Published : 20 Aug 2025, 08:21 PM
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হোক, বা ব্যর্থ, নিজের কৃতিত্বের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে ভুলছেন না তিনি।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে একের পর এক যুদ্ধ থামানো নিয়ে কয়েকদিন পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড়াই করে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের এ ৪৭তম প্রেসিডেন্ট।
সোমবার হোয়াইট হাউজে ইউরোপীয় নেতাদের চাপের মুখে রাশিয়া-ইউক্রেইনের মধ্যে ‘যুদ্ধবিরতির আহ্বান’ জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমি ছয়টি যুদ্ধ বন্ধ করেছি। সবগুলো চুক্তিই করেছি ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দটি উচ্চারণ না করেই।”
পরদিনই তার ‘থামানো’ যুদ্ধের সংখ্যা বেড়ে গেল, এবার সংখ্যাটি হল, ৭।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন বলছে, ‘শান্তির দূত’ হিসেবে নোবেল পুরস্কার অনেক আগে থেকেই তার প্রাপ্য। তারা এমনকি প্রেসিডেন্ট কতগুলো যুদ্ধ থামিয়েছেন, তার তালিকাও দিয়েছে।
তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেসব সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব নিচ্ছেন, তার বেশ কয়েকটির স্থায়িত্ব ছিল কয়েকদিনের, যদিও এসব বিরোধের শেকড় বহু বছরের। আবার কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও সন্দেহ রয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এসব চুক্তি নিয়ে বলতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেও বারবার ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দই ব্যবহার করেছেন।
এসব সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেগুলো থামাতে ট্রাম্পের কৃতিত্ব আদতেই কতটুকু বিবিসির এক প্রতিবেদনে তাই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরান
গরম গরম হুমকি, পাল্টা হুমকি চলছিল অনেক দিন ধরেই। তার মধ্যেই ১৩ জুন ইসরায়েল আচমকা ইরানে হামলা চালিয়ে বসলে শুরু হয় সংঘাত। যা চলে টানা ১২ দিন।
কয়েকদিনের মধ্যেই ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেই তাকে হামলার বিষয়ে জানিয়েছিলেন।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়—যা সংঘাত দ্রুত থামাতে ভূমিকা রাখে বলে অনেকে মনে করছেন।
তারপর ২৩ জুন ট্রাম্প উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা করেন।
যদিও সংঘাত থামার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, তাদের দেশ ‘চূড়ান্ত বিজয়’ পেয়েছে। তিনি ‘যুদ্ধবিরতির’ প্রসঙ্গই তোলেননি।
এদিকে ইসরায়েলও বলে যাচ্ছে, ইরান নতুন হুমকি তৈরি করলে তারা আবার আঘাত হানবে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল ও’হ্যানলনের মতে, “এখানে স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি কিংবা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে সে ব্যাপারেও সমাধান আসেনি। কাজেই এটাকে যুদ্ধের শেষ বলা যায় না, বরং একধরনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরান খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ায় কৌশলগতভাবে ট্রাম্পকে কিছুটা কৃতিত্ব দেওয়া যেতে পারে।”
ভারত-পাকিস্তান
দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে টানাপোড়েন বহুদিনের। এপ্রিলে কাশ্মীরে এক সন্ত্রাসী হামলার পর উত্তেজনা নতুন করে বাড়ে এবং মে-তে শেষ পর্যন্ত দুই দেশ চার দিনের হামলা পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ে।
চারদিন পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভারত ও পাকিস্তান ‘পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এক দীর্ঘ রাতের আলোচনার ফলেই এ সমাধান এসেছে।
পাকিস্তান ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানায় এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সুপারিশও করে।
কিন্তু ভারত এ ভাষ্য উড়িয়ে দেয়। দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রী বলেন, “সামরিক পদক্ষেপ থামানোর বিষয়ে আলোচনাটি তাদের দুই দেশের সেনাদের মধ্যেই হয়েছে।”
রুয়ান্ডা-ডিআর কঙ্গো
এম২৩ বিদ্রোহীরা পূর্ব কঙ্গোর খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল দখল করে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের শত্রুতা আবারও উসকে দেয়।
চলতি বছরের জুনে ওয়াশিংটনে দুই দেশ এক শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ট্রাম্প বলেন, এটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে সহায়তা করবে।
কিন্তু এরপরও দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যাদের রুয়ান্ডার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে, সেই এম২৩ বিদ্রোহীরাও হুমকি দিয়েছে আলোচনার টেবিল ছাড়ার।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলানের ভাষায়, “কঙ্গো ও রুয়ান্ডার মধ্যে এখনো যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধবিরতি কার্যত কখনোই টেকেনি।”
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া
২৬ জুলাই ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালেএ লেখেন: “যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে, চলমান যুদ্ধ থামাতে আমি এখনই থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছি।”
এর কয়েকদিন পরই উভয় দেশ তাৎক্ষণিক ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তাদের মধ্যে সংঘাতের স্থায়িত্ব ছিল এক সপ্তাহেরও কম।
মালয়েশিয়াও এ শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্রাম্পও আলাদা করে হুমকি দেন—যদি থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া যুদ্ধ না থামায় তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে শুল্ক আলোচনা চালাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দুই দেশ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে সায় দেয়।
৭ অগাস্ট দুই দেশের যৌথ সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে চুক্তি করে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া।
আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান
৮ অগাস্ট হোয়াইট হাউজে শান্তিচুক্তি হয়। উভয় দেশের নেতারাই ট্রাম্পকে এর কৃতিত্ব দেন এবং বলেন, তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্য।
মাইকেল ও’হ্যানলন এ যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্পকে ‘ব্যাপক কৃতিত্ব’ দিচ্ছেন। হোয়াইট হাউজে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দুই দেশকে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর প্রণোদনা দিয়েছে বলেও তার ধারণা।
তবে এর আগেই মার্চে আর্মেনিয়া, আজারবাইজার দুই দেশের সরকারই বলেছিল, তারা চার দশকেরও বেশি পুরনো নাগোরনো-কারাবাখ বিরোধের ইতি টানতে প্রস্তুত।
বিতর্কিত ওই অঞ্চল নিয়ে সর্বশেষ বড় সংঘাত হয়েছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, সেসময় আজারবাইজান অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছিল।
মিশর-ইথিওপিয়া
এখানে এমন কোনো যুদ্ধ চলছিল না, যেটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থামিয়েছেন; তবে নীলনদের ওপর একটি বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ছিল।
ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যামের নির্মাণ কাজ চলতি গ্রীষ্মে শেষ হয়। এই বাঁধের কারণে প্রাপ্য পানি না পাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে মিশর।
এ নিয়ে ১২ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। চলতি বছরের ২৯ জুন মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নদীর পানি ও বাঁধ নিয়ে ইথিওপিয়ার সঙ্গে আলাপ থমকে আছে।
এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “আমি যদি মিশর হতাম, তবে নীলনদের পানি চাইতাম।”
যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত এ বিরোধের মীমাংসা করবে বলে প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
মিশর ট্রাম্পের এ মন্তব্যকে স্বাগত জানালেও ইথিওপিয়ার কর্মকর্তারা উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি।
সার্বিয়া ও কসোভো
২৭ জুন ট্রাম্প দাবি করেন, তার কারণে সার্বিয়া ও কসোভো যুদ্ধে জড়ায়নি।
“সার্বিয়া, কসোভো যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছিল। আমি বললাম, যদি যুদ্ধ করো তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য থাকবে না। তারা বলল, আচ্ছা, আমরা হয়তো যুদ্ধে জড়াবো না।”
১৯৯০-এর দশকের বলকান যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সার্বিয়া-কসোভোর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে বটে, তবে সরাসরি যুদ্ধ হয়নি।
অধ্যাপক ম্যাকমিলান বলছেন, “যেহেতু সার্বিয়া ও কসোভো একে অপরকে দিকে গুলি চালাচ্ছে না, সুতরাং এটি কোনো যুদ্ধ নয়, যা থামাতে হবে।”
হোয়াইট হাউজ এ দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেওয়া কূটনৈতিক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে।
২০২০ সালে ওভাল অফিসে তার উপস্থিতিতে সার্বিয়া-কসোভো নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছিল, তবে সেসময়ও তাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল না।