Published : 20 Apr 2026, 04:10 PM
ডিজিটাল সময়ে কখনও টেলিভিশনের সামনে, কখনও মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকা হয়। তবে এই বসে থাকার সময়টা কীভাবে কাটানো হচ্ছে, সেটিই বড় বিষয়।
সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্রাজিলের ‘ইউনিভার্সিদাদে দে সাও পাওল’, অস্ট্রেলিয়ারর ‘বেইকার হার্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিস ইন্সটিটিউট’, ‘সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, সুইডেনের কারোলিন্সকা ইন্সটিটিউট’- এর করা গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে জানানো হয়- শুধু বসে থাকা নয়, সেই সময়ের কার্যকলাপও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশেষ করে নিষ্ক্রিয়ভাবে পর্দা দেখা ভবিষ্যতে স্মৃতি ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষণার ফলাফল যা বলছে
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও চিকিৎসক ডা. লিয়ানা ওয়েন সিএনএন ডটকম-কে জানান, সুইডেনে প্রায় দুই দশক ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে নিষ্ক্রিয় কাজ—যেমন উদ্দেশ্যহীন টেলিভিশন দেখা, তাদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
গবেষণায় ২০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের প্রতিদিন বসে থাকার অভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল— সব ধরনের বসে থাকা সমান নয়। কেউ যদি একই সময় বসে থেকে বই পড়েন বা ধাঁধা সমাধান করেন, আর কেউ যদি শুধু টেলিভিশন দেখেন— তাহলে এই দুইয়ের প্রভাব এক নয়।
যারা মানসিকভাবে সক্রিয় কাজ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কম দেখা গেছে।
নিষ্ক্রিয় ও সক্রিয় মানসিক কাজের পার্থক্য
নিষ্ক্রিয় মানসিক কাজ বলতে বোঝায় এমন কার্যকলাপ, যেখানে চিন্তা বা বিশ্লেষণের প্রয়োজন খুব কম।
যেমন- টেলিভিশন দেখা বা উদ্দেশ্যহীনভাবে গান শোনা উল্লেখ করা যায়। এতে মস্তিষ্ক খুব বেশি সক্রিয় থাকে না।
অন্যদিকে সক্রিয় মানসিক কাজ হল- এমন কিছু, যেখানে মনোযোগ, সমস্যা সমাধান বা চিন্তার প্রয়োজন হয়।
যেমন- বই পড়া, শব্দজট সমাধান করা, নতুন কিছু শেখা বা কারও সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলাপ করা।
এসব কাজে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে, যা তাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
যে কারণে নিষ্ক্রিয়তা ঝুঁকি বাড়ায়
ডা. ওয়েন ব্যাখ্যা করেন, “মস্তিষ্ক নিয়মিত চ্যালেঞ্জ পেতে চায়। যখন আমরা নতুন কিছু শিখি বা ভাবি, তখন মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। একে বলা হয় ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা মানসিক সঞ্চয় ক্ষমতা। এই ক্ষমতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ককে ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।”
তবে যদি দীর্ঘ সময় ধরে এমন কাজ করা হয় যেখানে মস্তিষ্ককে তেমন কাজে লাগাতে হয় না, তাহলে এই সংযোগগুলো দুর্বল হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
আরেকটি কারণ হল- দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা। এতে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।
সক্রিয় কাজের সময় মাঝেমধ্যে মনোযোগের পরিবর্তন বা নড়াচড়া হয়, যা তুলনামূলকভাবে ভালো।
স্বপ্ন, ঘুম ও মস্তিষ্কের সংযোগ
গবেষণায় আরও একটি দিক উঠে এসেছে, মানসিকভাবে সক্রিয় জীবনযাপন করলে ঘুমের মানও ভালো হয়।
ভালো ঘুম মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে নেয় এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দেয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় কাজ করলে, ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। ফলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
জীবনে যেসব পরিবর্তন আনা যায়
মস্তিষ্ককে সচল রাখতে বড় কোনও পরিবর্তন দরকার নেই। ছোট ছোট অভ্যাস যেমন— প্রতিদিন কিছু সময় বই পড়া, নতুন কিছু শেখা, বা পরিবারের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলাপ করা যেতে পারে।
এছাড়া শখের কাজ সেলাই, আঁকাআঁকি, লেখা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো- এসবও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। এমনকি রান্নার সময় নতুন রেসিপি চেষ্টা করাও একটি মানসিক অনুশীলন হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভালো থাকে। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আলোচনা করা বা একসঙ্গে কোনও কাজ করা মস্তিষ্ককে আরও বেশি উদ্দীপিত করে।
একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
‘স্ক্রিন টাইম’ পুরোপুরি খারাপ নয়
সব ধরনের ‘স্ক্রিন’ ব্যবহার ক্ষতিকর নয়। কম্পিউটার ব্যবহার করে নতুন কিছু শেখা, সমস্যা সমাধান করা বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানসিকভাবে উপকারী হতে পারে।
সমস্যা তখনই হয়, যখন দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা হয়। যেমন- অবিরাম ভিডিও দেখা বা সামাজিক মাধ্যমে সময় নষ্ট করা।
শারীরিক ও মানসিক সক্রিয়তার সমন্বয়
শুধু মানসিক সক্রিয়তা নয়, শারীরিক কার্যক্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা যেকোনও ধরনের শারীরিক নড়াচড়া মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং নতুন কোষ তৈরি করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্রিয়, তাদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি সবচেয়ে কম।
আরও পড়ুন
স্বপ্ন আর ভালো ঘুমের অদ্ভুত সম্পর্ক
বৃদ্ধ বয়সে বাগান করা স্বাস্থ্যকর