Published : 18 Oct 2025, 01:52 PM
এই লেখায় আমি কবিতাকে জ্যাক দেরিদার ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) অর্থাৎ ‘সৃজনশীল পুনর্বিন্যাস’-এর ধারণা দিয়ে বুঝবার একটা সহজ চেষ্টা নিতে যাচ্ছি।
কাঠামোবাদীরা মনে করত যে প্রতিটি ব্যবস্থা, তা ভাষা হোক, সমাজ হোক বা সাহিত্য সবই একটা কেন্দ্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই কেন্দ্রটি ছিল এক স্থির, মূল সত্য বা আদি উৎস যা সমস্ত অস্থিরতা বা পরিবর্তনকে বেঁধে রাখত। যেমন একটা শব্দের একটা নির্দিষ্ট অর্থ বা লেখকের একটা চূড়ান্ত কথা ইত্যাকার বিষয়ই ছিল সেই স্থিতিশীলতার কেন্দ্র। এই কেন্দ্র আমাদের মনের এক ধরনের আশ্বাস হিসেবে কাজ করত, যা অনিশ্চয়তার ভয় থেকে আমাদের বাঁচাত। কিন্তু দেরিদা দেখান যে এই কেন্দ্রটি কোনো প্রাকৃতিক সত্য নয়, এটা নিজেই ভাষার মাধ্যমে নির্মিত একটা বাসনার চক্র। যখন দেরিদার মতো উত্তর কাঠামোবাদী চিন্তকরা এই কেন্দ্রকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, তখন সেই কেন্দ্রটি ভেঙে যায়। একেই বলা হয় ‘কেন্দ্রচ্যুতি’ (Decentering). এই কেন্দ্রচ্যুতির ফলাফল যাকিছু মুক্ত করল তার মধ্যে কবিতাও রয়েছে।
কেন্দ্র ভেঙে গেলে শব্দের অর্থ আর কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির থাকে না। প্রতিটি শব্দ তখন অন্য শব্দের সঙ্গে এক অসীম ‘চিহ্নের খেলা’ (Play of the Sign)-এর মাঠে ঢুকে পড়ে। এই খেলার মাধ্যমেই কবিতা তার প্রথাগত দায় থেকে মুক্ত হয়। ধরুন, একটা সাধারণ গদ্যে 'আলো' মানে সূর্যের রশ্মি বা বিদ্যুতের বাতি, এর অর্থ স্থির ও সুনির্দিষ্ট। কিন্তু কবিতায় যখন বলা হয় যেমন জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় যখন বলেন,
‘আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;’
তখন তখন এই 'আলো' শব্দটা তার কেন্দ্রের বাঁধন ছেড়ে দিয়ে ‘স্বপ্ন’ বা ‘বোধ’-এর মতো, মতো একাধিক অর্থের দিকে ধাবিত হয়। এই বাক্যটিতে 'আলো' ও 'অন্ধকার' এই দুটি বিপরীতার্থক শব্দ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক নতুন রহস্যময় এক খেলার সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। পাঠক যার অর্থ খুঁজবার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেরিদা বলছেন যে, কোনো কিছুরই কোনো চূড়ান্ত অর্থ নেই, প্রতিটি পাঠ বা `লেখ’ (text)-ই এক নতুন অর্থ জন্ম দেয়। কবিতা হল সেই ক্ষেত্র, যা ভাষার এই বহুমুখী ব্যাখ্যাকে শুধু অনুমতিই দেয় না, বরং তাকে উৎসাহিত করে। এটা প্রমাণ করে যে ভাষার ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেবার মধ্যে নয়, বরং অসীমভাবে উন্মুক্ত থাকবার মধ্যেই নিহিত। এই পর্যায়ে এসে দেরিদার চিন্তাসাপেক্ষেই বলতে পারি, কেন্দ্রহীনতা কোনো শূন্যতা নয়, বরং এক আনন্দময় স্বীকৃতি। যারা পুরোনো সত্য বা কেন্দ্র হারিয়ে দুঃখ পান, তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কবিতা এই কেন্দ্রহীনতাকে এক সক্রিয়তা হিসেবে গ্রহণ করে। কবিতা কোনো হারানো সত্যের জন্য শোক করে না।
কবিতা বারবার নতুন শব্দ ও চিত্রকল্প তৈরি করে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে যে, জগতের কোনো স্থির বা অচল ভিত্তি নেই, সবকিছুই পরিবর্তনশীল ও চলমান। যেমন, কোনো কবি যখন দেরিদার উপর্যুক্ত চিন্তার মতোই প্রথাগত একটা ছন্দ বা উপমা বা রূপালঙ্কার নিয়ে আসেন, তখন তাদের একটা দৈনন্দিন ও অকাব্যিক প্রসঙ্গে বসিয়ে অর্থকে ভেঙে দেন। এইভাবেই ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) হয়। এই প্রক্রিয়াতেই কবিতার স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। কবিতা তার পাঠককে বলে যে, ‘স্থির সত্য বলে কিছু নেই, তাই তুমি যা খুঁজছ, তা আমার মধ্যে নেই, কিন্তু আমার এই খেলায় তুমি নিজেই নিজের সত্য তৈরি করতে পার’।
‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) কী? ধরুন, আপনি একটা নতুন গাড়ি বানাবেন। আপনি সব যন্ত্রাংশ কারখানায় আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করাবেন। এটা হল ইঞ্জিনিয়ারিং। এখানে সব কিছু নিখুঁত এবং দরকার অনুসারে তৈরি। দর্শনে এই ব্যাপারটা হল কোনো পরম সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। এইবার ধরুন, আপনার পুরোনো গাড়িটা একদম অচল হয়ে গেছে, যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। এখন আপনি নতুন কোনো যন্ত্রপাতি না কিনে, আপনার সেই অচল গাড়ি ও আশপাশে পড়ে থাকা ভাঙাচোরা গাড়ি থেকে যন্ত্রপাতি খুলে একটা নিয়ে নতুন আরেকটা গাড়ি তৈরি করছেন। এটাই হল ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage). এটা জোড়াতালি দেওয়া, কিন্তু কাজ চলে যায়। কিন্তু ব্রিকোলাজ শব্দটিও কেটে দিতে হবে, কেননা এর অর্থ আসে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ থেকে, এর পার্থক্যের কারণে। যেহেতু ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ পরম সত্যের ধারণা হিসেবে একটা মিথ্যা কল্পনা, তাই ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) শব্দেরও কোনো নির্দিষ্ট অর্থ থাকে না। এটাও তাই একইসঙ্গে ভুল ও দরকারি ।
দেরিদা বলেন, আমাদের জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়াটা আসলে ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, বরং ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage). আমাদের কাছে নতুন কোনো ‘নিখুঁত’ শব্দ বা ধারণা নেই। আমাদের যা আছে তা হল পুরোনো, প্রচলিত শব্দগুলি। আমরা এই পুরোনো শব্দগুলিকেই ব্যবহার করি এবং সেগুলিকে ‘কেটে দিই’ যেন সেগুলি নতুন করে আমাদের ভাবনাকে প্রকাশ করতে পারে।
কবিতা এমনই ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage). কবি নতুন শব্দ উদ্ভাবন বা উৎপাদন করেন না, বরং পুরোনো, প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দগুলিকেই কাজে লাগান। কিন্তু তিনি যখন শব্দগুলিকে এক নতুন বিন্যাসে সাজান, তখন তাদের জীর্ণ, প্রথাগত অর্থ মুছে যায়।
আমি মনে করি, কবিতা হল ভাষার চূড়ান্ত ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage). কবি ভাষার পুরোনো 'উপাদান' দিয়ে এমন এক নতুন কাঠামো তৈরি করেন যা আমাদের পরিচিত জগৎ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের আভাস দেয়। কবিতার এই উদ্ভাবনী শক্তি আসে কারণ এটা তার উপাদানগুলিকে সম্মান করেও, তাদের প্রথাগত অর্থকে অস্বীকার করে।
শুরুতেই বলেছি, কবিতা নস্টালজিক নয়। এটা কোনো হারানো সত্যের জন্য শোক করে না। কবিতা বরং সেই কেন্দ্র হারানোকে আনন্দ ও সক্রিয়তার সঙ্গে গ্রহণ করে। কবিতা চিহ্নের অসীম খেলার মধ্যে সাহস খুঁজে পায়। এই বিশ্ব যে স্থির কোনো সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে, কবিতা এই ধারণাকেই সমর্থন করে। কবিতা প্রশ্ন করে, ভাঙন ঘটায় এবং অবিরাম সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তার নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। কবিতা হল সেই বিশেষ ধরনের ভাষা যা স্থিতিশীলতা বা নিশ্চয়তাকে অস্বীকার করে। কবিতা একটা অন্তহীন খেলার মাঠ, যেখানে অর্থ ক্রমাগত সৃষ্টি ও লুপ্ত হয়। কবি এই খেলার প্রধান খেলোয়াড়, যিনি পুরোনো শব্দকে নতুন জীবন দিয়ে, ভাষাকে তার প্রথাগত শৃঙ্খলা থেকে মুক্তি দিয়ে, পাঠককে এক কেন্দ্রহীন, তবে আনন্দময় অভিজ্ঞতার দিকে ঠেলে দেন। এই কারণেই কবিতা কেবল সাহিত্য নয়, এটা আমাদের মহাবিশ্ব ও ভাষার প্রকৃতি নিয়ে করা একটা গভীর দার্শনিক প্রশ্ন।
কবি একটা শব্দকে তার প্রথাগত স্থান থেকে তুলে এনে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত নতুন এক প্রসঙ্গে স্থাপন করেন। শব্দটির পুরোনো ‘ব্যবহার’ অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু তার ‘অর্থ’ পালটে যায়। সাধারণ, প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দ, যেমন 'জল', 'দেয়াল', 'ঘড়ি' বা ‘চাবি’, অথবা কোনো বিজ্ঞাপনের কপি বা জিংগেল বা কোনো প্রবাদের অংশ। ধরুন, একটা দুধের বিজ্ঞাপনের কপি হল ‘সুস্থ ও সবল থাকবার সঠিক চাবি’, বিজ্ঞাপনটা হঠাৎ একদিন আমি আমার বইয়ের আলমারি গোছাতে গিয়ে আমি অনেক পুরোনো কোনো ম্যাগাজিনের ব্যাক কভারে দেখলাম, আর কপিটা পড়লাম। পড়ে অকারণেই আমার মাথার ভেতর কবিতার লাইন এল একটা। আমি খাতায় লিখলাম,
‘সুস্থ থাকবার একটাই চাবি ছিল,
তোমার স্পর্শের চাবি।
তারপর লিখলাম,
দেওয়াল ঘড়িটার পেণ্ডুলাম দোলে
এই দেখে দেখে জেনে যাই তুমি নেই’।
এখানে 'সুস্থ থাকবার চাবি' একটা পণ্যের পুরোনো বিপণন-বিজ্ঞাপণ সংক্রান্ত ধারণা। কিন্তু আমি এটাকে নিয়ে এসে ব্যক্তিগত হাহাকার বা স্মৃতির প্রসঙ্গে জুড়ে দিয়েছি। ফলে কপিটার সেই অংশটা তার প্রথাগত কার্যকারিতা অর্থাৎ বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য হারিয়ে এখন গভীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আবার কবি প্রথাগত ছন্দের একটা অংশকে তুলে নেন এবং হঠাৎ করে তা ভেঙে দেন। কেমন করে? যেমন ধরুন, আমি নিচের কবিতাটা লিখলাম,
ডুবে যায় সব তবু ভেসে থাকে কথা
পথের ধাঁধায় বাজে মলয় বাতাস
ডুবে যায় পাতালের ভাঁজে লুপ্ত ঘুম
পাহাড়ের ওষ্ঠাধরে সমুদ্রের তৃষা
স্বর্ণশিলা ডুবে যায় রোদনের বনে
এক রাত্রির দীর্ঘশ্বাস তার শিরায়
শিবরঞ্জনী পার হতে পারি না তাই
থেমে যায় আমাদের গান্ধর্ব বিবাহ
জীবাশ্মের গ্রামে তবু সানাই বিভোর
নদী খুঁটে থোক থোক ছায়া রচে মাছ
নদীর মাছ সমুদ্রে গেলে ছায়া হয়
এই মাছ জাদুকর সন্ধ্যার গোপন
ছায়ার দাগ দেখে মনে পড়ে অঘর
ট্রিনিটি তুমি সেই হিরণ্ময় পাথর।
এটি একটা চতুর্দশপদী কবিতা। এইখানে আমি প্রথাগত একটা ছন্দ ব্যবহার করেছি, ছন্দের নাম অক্ষরবৃত্ত। কিন্তু অক্ষর বৃত্তের একশভাগ নিয়ম আমি মান্য করিনি। কবিতার প্রথম পাঁচ লাইন আমি ঠিকঠাক লিখলেও ষষ্ঠ লাইন থেকে নিয়ম ভেঙেছি। ফলে নিচের লাইনগুলি নিখাদ অক্ষরবৃত্ত হয়নি,
এক রাত্রির দীর্ঘশ্বাস তার শিরায়
শিবরঞ্জনী পার হতে পারি না তাই
নদীর মাছ সমুদ্রে গেলে ছায়া হয়
ছায়ার দাগ দেখে মনে পড়ে অঘর
ট্রিনিটি তুমি সেই হিরণ্ময় পাথর।
কেন হয়নি? অক্ষরবৃত্তে শুধু সব মাত্রাসংখ্যা মিললেই হয় না। বেজোড় শব্দের পরে বেজোড়ে শব্দ রাখতে হয়, আর জোড় শব্দের সঙ্গে জোড় শব্দ রাখতে হয়। আর মূল পর্বগুলি হতে হয় ৮ মাত্রার। উপপর্বগুলি হতে হয় ২ থেকে ৬ মাত্রার। সেই হিসেবে এই কবিতা যেহেতু আমি ১৪ মাত্রায় লিখেছি ফলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হওয়া উচিত মূল পর্বে ৮ মাত্রা আর উপ পর্বে ৬ মাত্রা।
এই যে আমি প্রচলিত একটা ছন্দে লেখা শুরু করে ছন্দের নিয়ম লঙ্ঘন করলাম, মানে ভেঙে আবার আমার মতো করেই জুড়ে দিলাম, এটাই ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage).
এইভাবে কবি একটা কবিতা লিখতে গিয়ে শুরুতে সচেতনভাবে কবিতার একটা পুরোনো সরঞ্জাম যেমন ছন্দকে ব্যবহার করেন, কিন্তু পরের লাইনে বা কয়েক লাইন গিয়ে তাকে ভেঙে দিয়ে আবার নতুন করে জুড়ে দেন, যা একটা নতুন বিন্যাসই তৈরি করে। তখন সেই কবিতায় ঐতিহ্যগত ছন্দটা ভুল প্রয়োগ নয়, বরং নতুন অর্থবহনকারী একটা সরঞ্জাম হয়ে দাঁড়ায়।
এইবার পৌরাণিক উপাদান নিয়ে কবিতায় ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) করবার উপায় বুঝবার চেষ্টা নিই একটুখানি। এইটা বুঝবার জন্যে আমি এইখানে আমার একটা কবিতা ব্যবহার করব। এই কবিতা লিখেছিলাম, ১১ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে, তার মানে প্রায় কুড়ি বছর আগে। কবিতার নাম ‘প্রিয় ইকারুস’। কবিতাটা আছে ২০১৯ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত আমার কবিতার বই ‘উদ্ভিদ ও বৃন্দাবনী’-তে। কবিতা এমন,
ভোরের আকাশ নেমেছে হাওয়ার শরীরে। ছুঁয়ে গেছে তোমার মাথার উদাস দেবদারুর বন, চোখের ইঁদারা, আরাত্রি কম্পমান ওষ্ঠাধর, সঘন বুকের বাদামি চর।
ইকারুস, তোমার সঙ্গ ভালো লাগে।
কালরাতে আমি আকাশ ছিলাম অমলিন জোছনায় একাকার। পুড়ে গেছি ভীষণ তারাদের দেহের আগুনে। আর তারপরে ছাই নয়, হয়ে গেছি কোমল পাথর।
ইকারুস, তোমার সঙ্গ রাতভর, তোমার সঙ্গ দিনভর।
আমাকে নিলে না কেন তোমার অমন মধুর উত্থান আর পতনে? আমি সাঁতার পারি না। উড়তে আমি জানি না। ভেঙে যাওয়া ধাম তোমার চোখের উত্তরে ছিল, আমি ছিলাম। মাটি ভালো লাগে না, মাটি বড্ড কঠিন।
ডুবে যেতে চেয়েছি, পারিনি
ভেসে যেতে চেয়েছি, পারিনি
উড়ে যেতে চেয়েছি, পারিনি।
বাবা দেয়নি মোমের ডানা। বাবা ছিল অরণ্যের রক্ষক। আর অরণ্যে ছিল আমার প্রবেশ নিষেধ।
ইকারুস, সুন্দর ইকারুস! কেন নিলে না আমাকে? কেন নিলে না, বলো!
এই কবিতার তৃতীয় লাইনে ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) করেছি ‘ইকারুস’ নামের একটা পৌরাণিক উপাদান দিয়ে। ইকারুস হল গ্রিক পুরাণের একটা চরিত্র, যে তার বাবা ডেডালাসের বানিয়ে দেওয়া মোমের ডানায় ভর করে সূর্যের কাছে উড়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কেননা সূর্যের উত্তাপে তার মোমের ডানা গলে গিয়েছিল, ফলে সে আকাশ থেকে পড়ে গিয়েছিল আবার মাটিতে। এই চরিত্রটি মহৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতার সৌন্দর্য ও বাবার নির্দেশ ভুলে যাবার একার্থে অমান্য করবার ট্র্যাজেডির প্রতীক। আমি ইকারুসের মূল ঘটনা অর্থাৎ উত্থান ও পতনকে অক্ষুণ্ণ রেখেই তাকে একটা আধুনিক, অক্ষম চেতনার বিপরীতে স্থাপন করেছি। এই আমি ইকারুসকে সরাসরি অনুকরণ না করে তাকে 'সঙ্গ' হিসেবে গ্রহণ করছি। ইকারুসের পতন এখানে এক মধুর অভিজ্ঞতা, যা আমার কাছে অধরা। আমি যেন মহৎ ট্র্যাজেডির উপকরণকে কবিতায় গুঁজে দিয়ে এটাই বলতে চাইছি যে, আমি তো আমার জীবনে এমন ট্রাজেডিরও জন্ম দিতে পারলাম না, আমি যে ভীরু! ফলে ইকারুস এখানে ব্যর্থতার প্রতীক না হয়ে, সাহস ও সক্রিয়তার এমন এক প্রতীক হয়ে ওঠে, যা আমার নিজস্ব নিস্তেজ, স্থবির জীবনের থেকেও প্রার্থিত।
‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) শুধু বিষয়বস্তুতে নয়, ভাষার গঠনের মধ্যেও কাজ করে। এই কবিতার কিছু বাক্যাংশ প্রথাগত কাব্যিক গাম্ভীর্যকে ভেঙে দিয়ে দৈনিক জীবনের অসহায়ত্ব তুলে ধরে, সরল, দৈনন্দিন স্বীকারোক্তি ও সাধারণ নঞর্থক ক্রিয়াপদ, যেমন ‘মাটি ভালো লাগে না, মাটি বড্ড কঠিন’ কিংবা ‘ভেঙে যাওয়া ধাম তোমার চোখের উত্তরে ছিল...’ ইত্যাদি।
আমি যখন ‘ভেঙে যাওয়া ধাম’ বা ‘মধুর উত্থান আর পতন’ যা, পুরোনো ঘটনাসংলগ্ন, এমন কাব্যিক উপাদান-এর কথা বলছি, তখন হঠাৎই আবার বলছি ‘আমি সাঁতার পারি না। উড়তে আমি জানি না’। এই সহজ, অক্ষম স্বীকারোক্তিটি চিরায়ত কাব্যিক ভাষার সঙ্গে জুড়ে যায়। এই সংযোজন কাব্যভাষাকে অতিরিক্ত গুরুগম্ভীর হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং একটা সরল, খাঁটি, কেন্দ্রহীন সত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাসনা ও ব্যর্থতার মহৎ খেলার বিপরীতে এসে সহজ ভাষায় বলা আমার ‘ভেসে যেতে চেয়েছি, পারিনি’ বাক্যটি কি পাঠককে একটা নতুন এবং আরও ব্যক্তিগত স্তরের হতাশার মুখোমুখি করে না?
আমার এই কবিতার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage)টা ঘটেছে বাবার চরিত্র এবং অরণ্যকে ব্যবহার করবার মাধ্যমে। বাবা আর মোমের ডানা, যা ইকারুসের কাহিনির অংশ, ইকারুস মোমের ডানা পেয়েছিল তার বাবা ডেডালাসের কাছ থেকে এবং সেই ডানা নিয়েই সে উড়তে গিয়েছিল। কিন্তু আমার কবিতায় ‘বাবা দেয়নি মোমের ডানা’ এবং ‘বাবা ছিলো অরণ্যের রক্ষক। আর অরণ্যে ছিল আমার প্রবেশ নিষেধ’। এখানে আমি একইসঙ্গে দুটি পুরোনো উপাদানকে বিপরীত অর্থে ব্যবহার করেছি। মহৎ পতন বা স্বাধীনতা আমার কাছে অনুপস্থিত। অরণ্য এখানে প্রকৃতির স্বাধীনতা বা রহস্যের প্রতীক। কিন্তু বাবা সেই স্বাধীনতার রক্ষক হয়েও সন্তানের জন্য সেই স্বাধীনতাকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
এইভাবে আমি পৌরাণিক আর আমার নিজের জীবনের উপাদানকে নিয়ে এসে একসঙ্গে করে তাদের প্রথাগত অর্থ ভেঙে দিয়েছি। আর এটাই দেরিদার ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage)-এর চূড়ান্ত দার্শনিক অবস্থান। এককথায় বলতে গেলে কবিতা লিখবার ক্ষেত্রে ‘ব্রিকোলাজ’ (Bricolage) হল ভাষার পুরোনো উপাদান দিয়ে নতুন চিন্তার কাঠামো তৈরি করবার ললিত-শৈল্পিক কৌশল।