প্রেসিডেন্টের ফোনে আড়িপাতা: ইন্দোনেশিয়ায় চিফ অব স্টাফ গ্রেপ্তার, রাষ্ট্রদ্রোহের তদন্ত
চাঞ্চল্যকর এই আড়িপাতা কেলেঙ্কারিতে খোদ প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ লিসতিও সিগিত প্রাবোওসহ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ফোনালাপে অবৈধভাবে নজরদারির অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
চাঞ্চল্যকর এই আড়িপাতা কেলেঙ্কারিতে খোদ প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ লিসতিও সিগিত প্রাবোওসহ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েছেন।
তবে নামে মিল থাকলেও চিফ অব স্টাফের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই।
ঘটনাটিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর (জোকোই) সঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। উইদোদোর সরাসরি সমর্থনে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন প্রাবোও।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের গবেষক মেদে সুপ্রিয়াতমা বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, “লিসতিও সাবেক প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই গ্রেপ্তার প্রমাণ করে তাদের দুজনের পথ এখন কার্যত আলাদা হয়ে গেছে।”
যেভাবে ঘটনা ফাঁস ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ
গত মঙ্গলবার চিফ অব স্টাফ লিসতিও এবং পুলিশের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাত্র এক মাস আগে লিসতিওকে চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। তবে গ্রেপ্তারের পরপরই তাকে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এক পুলিশ কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে এই অবৈধ নজরদারির বিষয়টি ফাঁস হয়।
অভিযোগ উঠেছে, কোনো পরোয়ানা বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই পুলিশের বিশেষ নজরদারি সিস্টেমে প্রেসিডেন্টের ফোন নম্বর যুক্ত করা হয়েছিল। লিসতিও যখন জাতীয় পুলিশ প্রধান ছিলেন, অর্থাৎ ২০২৫ সাল থেকেই এই আড়িপাতা চলছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র জানান, এই ঘটনায় এমন স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ফলে এটি ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ পর্যায়ে পড়ে।
ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ড। যদিও দেশটিতে গত এক দশকে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
মুখপাত্র আরও জানান, এই আড়িপাতার মূল উদ্দেশ্য বা কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
শুধু প্রেসিডেন্ট নন; রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি এবং শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ফোনেও নজরদারি চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার রাতে এই মামলায় অপরাধ তদন্ত ইউনিটের কর্মকর্তা সালামেত উলিয়ান্দিকে চতুর্থ সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাকে আটক করা হয়নি।
অতীতেও আড়িপাতার ইতিহাস
ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ নেতাদের ঘিরে এমন আড়িপাতার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়।
এর আগে ২০১৪ সালে জাকার্তার গভর্নর থাকাকালে জোকো উইদোদোর সরকারি বাসভবনে একাধিক আড়িপাতার যন্ত্র খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।
এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী ২০২৪ সালে দাবি করেছিলেন, নজরদারির আশঙ্কায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
প্রাবোও বনাম জোকোই দ্বন্দ্ব
ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ প্রধান সুয়ুদি আরিও সেতো দাবি করেছেন, এই পদক্ষেপ পুরোপুরি আইন প্রয়োগের অংশ। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা রেষারেষির সম্পর্ক নেই।
তবে পর্যবেক্ষকরা এটিকে দুই নেতার রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জোকো উইদোদোর সমর্থনে প্রাবোও ক্ষমতায় আসেন। সে সময় উইদোদোর বড় ছেলে জিবরান রাকাবুমিং রাকা দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মাথায় সেই জোটে এখন স্পষ্ট ফাটল ধরেছে। উইদোদোর স্বপ্নের নতুন রাজধানী ‘নুসানতারা’ নির্মাণ প্রকল্পে প্রাবোও খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং শিক্ষার্থীদের ‘বিনামূল্যে খাবার’ দেওয়ার নিজস্ব কর্মসূচিতেই তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থ ঢালছেন।
প্রশাসনে দফায় দফায় রদবদল এনে দীর্ঘদিনের অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীসহ উইদোদোর আস্থাভাজন বহু কর্মকর্তাকে নতুন ভূমিকায় সরিয়ে দিয়েছেন প্রাবোও।
এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জিবরানের হাইস্কুলের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যোগ্যতাহীনতার অভিযোগে তাকে পদচ্যুত করার দাবিও উঠেছে।
এর মধ্যেই উইদোদোর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লিসতিওর গ্রেপ্তার দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিল। বৃহস্পতিবার একটি আদালতের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেন, “চলমান আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের সবার শ্রদ্ধা থাকা উচিত।”
বহুমুখী সংকটে প্রশাসন
এমন এক সময় এই কেলেঙ্কারি সামনে এল, যখন প্রাবোও সরকার তীব্র সংকটের মুখে রয়েছে।
স্কুলে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ কর্মসূচিটি তহবিল সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে হয়েছে দেশকে। এ ছাড়া কারসাজির অভিযোগে জাতীয় শেয়ার বাজারেও বড় সংকট দেখা দিয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়াশা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে।
জাকার্তার সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক নিকি ফাহরিজাল বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, “দেশটি যেন কোনো চালক ছাড়া স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় (অটোপাইলট) চলছে। সরকারের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের স্বার্থ নয়, বরং বিশেষ মহলের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।”
