Published : 16 Sep 2026, 11:56 PM
রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার শাস্তি হিসাবে ভারত ও অন্যান্য দেশগুলোর উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগুলো যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ভোটে ‘লিন্ডসে ও.গ্রাহাম স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ শীর্ষক বিলটি প্রাথমিক অনুমোদন পেয়ে গেছে।
বিলের পক্ষে ২১৪টি ভোট পড়েছে, আর বিপক্ষে পড়েছে ২১১টি। বুধবার হাউজে বিলটি নিয়ে চূড়ান্ত ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে গত অগাস্টে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেট ৮৬-১১ ভোটে বিলটি পাস করেছিল।
এই বিল আইনে পরিণত হলে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলোর পণ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা পেতে পারেন ডনাল্ড ট্রাম্প।
এই দেশগুলোর মধ্যে ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশের মধ্যে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত,আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান এমনকী চীনও আছে।
বিলের লক্ষ্য হল, ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। রাশিয়ার নেতৃত্ব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি খাতের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করা জাহাজগুলোকেও এই আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ‘শ্য়াডো ফ্লিট’-ও রয়েছে।
এছাড়াও, ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সীমিত করা সংক্রান্ত ‘ইরান স্যাংশন অ্যাক্ট’ এর মেয়াদ বাড়ানোরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে বিলে।
বিলটির নামকরণ হয়েছে মার্কিন রাজনীতিবিদ লিন্ডসে ও. গ্রাহামের নামে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান গ্রাহাম রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন তিনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি তেল কেনে চীন। তালিকায় দ্বিতীয় ভারত। এছাড়া ক্রেতার তালিকায় উপরের সারিতে রয়েছে স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, আজারবাইজান, জাপানের মতো দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রে বিলটি পাস হয়ে যাওয়ার পর এই দেশগুলো রুশ তেল কেনা বন্ধ না করলে ট্রাম্প চাইলেই তাদের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক চাপাতে পারবেন।
ভারত কেন নজরে?
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেইনে সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলি মস্কোর উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
এর পর থেকেই বিশ্ববাজারে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। ভারত রাশিয়ার এই তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে।
ভারতের যুক্তি ছিল, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সস্তা তেলের উৎস ব্যবহার করা জরুরি।
কিন্তু ওয়াশিংটন মনে করে, রাশিয়ার তেল বিক্রি থেকে হওয়া আয় মস্কোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং ইউক্রেইন যুদ্ধের অর্থ জোগাতে সাহায্য করছে।
এ কারণেই রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর উপর চাপ বাড়ানোর নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ভারতের উপর বিলের কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন ভারতের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর।
ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে সেগুলোর আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি হতে পারে এবং মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
বিল নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি:
বিলের খসড়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার পরিধি অগণতান্ত্রিক ভাবে বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবির।
যদিও দুই ডেমোক্র্যাট হাউজ সদস্য ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান শিবিরের সঙ্গে যোগ দিয়ে ভোটাভুটিতে বিলটিকে সমর্থন করেছেন।
ওদিকে, হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং ডেমোক্র্যাটিক রিপ্রেজেন্টেটিভ গ্রেগরি মিক্স বিল নিয়ে আপত্তি তুলে বলেন, এই আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে খুবই ব্যাপক ক্ষমতা দিতে পারে।
তিনি এমন একটি সংশোধনীর পক্ষে ছিলেন, যাতে ব্যাপক ‘সেকেন্ডারি শুল্ক’-আরোপের ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এরপর কী?
হাউজে চূড়ান্ত ভোটে বিলটি অনুমোদন পেলে পরবর্তী ধাপে এটি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউজে যেতে পারে।
তবে বিলটি পাস হলেই রাশিয়া থেকে তেল, গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে যাবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি হল, কংগ্রেস এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরির পথে রয়েছে, যার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার কারণে ভারত-সহ কয়েকটি দেশের ওপর ভবিষ্যতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেতে পারেন।