১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কানাডাকে ‘সহযোগী সদস্য’ করলে ইইউ’র ওপর ভারি শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন শত্রুভাবাপন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হলে তিনি তাদের ওপর গুরুতর শুল্ক বসাবেন কিংবা অনেক পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ করবেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 17 Sep 2026, 05:56 PM

Updated : 17 Sep 2026, 05:56 PM

কানাডাকে প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ (অ্যাসোসিয়েট মেম্বার) করার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে জোটটির ওপর ভারি শুল্ক আরোপ কিংবা বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার একদিন আগে ট্রাম্প উত্তর ক্যারোলাইনায় অবতরণের পর সাংবাদিকদের বলেন, “আমি মনে করি এটি হাস্যকর, কানাডা বরাবরই এক ভয়াবহ বাণিজ্যিক অংশীদার।”

ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “যদি আমি মনে করি এটি কোনও শত্রুভাবাপন্ন পদক্ষেপ, তবে ইউরোপের বিরুদ্ধে খুব গুরুতর শুল্ক বসাব কিংবা অনেক পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ করে দেব।”

তবে ইউরোপের মনোভাবের ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে বলে ইঙ্গিত দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তিনি বলেন, “যদি তাদের মনোভাব ভালো হয়, তবে ঠিক আছে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য যদি খারাপ হয়, তবে আমরা ইউরোপের ওপর খুব ভারি শুল্ক বসাব, যার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”

ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বার্ষিক ভাষণ দেওয়ার সময় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কানাডাকে ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব দেন। প্রথম কোনও অ-ইউরোপীয় সরকারপ্রধান হিসেবে কার্নি এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

উপস্থিত পার্লামেন্ট সদস্যদের তুমুল করতালির মধ্যে কার্নির উদ্দেশ্যে ফন ডার লিয়েন বলেন, “কানাডাকে ইইউ-এর প্রথম সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আপনাদের সঙ্গে কাজ করার পথ খুলে দিতে চাই।”

এই পদক্ষেপকে এক ‘উন্মুক্ত শত্রুভাবাপন্ন বিশ্বে’ ইউরোপের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের অংশ বলে বর্ণনা করেন তিনি।

লিয়েন বলেন, “আমরা একই মহাসাগর, একই মূল্যবোধ ও দেখার একই দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নিই। এখন থেকে আমরা আমাদের যৌথ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব।” এটি সাধারণ বাণিজ্যিক সহযোগিতার বাইরে একটি ‘ভবিষ্যতের জোট’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।

ফন ডার লিয়েন জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা-শিল্প ভিত্তির সমন্বয়, সুমেরু (আর্কটিক) অঞ্চলের যৌথ প্রকল্প, জ্বালানি, ব্যাটারি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সহযোগিতা জোরদার করবে ইইউ ও কানাডা।

তবে ইউরোপ যাত্রার আগে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাংবাদিকদের কার্নি জানান, তারা ইইউ-এর পূর্ণ সদস্য হতে চাইছেন না।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে চাইছি না। আমরা যা চাইছি, তা হলো কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি অনন্য জোট গঠন করা। আমাদের মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকার এক, আর শক্তিগুলো একে অপরের পরিপূরক।”

ইইউতে কানাডার নতুন রাষ্ট্রদূত জোনাথন উইলকিনসনও বিষয়টি কিছুটা হালকা করে তুলে ধরে বলেন, “আমরা এখনও অত দূরে পৌঁছাইনি। আমরা কেবল সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়ার দিকে নজর দিচ্ছি।”

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই বিপজ্জনক ও বিভক্ত বিশ্বে নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করছে অটোয়া।

বর্তমানে ইইউ চুক্তিতে ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাটাগরি নেই। ফলে এই ধরনের মর্যাদা তৈরি করতে হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

ইউক্রেইনের জন্য চলতি বছরের শুরুতে প্রথম এই ধরনের সদস্যপদের ধারণাটি এনেছিলেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎস। তবে পূর্ণ সদস্যপদের দাবিতে লড়া কিইভ সেই প্রস্তাবের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি।

ইইউ-এর এক মুখপাত্র জানান, তারা এমন এক নতুন রূপরেখা তৈরি করতে চান যা আগে কখনও ছিল না। এটি ইউরোপের বাইরের কোনও দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব হবে।

ইতিমধ্যেই ইইউ ও কানাডার মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। দুই পক্ষের সিইটিএ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ৯৯ শতাংশ পণ্যের শুল্ক উঠে গেছে এবং ২০১৬ সাল থেকে বাণিজ্য ৮০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

এছাড়া চলতি বছর ইইউ-এর ‘সেফ’ প্রতিরক্ষা ক্রয় কর্মসূচিতে প্রথম অ-ইউরোপীয় দেশ হিসেবে যোগ দেয় কানাডা, যা দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইইউর সামরিক চুক্তিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের বাণিজ্যিক উত্তেজনার পর ওয়াশিংটনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে চাইছে অটোয়া।

ট্রাম্প ইতিমধ্যেই কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন এবং চলতি মাসের শেষের দিকে দেশটির দুগ্ধজাত পণ্য, অ্যালকোহল ও গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার রপ্তানি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে, যদিও অটোয়ার মোট রপ্তানির ৭১ দশমিক ৭ শতাংশই কিনেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশে কানাডার রপ্তানি ১৭.২ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ হিসেবে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ কানাডা ইইউ-এর জন্য বড় ভূরাজনৈতিক সম্পদ হতে পারে।

অন্যদিকে, ইইউ- এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনও শুল্ক আরোপ হলে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে গত বছর স্বাক্ষরিত বাণিজ্যিক চুক্তির ১৫ শতাংশ শুল্কের ঊর্ধ্বসীমা (ট্যারিফ সিলিং) বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে।