Published : 13 Jul 2026, 11:53 PM
‘বনের ভেতরের চেনা পথটি চলতে চলতে হঠাৎ গহিন বনের না-হাঁটা পথে গিয়ে থমকে যায়। এটাই কাঠুরিয়াদের পথ, যেখানে বাইরের পথ শেষ হয়ে গেলেও ভেতরের চিন্তা সচল থাকে।’ —Martin Heidegger, Preface, Off the Beaten Track
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমে ব্যাডেন-ওয়ার্টেমবার্গ রাজ্যের ব্ল্যাক ফরেস্টের Schwarzwald পাহাড়ে অবস্থিত টডনাউবার্গ একটি মনোরম ও শান্ত পাহাড়ি গ্রাম। এখানেই ১৯২২ সালে হাইডেগার একটি ছোট কাঠের কুঁড়েঘর বানিয়ে নেন, যা পরবর্তীতে জার্মান ভাষায় ‘Die Hütte’ নামে পরিচিতি পায়।
টডনাউবার্গের এই ঘরটি হাইডেগারের কাছে কেবল ছুটি কাটাবার জায়গা ছিল না। আধুনিক শহরের যান্ত্রিকতা, কোলাহল ও অস্বকীয় জীবনযাপন থেকে দূরে সরে এসে, প্রকৃতির একদম কাছাকাছি থেকে জীবনের স্বকীয়তা খুঁজবার এক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল এই বন-পাহাড়ের ঘর।
সেই বছর হাইডেগারের স্ত্রী এলফ্রিডে হাইডেগার টডনাউবার্গে একটি ছোটো জমি কেনেন। এই জায়গা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৭৭৩ ফিট ওপরে। ব্ল্যাক ফরেস্টের এই জায়গাটি ছিল অত্যন্ত দুর্গম, শান্ত এবং চারপাশের উপত্যকার এক বিশাল দৃশ্য এখান থেকে দেখা যেত। শুরুতে এই ঘরে কোনো বিদ্যুৎ বা কলের পানির ব্যবস্থা ছিল না। পানি আনতে হত বাইরের একটি কুয়ো থেকে, আর রাতের বেলা ভরসা ছিল কেবল হারিকেন। শীতকালে পুরো এলাকা বরফে ঢাকা পড়ে যেত, আর প্রবল তুষারঝড়ের সময় ঘরটি যেন বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।

হাইডেগার তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার কর্মমুখর সময়, প্রথমে মারবুর্গ এবং পরে ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুযোগ ও অবসর পেলেই এই কুঁড়েঘরে একপ্রকার পালিয়েই আসতেন। শহরের জীবনের কৃত্রিমতা তাকে হাঁপিয়ে তুলত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সত্যিকারের মৌলিক চিন্তা শহরের কোলাহলে বা আরামদায়ক ঘরে বসে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃতির রুক্ষতা ও নির্জনতা। অ্যাডাম শার (Adam Sharr) তার ‘Heidegger's Hut’ (২০০৬) বইয়ে খুব নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে এই কুঁড়েঘরের সাধারণ স্থাপত্য এবং এর চারপাশের পরিবেশ হাইডেগারের মনস্তত্ত্ব আর দার্শনিক লেখালিখিকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল। শার লিখেছেন, কুঁড়েঘরের জানালা দিয়ে আসা আলো, কাঠের মেঝের শব্দ, এবং বাইরের হাওয়ার শব্দ ইত্যাকার সবই হাইডেগারের অস্তিত্ববাদী চিন্তার কাঁচামাল হিসেবে কাজ করেছিল।
হাইডেগার তাঁর ‘Being and Time’ (Sein und Zeit) বইটির বেশিরভাগই লিখেছিলেন এই কুঁড়েঘরে বসে। পাহাড়, কৃষক সমাজ, আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আদিম সংগ্রাম তাকে ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ (Dasein)-এর ধারণাটি পরিষ্কার করতে সাহায্য করেছিল। শহরে মানুষ যন্ত্রের মতো বাঁচে, সেখানে সে ‘লোকসত্তা’ (Das Man)-এর ভিড়ে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ব্ল্যাক ফরেস্টের ওই কুঁড়েঘরে মানুষ বাধ্য হয় প্রকৃতির মুখোমুখি হতে। কাঠ কাটা, কুয়ো থেকে পানি তোলা, শীতের রাতে আগুন জ্বালানো, এই প্রাত্যহিক ও সাধারণ কাজগুলির মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের সত্তা বা অস্তিত্বের সবথেকে কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে তিনি মনে করতেন।
১৯৩৪ সালে লেখা একটি ছোট গদ্য ‘Why Do We Remain in the Provinces?’-এ হাইডেগার তার এই কুঁড়েঘর এবং এর চারপাশের পরিবেশের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার দার্শনিক কাজ এই পরিবেশ এবং এর মানুষদের সঙ্গে এক নিবিড় আত্মীয়তায় আবদ্ধ। এই কাজটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে এখানকার মাটির গভীরে প্রোথিত শেকড়ের ওপর... যখন আমি পাহাড়ি ঝড়ের রাতে কুঁড়েঘরের ভেতরে বসে থাকি, যখন প্রবল বাতাস ঘরের দেয়ালগুলি কাঁপায়, তখন কেবল দর্শনের জন্ম হয় না, দর্শন নিজেই যেন এই প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাইডেগারের চিন্তায় পরিবর্তন আসে (Die Kehre)। এই সময়ে তিনি প্রযুক্তির আগ্রাসন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েন। টডনাউবার্গের গ্রামীণ জীবন তাকে আধুনিক প্রযুক্তির ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি মনে করতেন, আধুনিক প্রযুক্তি প্রকৃতিকে কেবল একটি ‘অপেক্ষমাণ মজুদ’ হিসেবে দেখে, যাকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে লাভ অর্জন করা যায়। এর বিপরীতে তিনি ‘বসবাস করা’ (Wohnen)-এর ধারণাটি সামনে নিয়ে আসেন। তার প্রবন্ধ ‘Building Dwelling Thinking’ (১৯৫১)-এ তিনি বলেন, কেবল একটি বাড়ি তৈরি করলেই সেখানে বাস করা হয় না। প্রকৃত বাস করা হল পৃথিবীর বুকে যত্নশীল হয়ে থাকা, প্রকৃতিকে শোষণ না করে তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা। কুঁড়েঘরটি ছিল এই একাত্মতার এক মূর্ত প্রতীক। সেখানে তিনি কৃষকসুলভ পোশাক পরতেন, স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে সাধারণ ভাষায় কথা বলতেন, এবং নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবীর বদলে ব্ল্যাক ফরেস্টের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ভাবতে ভালোবাসতেন।
টডনাউবার্গ হাইডেগারের কাছে ছিল আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। যখন পুরো বিশ্ব শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির নেশায় মত্ত, তখন হাইডেগার একটি কাঠের ঘরে বসে মনুষ্যসত্তার হারানো শেকড় খুঁজছিলেন।
টডনাউবার্গ ও হাইডেগারের এই শেকড় সন্ধানের গল্পের একটি অত্যন্ত অন্ধকার আর বিতর্কিত দিক রয়েছে, যা এড়িয়ে গেলে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মাটির প্রতি, শেকড়ের প্রতি এবং জার্মান কৃষকদের প্রতি হাইডেগারের এই যে ভালোবাসা, এটাই তাকে ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টির দিকে আকৃষ্ট করেছিল।
নাৎসিদের একটি প্রধান মতাদর্শ ছিল ‘রক্ত ও মাটি’ (Blut und Boden)। তারা প্রচার করত যে, সত্যিকারের জার্মান সত্তা শহরের ইহুদি বা মহানগরের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নেই, তা লুকিয়ে আছে জার্মানির গ্রামের কৃষকদের খাঁটি রক্তে ও মাটিতে। হাইডেগারের টডনাউবার্গের জীবনযাপন ও মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকবার দর্শন নাৎসিদের এই মতাদর্শের সঙ্গে খুব সহজেই মিশে গিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, জার্মানিকে আধুনিকতার অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে পারে কেবল এই ‘শেকড়বদ্ধতা’ (Bodenständigkeit)।
যদিও পরে হাইডেগার নাৎসিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কখনোই ইহুদি নিধন নিয়ে জনসমক্ষে স্পষ্ট কোনো ক্ষমা চাননি বা এর নিন্দা করেননি। তার এই নীরবতা এবং নাৎসিদের সঙ্গে তার শুরুর দিকের সম্পৃক্ততা ওই শান্ত কুঁড়েঘরের ওপর কালি মেখে দিয়েছিল।

টডনাউবার্গের ঘরে আবেগময় একটা ঘটনা ঘটে ১৯৬৭ সালের ২৪ জুলাই। এইদিন হাইডেগারের ওই ঘরে বেড়াতে আসেন ইহুদি কবি পাউল সেলান (Paul Celan)। সেলান ছিলেন ইহুদি নিধনের পর টিকে থাকাদের একজন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তিনি তার বাবা-মা দুজনকে হারিয়েছিলেন। তার কবিতা ‘Todesfuge’ হলকাস্টের ভয়াবহতা নিয়ে লেখা। আর হাইডেগার ছিলেন সেই মানুষ, যিনি একসময় নাৎসিদের সমর্থন করেছিলেন এবং কখনোই তার জন্য ক্ষমা চাননি। সেলান হাইডেগারের দর্শনের গভীর অনুরাগী ছিলেন, কিন্তু তার অতীত নিয়ে তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগতেন। ফ্রাইবুর্গে একটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানের পর হাইডেগার নিজে সেলানকে তার টডনাউবার্গের কুঁড়েঘরে আমন্ত্রণ জানান।
এই সাক্ষাৎটি ছিল অত্যন্ত প্রতীক্ষিত। সেলান আশা করেছিলেন, অন্তত ব্যক্তিগত আলাপে এই নির্জন কুঁড়েঘরে বসে হাইডেগার তার অতীতের ভুলের জন্য একটি অনুতাপের শব্দ উচ্চারণ করবেন। তারা দুজনে ব্ল্যাক ফরেস্টের ভেজা ঘাস এবং পাহাড়ি পথে একসঙ্গে হেঁটেছিলেন। কুঁড়েঘরের গেস্টবুকে সেলান একটি মন্তব্য লিখেছিলেন। পরে সেই মন্তব্য তিনি তার একটা কবিতায় মধ্যে রেখেছিলেন। কবিতার নাম ‘টডনাউবার্গ’। কবিতায় তিনি কুঁড়েঘরের ভেতরের কুয়ো, বনের পথ, এবং তার অপূর্ণ আশার কথা মর্মান্তিকভাবে ফুটিয়ে তোলেন। কবিতাটি এইখানে রাখলাম:
‘আরনিকা, আমার চোখের স্বস্তি,
কুয়োর ওপর তারায় বোনা সেই পাথুরে ছক্কা,
সেই কুঁড়েঘরের ভেতর—
অতিথি খাতায় যার নাম আজ লেখা হল—
কার নাম লেখা হয়েছিল সেখানে আগে?
সেই খাতায় লেখা হয়েছিল একটা পঙক্তি:
আজকের দিনে, এক আশাবাদী মানুষের মনে
এক চিন্তকের বুকের ভেতর থেকে আসা
একটি শব্দের প্রত্যাশা,
বনের সেই আঁকাবাকা বন্ধুর পথ, জলাশয়,
স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা, অনেক পরে—
গাড়ি এসে দাঁড়াল, পরিষ্কার হয়ে এল সব।
তারপরে যখন হাঁটছিলাম আমরা দুজন,
পাহাড়ি পথে, তখনো কানে বেজে যাচ্ছিল
এক না বলা কথার অনুরণন।’
কবিতাটিতে সেলান হাইডেগারের কাছে একটি শব্দের প্রতীক্ষায় ছিলেন, হয়তো একটি ক্ষমা বা নাৎসি আমলের ভয়াবহতা নিয়ে কোনো একটি স্বীকারোক্তি। কিন্তু সেই শব্দটি শেষ পর্যন্ত আসেনি। ‘আর্নিকা’ এক ধরনের ঔষধি ফুল যা ক্ষত সারায় বা ‘কুয়োর ওপর নক্ষত্র’ ইত্যাকার চিত্রকল্পের মাধ্যমে সেলান একটি নিরাময়ের খোঁজ করছিলেন। নাৎসিদের সেই ‘রক্ত ও মাটি’ বা ‘শেকড়বদ্ধতা’র যে দর্শন হেইডেগার একসময় লালন করতেন, সেই পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়িয়েই একজন ইহুদি কবি তাঁর কাছে সত্যের সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু কবির ভাষায়, শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া গেল তা হল কেবল ‘স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা’ এবং একরাশ নীরবতা। কবিতাটি সেলানের চিরাচরিত ভাঙা ভাঙা ছন্দে লেখা, যা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের এক গভীর ক্ষত এবং মানুষের নৈতিক ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে।
১৯৭৬ সালে হাইডেগারের মৃত্যুর পর টডনাউবার্গের কুঁড়েঘরটি তার পরিবারের সদস্যদের কাছেই থেকে যায়। এটি আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটি এক শতাব্দী আগে ছিল। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনের ছাত্র, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ ব্ল্যাক ফরেস্টের এই জায়গাটিতে যান। তারা দেখতে চান কোথায় বসে বিশ শতকের সবথেকে জটিল ও গভীর চিন্তার জন্ম হয়েছিল।
মানুষের চিন্তাধারা শূন্য থেকে আসে না। একটি নির্দিষ্ট স্থান, তার মাটি, তার জলবায়ু, তার নির্জনতা কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে রূপ দেয়, হাইডেগারের কুঁড়েঘর তার উদাহরণ। আধুনিক যুগে, যখন মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভার্চুয়াল জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে, তখন টডনাউবার্গ থেকে উৎসারিত হাইডেগারের সেই ডাক, ‘মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়া’ এবং ‘প্রকৃত অর্থে বাস করতে শেখা’, আজকের দিনের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
টডনাউবার্গ হল আলো ও অন্ধকারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ, এটি এমন এক স্থান যেখানে মানবসত্তার গভীরতম উপলব্ধিগুলি যেমন জন্ম নিয়েছিল, তেমনি মানব ইতিহাসের অন্যতম নীরব অপরাধবোধও সেই কাঠের দেয়ালগুলির মধ্যেই চাপা পড়ে আছে।
টডনাউবার্গের রুক্ষ প্রকৃতিতে, ব্ল্যাক ফরেস্টের কনকনে শীতে ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ বাধ্য হয় তার নিজের নশ্বরতা ও প্রকৃতির অসীম শক্তির মুখোমুখি হতে। হাইডেগার যখন ওই কুঁড়েঘরে থাকতেন, তখন তিনি কোনো বিমূর্ত দার্শনিক চিন্তা নিয়ে বসে থাকতেন না। তাকে নিজের হাতে কাঠ কাটতে হত, কুয়ো থেকে বরফশীতল পানি তুলতে হত, হারিকেন জ্বালাতে হত। এই প্রাত্যহিক ও শারীরিক কাজগুলির মাধ্যমেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ মানে কেবল ‘চিন্তা করা’ নয়, এর অর্থ ‘জগতের মধ্যে থাকা’।
‘Dasein’ বা ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’র ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে হাইডেগার ‘Being and Time’ বইয়ে দুটো জার্মান পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, যা টডনাউবার্গের জীবন থেকে সরাসরি উঠে এসেছে। একটি হল ‘Zuhandenheit’ বা ‘হাতের-সঙ্গে-থাকা’ এবং অন্যটি ‘Vorhandenheit’ বা ‘হাতের-সামনে-থাকা’। টডনাউবার্গের কুঁড়েঘরে শীতের রাতে আগুন জ্বালাবার জন্য হাইডেগার যখন কুঠার দিয়ে কাঠ কাটতেন, তখন তিনি কুঠারটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে এর ওজন, রং বা রাসায়নিক গঠন নিয়ে ভাবতেন না। কুঠারটি তখন তার নিজের শরীরেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠত, তার কাঠ কাটার লক্ষ্যের সঙ্গে মিশে যেত। কোনো জিনিসের এই যে আমাদের কাজের সঙ্গে মিশে থাকা এবং আমাদের কাছে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠা, এটাই হল ‘Zuhandenheit’। কিন্তু কাঠ কাটতে কাটতে যদি হঠাৎ কুঠারের হাতলটি ভেঙে যায়? তখন হাইডেগারের মনোযোগ হঠাৎ করে সেই ভাঙা কুঠারটির ওপর গিয়ে পড়বে। তখন সেটি আর কেবল একটি ব্যবহার্য হাতিয়ার থাকে না, সেটি একটি ‘বস্তু’তে পরিণত হয়, যা তার কাজের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। বস্তুর এই আলাদা হয়ে সামনে এসে পড়াই হল ‘Vorhandenheit’। হাইডেগার বোঝালেন, পাশ্চাত্য দর্শন সবসময় পৃথিবীকে একটি কুঠারের মতো দূর থেকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ বা মানুষের প্রকৃত অস্তিত্ব হল ওই কাঠুরে, যে হাতুড়ি বা কুঠার দিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে অবিশ্রাম কাজ করে যাচ্ছে। টডনাউবার্গের ওই বনপাহাড়ের কৃষকদের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনযাপন তাকে এই গভীর বাস্তবতার শিক্ষা দিয়েছিল।

‘সেখানে-থাকা-সত্তা’র একটি বড়ো সংকট হল এর ‘পতন’। হাইডেগার বলেন, মানুষ যখন সমাজে বাস করে, তখন সে খুব সহজেই ‘লোকসত্তা’ (Das Man) বা ‘নৈর্ব্যক্তিক সমাজ’-এর ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। এই ‘লোকসত্তা’ হল সমাজের সেই অদৃশ্য নিয়ম, লোকেরা যা করে আমরাও তা-ই করি, লোকেরা যা ভাবে আমরাও তা-ই ভাবি। শহরের জীবনে মানুষ পরনিন্দা, আড্ডা, আর অর্থহীন খবর, যাকে হাইডেগার ‘অচল কথা’ (Gerede) বলেছেন, তার মধ্যে ডুবে থাকে। ফলে ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ তার স্বকীয় অস্তিত্বের কথা ভুলে গিয়ে একটি কৃত্রিম জীবন কাটায়, যাকে তিনি বলেছেন অস্বকীয় অস্তিত্ব। টডনাউবার্গের কুঁড়েঘর ছিল এই ‘লোকসত্তা’র ভিড় থেকে হাইডেগারের পালানোর পথ। ব্ল্যাক ফরেস্টের গভীর নিস্তব্ধতার সুর ও একাকীত্ব তাকে সমাজের অর্থহীন কোলাহল থেকে দূরে রেখেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, নির্জনতায় মানুষ যখন নিজের মুখোমুখি হয়, কেবল তখনই সে তার জীবনের নিজস্ব অর্থ খুঁজে পায়। হাইডেগারের মতে, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে জানে তাকে একদিন মরতে হবে। শহরগুলিতে মৃত্যুকে সবসময় লুকিয়ে রাখা হয়, যেন মৃত্যু কেবল হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতরের একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু টডনাউবার্গের ওই দুর্গম পাহাড়ে, যেখানে প্রবল তুষারপাতে মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়তে পারে, সেখানে মানুষ তার নিজের নশ্বরতাকে অনেক তীব্রভাবে অনুভব করে। হাইডেগার যখন রাতে তার ঘরের জানালা দিয়ে অন্ধকার বনের দিকে তাকাতেন, তখন প্রকৃতির বিশালতার সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’ যখন সাহসের সঙ্গে নিজের মৃত্যুকে একটি অনিবার্য সত্য হিসেবে মেনে নেয়, কেবল তখনই সে তার বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তকে সবথেকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
‘সেখানে-থাকা-সত্তা’র সমগ্র অস্তিত্বের মূল নির্যাসকে হাইডেগার একটি মাত্র শব্দে প্রকাশ করেছেন, ‘Sorge’ বা ‘যত্ন। মানুষ কখনোই পৃথিবীর প্রতি উদাসীন থাকতে পারে না। আমরা সবসময় আমাদের চারপাশের পরিবেশ, আমাদের প্রিয়জন এবং আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি যত্নশীল ও উদ্বিগ্ন থাকি। টডনাউবার্গের কুঁড়েঘরটি ছিল হাইডেগারের এই ‘যত্ন’-এর মূর্ত প্রতীক। কাঠ জোগাড় করা, ঘর গরম রাখা, নিজের জন্য রান্না করা, এমনকি কুঁড়েঘরের কাছের পথ পরিষ্কার রাখা ইত্যাকার ব্যাপারই ছিল ‘সেখানে-থাকা-সত্তা’র ‘যত্ন’-এর ব্যাবহারিক রূপ। তিনি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করবার বদলে প্রকৃতির ছন্দে নিজেকে মানিয়ে নেবার যত্নশীল পদ্ধতিটি আয়ত্ত করেছিলেন এই পাহাড়ি জীবনেই।
তবে হাইডেগারের মতে, স্বকীয় অস্তিত্ব মানে পাহাড়ে গিয়ে সন্ন্যাস নেওয়া নয়। এটি হল প্রতিদিনের জীবনে বাস করেও এই সত্যটা মেনে নেওয়া যে, আমার জীবন একান্তই আমার, আমার মৃত্যুও একান্তই আমার। সমাজের ভিড়ে নিজেকে না হারিয়ে, প্রতিটি মুহূর্তের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়াই হল ‘স্বকীয় অস্তিত্ব’।