পাকিস্তানে বিজয় মঞ্চ কি নওয়াজ শরিফের জন্যই প্রস্তুত হচ্ছে

চার বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন ছেড়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরেন নওয়াজ। তখনই বোঝা যাচ্ছিল তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে আবারও বড় খেলোয়াড় হতে চলেছেন।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2024, 03:37 PM
Updated : 8 Feb 2024, 03:37 PM

পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে, চলছে ভোট গণনার কাজ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক ফলাফল আসতে শুরু করবে। তবে কি দেশটিতে চতুর্থবারের মত সরকার গঠন করতে চলেছেন নওয়াজ শরিফ, নাকি যাবতীয় হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে স্বতন্ত্র হয়েই ক্ষমতায় ফিরবে ইমরান খানের দল।

আজকে পাকিস্তানে রাজনীতির যে প্রেক্ষাপট, পাঁচ বছর আগে ছিল ঠিক তার উল্টো। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বলে রায় দেয়। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। 

তারপর দুর্নীতির নানা অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে তার কারাদণ্ড হয়। কারাদণ্ডের কারণে ভোটের ময়দানে লড়াইয়ে নামতে পারেননি। যেমনটা এবার ইমরান খানকে ভুগতে হচ্ছে।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনী। এটা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। হয় সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতায় থাকবে নতুবা তাদের পছন্দের কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাবে।

গত নির্বাচনে ইমরান খানের দল জয়ী হওয়ার পর রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর হাত মাথায় নিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন ইমরান। ইমরানকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণও ওই সেনাবাহিনী। অন্তত ইমরান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পরোক্ষভাবে এমনটাই দাবি করেছে।

আগের বার ইমরান ক্ষমতায় বসার পর কারাগারে থাকা নওয়াজ ২০১৯ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে চিকিৎসার জন্য দেশত্যাগের অনুমতি পান এবং যুক্তরাজ্য চলে যান। তারপর থেকে তিনি লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনেই ছিলেন।

মাঝে স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। তারপর আবার লন্ডন চলে যান। সে সময় নওয়াজ আবারও রাজনীতিতে ফিরবেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন এমনটা কল্পনা করাও দুঃসাহসের বিষয় ছিল। তার দল পিএমএল-এন এর দায়িত্বও চলে যায় ছোট ভাই শাহবাজ শরিফের হাতে।

Also Read: হামলা, সংঘাত, প্রাণহানিতে শেষ হল পাকিস্তানের ভোট

Also Read: পাকিস্তানে ফিরেছেন নওয়াজ শরীফ

ইমরান খান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। কিন্তু দেশটির নাম পাকিস্তান। যে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজের মেয়াদ শেষ করার সুযোগ পাননি।

এর আগেই তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ইমরানের বেলাতেও তেমনটিই হয় এবং মুহূর্তে মধ্যে তার সম্পূর্ণ পক্ষে থাকা পরিস্থিতি পুরোপুরি তার বিরুদ্ধে চলে যায়।

২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন ইমরান খান। পরে বছর পুরোটা জুড়েই আগাম নির্বাচনের দাবিতে পাকিস্তানের রাজনীতির মাঠ গরম করে রাখেন ইমরান ও তার দল। তবে দেশটির রাজনীতি ঠিক কোনো দিকে এগোচ্ছে তা স্পষ্ট হচ্ছিল না।

২০২৩ সালের অক্টোবরে অনেকটা হঠাৎ করেই স্বেচ্ছা নির্বাসন ভেঙে দেশে ফিরে আসেন নওয়াজ শরিফ। নভেম্বরে পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা কারণে ভোট গ্রহণ পিছিয়ে দেওয়া হয়।

নির্বাচনের ঠিক আগে দিয়ে দণ্ড মাথায় নিয়ে ৭৪ বছর বয়সী নওয়াজের দেশে ফেরা সবার জন্যই স্পষ্ট বার্তা ছিল। সবাই বুঝতে পেরেছিলেন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ মিটিয়েই তিনি দেশে ফিরেছেন এবং ইমরানকে মাত দিতে তাকেই বেছে নিয়েছে সামরিক বাহিনী।

তাইতো দেশে ফেরার পর একের পর এক মামলায় তিনি সাজা মওকুফের  আবেদন করেন এবং তার সাজা মওকুফ হতে থাকে। অন্য দিকে ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে এবং সেগুলোর বিচারে তাকে দোষীসাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া শুরু হয়।

শুধু ইমরানই নন বরং তার দলের অনেক নেতাকর্মীকে বন্দি করা হয়। দমন-পীড়নের ভয়ে অনেকে পলাতক রয়েছেন। কয়েকজন শীর্ষ নেতা দলত্যাগও করেন। দণ্ডিত হওয়ায় ইরমান এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।

এমনকি তার দলকে দলীয় প্রতীক বরাদ্দও দেওয়া হয়নি। ফলে পিটিআই এর যেসব নেতারা এবার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের ময়দানে নামতে হয়েছে।

প্রত্যাবর্তনের রাজা নওয়াজ কী এবারও ফিরছেন

অনেকেই নওয়াজকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের রাজা বলে থাকেন।  অতীতে তিনি বারবার ক্ষমতায় ফিরে ফিরে এসেছেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। ওই নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

এটিই ছিল ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর প্রথমবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। নওয়াজের তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাও ছিল রেকর্ড।

কিন্তু তার তৃতীয় মেয়াদ সহজ ছিল না। রাজধানী ইসলামাবাদে বিরোধীদের ছয় মাস অবরোধ দিয়ে শুরু হয় সংকট, শেষ হয় দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায়। আর এর জের ধরে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বলে রায় দেয়। পরে তিনি পদত্যাগ করেন।

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের জন্য নওয়াজ শরিফ ও তার দলকে দায়ী করা হয়। চ্যাথাম হাউজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রকল্পের অ্যাসোসিয়েট ফেলো ড. ফারজানা শেখ বলেন, নওয়াজের দল জয়ী হতে যাচ্ছে।

তবে পাকিস্তানে কোনও দল একবার ছাড়া আর কখনও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ পায়নি। ওই একবার তা পেয়েছিল নওয়াজের দল। সব কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে এবার তিনি প্রধানমন্ত্রী বা বৃহত্তম দলের প্রধান হতে যাচ্ছেন। 

নওয়াজ কী পারবেন পাকিস্তানকে পথ দেখাতে

ফাঁপা হয়ে যাওয়া অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তান। ফলে নতুন সরকারকে শুরুতেই পড়তে হবে বিশাল বড় এক চ্যালেঞ্জের মুখে। বেহাল অর্থনীতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি পাকিস্তানের নতুন সরকারকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে হবে।

যেটা বেশ কঠিন কাজ হবে৷ পাকিস্তানের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বর্তমান উত্তেজনা কাটানো আপাতত সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে৷ ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে৷

নওয়াজ শরিফ চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হলেও অতীতের একটি অভিজ্ঞতা তাকে সবসময় মনে রাখতে হবে। সেটা হলো, সামরিক বাহিনীর সম্মতি ছাড়া পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো বড় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা। গতবার তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন৷

২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পাকিস্তানে ডেকে ব্যক্তিগত উষ্ণতা দেখিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলেন তিনি৷

নওয়াজ যতবার ক্ষমতায় ছিলেন ততবারই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। এমনকি স্বেচ্ছা নির্বাসনে বিদেশে অবস্থান কালেও তিনি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর সমালোচনা করে গেছেন।

বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য তিনি আইএসআই ও সাবেক সেনাপ্রধানকে দায়ী করেছেন। যদিও সামরিক বাহিনী তার সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেছেন নওয়াজ। তাকে ভুয়া মামলায় সাজা দিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

সেনাবাহিনী কখনও নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খানকে সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে বলেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা দাবি করে আসছে, রাজনীতিতে তারা জড়িত নয়।

কিন্তু বিশ্লেষকদের কাছে মনে হচ্ছে, রাজনীতিতে ফেরার জন্য নওয়াজ নিশ্চিতভাবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় এসেছেন।

ফলে এবার ক্ষমতায় এলে তাকে সেই সামরিক বাহিনীর উপর আরও নির্ভরশীল হতে বাধ্য হতে হবে৷ অনেক রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশটিতে একটি ‘হাইব্রিড’ সামরিক শাসন কাঠামো সৃষ্টি করেছে। যেখানে যে কোনো নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা ও ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত থাকতে বাধ্য৷

জনগণের মনজয়

নওয়াজ গত ৩৫ বছর ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। দেশের বাইরে অবস্থান কালেও তার অবস্থান অটুট রয়েছে। তবে এই সময়ে ইমরানের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে।

পাকিস্তানে তার একটি সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এছাড়া, ইমরান কারাগারে থাকায় এবং তাকে ভোটের ময়দানে নামতে না দেওয়ায় জনমনে বৃহস্পতিবারের ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছে।

সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির তীব্র চাপ তো রয়েছেই। ইমরান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যে জোট সরকার এতদিন দেশ পরিচালনা করেছে তার নেতৃত্বে ছিল নওয়াজের ভাই শাহবাজ শরিফ। শাহবাজ শরিফের জোট সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে। শাহবাজ সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

নওয়াজ তাই আবারও ক্ষমতায় ফিরলেও তার জন্য সংকটে ভরা এক পথ অপেক্ষা করছে।