই খেলা।
সেদিন বিকেলে বারান্দায় বসে ছিলাম। সেদিনও বৃষ্টি নামছিল, বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছিল আমার মুখে, চোখে। হঠাৎ মনে হল, বৃষ্টিটা শুধু জল নয়, ওটা আকাশ থেকে ঝরে পড়া পুরোনো কথা। ওরা ছাতা মাথায় সেজে থাকে বৃষ্টির দেবতা। কারা ওরা? কারা সেইসব মুখোশ পরে ভেংচি কাটে মহাকাশকে? কে আমি? কাকে লিখি বৃষ্টি? কাকে আঁকি ঝাপসা চোখে বনের মধে্য দেখে ফিরে ভাবি শরতের শাদা কাশবন? ভাবি কাশবনে পাশাপাশি বসে করি একসঙ্গে খাই তিন জন্মের চুমু। আর তখনই ঘৃণাজীবী শ্বাপদেরা এসে কাশবনে আগুন লাগিয়ে দেয়।
নির্ঝর বলত, ‘কাশবন সে আর এমন কী? এরা একদিন আকাশের মেঘে মেঘেও আগুন ধরিয়ে দেব।’তারপর চুপ করে থাকত, নৈঃশব্দ্যের ভেতর লুকিয়ে ফুরিয়ে যেতে চাইত।
আমাদের পৃথিবী ছাই হয়ে গেছে। নির্ঝর চলে গেছে উনিশ বছর আগে। আমরা পরস্পর অধিকার অনুভব করেছিলাম। একটি ধূসর ও তুচ্ছ হাওয়ার শরীর আমাদের দেখছিল অবাক হয়ে। আমরা পরস্পর শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসেবে চিরন্তন। একটি তারে প্রাণ দুলছিল, কোথাও ছিন্নতারের বীণায়, আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের নিভে যাওয়া আলোতে দৈবক্রমে আমিই ফুরিয়ে যাওয়া শেষ সত্য গান। এই গান অনেক দূরাগত। এবং অপর।
আরিফের কথা বলি। সে রেণুর প্রাক্তন। এখন তারা দুজন দুটি মৃত গ্রহের মতো একই কক্ষপথে ঘুরছে, কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারছে না। তারা ভেবেছিল তাদের সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখছে টবের নিমগাছটা। প্রতিদিন দুজন একসঙ্গে গাছটায় পানি দেবে, যত্ন করবে। নিমগাছটা যেন তাদের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠবে। কিন্তু হয়নি কিছুই।
বসবার ঘরে আরিফ রেণুর হাত ধরবার চেষ্টা করে, ‘রেণু, রেণু, রেণু!’ আরিফ ব্যাকুল হয়ে আছে। তার এই ব্যাকুলতা দেখলে করুণা হয়। সে জানে না, যা ভেঙে গেছে তা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করার চেয়ে ভাঙা টুকরোগুলির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো। দুর্বলরাই কেবল পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
রেণু কেবল শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল, কিছু বলল না। হাতও ছাড়িয়ে নিল না। সে জানত, কিছু সম্পর্ক কেবল অভ্যাসের কারণে টিকে থাকে, ভালোবাসার কারণে নয়। তারা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, যা প্রতিদিন একটু একটু করে আলগা হচ্ছে।
রেণু আরিফের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকায় জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে। তারপর বলে, ‘রিফ, আমরা কি আসলে গাছটাকে বাঁচাতে চাইছি? নাকি আমরা ভয় পাচ্ছি যে গাছটা মরে গেলে আমাদের আর কথা বলবার কোনো বিষয় থাকবে না?’

চিত্রকর্ম: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
আরিফ চুপ করে গেল। সত্য মাঝে মাঝে অসুন্দর, অপ্রিয়। এবং সত্যকে সহ্য করবার ক্ষমতা সবার থাকে না। আরিফ সেই মানুষ, যে সত্যের মুখোমুখি হবার চেয়ে মিথ্যের আরামদায়ক চাদরে ঘুমাতে পছন্দ করে।
রাত গভীর হল। বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আমি আমার ঘরে। হঠাৎ কোথা থেকে একটা গান বেজে ওঠে,‘...বয়ে চলে আঁধি আর রাত্রি...’ লো ভলিউমেও বাজে। কিন্তু মনে হয় আমার কান ফেটে যাবে। আমার ঘুম পায়। গানের অত্যাচারে ভেঙে যাই আমি আটষট্টি হাজার বর্গমাইল। প্রিয়তম ঘুম, তুমি গানের ভলিউম একটু কমাবে? সাপের কান দেখা যায়। আমি নদী বা সমুদ্র কোনোটা আঁকতে পছন্দ করি না। তারপরও কখনো-সখনো আঁকা লাগে। চিহ্নের রূপ বিমূর্ত হলেই দৃষ্টিনন্দন। এই গানটা কোত্থেকে আসছে? এটা কি আমার মাথার ভেতরের কোনো শব্দ? আমি উঠে দাঁড়াই। মনে হল পাশের ঘরে কেউ কথা বলছে। পা টিপে টিপে পাশের ঘরের দরজায় দাঁড়ালাম। আবছা নীল আলোয় ঘরটা ভাসছে। নির্ঝর! এইসব নীলাভ আলোয় ওর দৃষ্টির রং আমি ধরতে পারছি না। সে জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘এসো...’ আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। নাকি এটা আমারই ভ্রম? নির্ঝর তো নেই। উনিশ বছর ধরে সে নেই। তবে কি আমি সময়ের কোনো ফাটলে আটকা পড়ে গেছি? যেখানে অতীত এবং বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে?
নির্ঝর বলত, ‘কুয়াশা সে তো প্রকৃতির চশমা। যখন পৃথিবী নিজেকে স্পষ্ট করে দেখতে চায় না, তখন সে কুয়াশা চোখে পরে।’ আজ রাতে পৃথিবী খুব ঘন কুয়াশার চশমা পরেছে। আমিও পরেছি। আমরা কেউ কাউকে দেখতে চাই না। আমরা শুধু নিজেদের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই। তবে এই সবকিছুর ওপরে, আমার মনে সবথেকে বেশি করে বাজত নির্ঝরের শেষ চিঠিটা। সেই চিঠি কেবল তার প্রেমিকসত্তা নয়, এক মাতৃসুলভ স্নেহ আর মমতাকেও ফুটিয়ে তুলেছিল, যা আমাকে সবসময় আচ্ছন্ন করে রাখে। যদি নিজেকে একশ বছর পিছনে নিয়ে গিয়ে একটি গাছের শিকড়ের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম তবে পূর্ণরূপ অথবা সংহত অর্ধমৃত একটি মাছ এসে অস্ফুটচোখে বলে দিত ভবিতব্য! যদি জানতাম দীর্ঘশ্বাস মানে এইখানে স্বাস্থ্যসংগীত!
রাত কেটে ভোর হয়। কিন্তু ভোরের আলো ফোটে না। আকাশ মেঘে ঢাকা। রেণু দেখে নিমগাছের পাতাগুলি হলুদ হয়ে গেছে, ডালপালা শুকিয়ে গেছে, যেন পৃথিবী তার সকল সবুজ হারিয়ে ফেলেছে। এই দৃশ্য ভীষণ শান্ত। কোনো চিৎকার নেই, কোনো কান্না নেই। বেদনা যখন তার চূড়ান্ত রূপে আসে, তখন তা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কোনো নাটকীয়তা নয়, কোনো বিচ্ছেদ গান নয়। শুধু এক শান্ত সকাল, যেখানে একটি মৃত গাছের পাশে দুজন মানুষের পথ ভিন্ন হয়ে যায়। রেণু দরজা খুলে বেরিয়ে যায়, তার পিছু পিছু উড়বে ধুলোবালি আর কিছু পুরনো স্মৃতির টুকরো। আরিফ তাকিয়ে থাকে মরে যাওয়া নিমগাছটার, যেটা তাদের সম্পর্কের শেষ চিহ্ন। আর আকাশের মেঘেরা সেই নীরবতার সাক্ষী হয়ে ভেসে যাবে অনন্তের পথে, যেন এক দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে বাতাসের প্রতিটি কণায়।
আমি জানালায় দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখি। আরিফ বসে আছে মাথা নিচু করে। রেণু চলে যাচ্ছে। সে একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। রেণু জানে, যা মৃত, তাকে পেছনে ফেলেই এগিয়ে যেতে হয়। মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে হাঁটার নাম জীবন নয়। জীবন হল নিজেকে বারবার অতিক্রম করে যাওয়া। ধ্বংসের মাধ্যমেই নতুনের সৃষ্টি হয়। আজ রেণুর সম্পর্ক শেষ হল, হয়তো এর মাধ্যমেই সে তার নিজেকে খুঁজে পাবে।
রেণু চলে যাবার পর বাড়িটা আরও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরিফ কতক্ষণ ছিল জানি না। একসময় সেও চলে গেল। আমি একা। এই বিশাল, স্যাঁতসেঁতে বাড়িতে আমি একা। বৃষ্টি ঝরছে, ঝমঝম, ঝমঝম, ঝমঝম। অবিশ্রাম। এই বৃষ্টি কি কোনোদিন থামবে?
আমার খুব ক্লান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে আমি আবার মেঝের ওপর শুয়ে পড়ি। এইসব ভাবনা আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়, এক অদৃশ্য শেকলে বেঁধে রাখে। আমি জানি না আমি কে। আমি কি রাত্রি? নাকি আমি রেণুর ফেলে যাওয়া কোনো দীর্ঘশ্বাস? নাকি ডায়েরির কোনো মৃত অক্ষর? আমার কানে আবার সেই গানটা বাজছে। অনেক দূরাগত। এবং অপর। মানুষের জীবনটা আসলে একটা বৃত্ত। আমরা যেখান থেকে শুরু করি, সেখানেই ফিরে আসি। এই একাকিত্ব, এই হাহাকার নতুন কিছু নয়। এইসব আগেও ছিল, এখনও আছে, পরেও থাকবে। এবং আমাকে এই কষ্ট বারবার ভোগ করতে হবে। যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তুমি কি এই জীবনটাকেই, এই কষ্টগুলিকেই আবারও, অসংখ্যবার যাপন করতে চাও?’ তবে আমার উত্তর কী হবে?
আমি জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে দিই। বৃষ্টির ফোঁটা আমার হাতে পড়ে। ঠান্ডা। আমি বিড়বিড় করে বলি, ‘হয়, আমি চাই। বারংবার চাই।’
বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে, মেঝের ওপর পড়ে থেকে, আমি আমার ভবিতব্যকে আলিঙ্গন করি মনে মনে, তীব্র আলিঙ্গনে ভেঙে তাকে চুমু খাই, চুমু খাই। কেননা আমি উড়তে পারি না। উড়তে পারি না বলেই মাটির খুব কাছের গানগুলি শুনতে পাই। মাটির নিচে যে হাড়গোড় চাপা পড়ে আছে, তাদের গান।
বৃষ্টি পড়ছে। জানালার বাইরে কুয়াশা। কুয়াশা হল প্রকৃতির চশমা, নির্ঝর বলত। আর আমি সেই চশমার কাচের ওপর জমে থাকা এক বিন্দু জল, ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু স্বচ্ছ।