Published : 25 May 2026, 06:58 PM
অভ্যুত্থানকারী জান্তাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পর একাধিক সীমান্ত এলাকায় বিদ্রোহীদের ওপর জোর হামলা শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
তাদের নিশানায় থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে বিরল মৃত্তিকা খনিজ মজুদ থাকা এলাকা যেমন আছে, তেমনি আছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথও, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ তৈরিতে হ্লাইং সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ছাড়লে মার্চে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির নতুন সামরিক প্রধান হন ইয়ে উইন উ; দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলো পুনর্দখলে আগ্রাসী ভূমিকায় নামেন বলে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মুখপাত্র এবং বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পরিমাণ বাড়িয়েছিল, অনেক সীমান্ত এলাকাকে তারা তাদের শক্ত ঘাঁটিতেও পরিণত করেছিল।
দেশটির সেনাবাহিনী এখন তাদের কাছ থেকে ওই এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে জোর অভিযানে নেমেছে। উ যে এখন কাচিন, চিন ও কারেনে-ই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, তার সেনাবাহিনীর হামলার ধরণ থেকেই তা বোঝা যাচ্ছে।
এর মধ্যে চীন সীমান্তবর্তী কাচিন রাজ্যটি বিরল মৃত্তিকা খনিজে সমৃদ্ধ। চিন রাজ্যের পাশেই ভারত, আর থাইল্যান্ডলাগোয়া কারেন গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য করিডরের জন্য।
সামরিক বাহিনী চিন রাজ্যের ফালাম শহর এবং মান্দালয় ও কাচিন রাজ্যের মিতকিনার মাঝে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে বলে গত সপ্তাহে এক বৈঠকে ইয়ে উইন উ সেনাসদস্যদের বলেছেন, জানিয়েছে রাষ্ট্র-পরিচালিত খবরের কাগজ গ্লোবাল নিউজ লাইট অব মিয়ানমার।
দেশটির সেনাবাহিনী এখন প্রধান প্রধান যোগাযোগ পথ ও বাণিজ্য পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাইছে বলে মনে করেন মিয়ানমার বিশ্লেষক সাই চি জিন চো।
“সীমান্ত বাণিজ্য হয় এমন শহরগুলো পুনর্দখলে সামরিক বাহিনী যে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে তা দেখতে পাচ্ছি আমরা,” বলেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাকে ফোন করলেও তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নতুন তৎপরতা এবং বিভিন্ন এলাকা পুনর্দখলের যেসব খবর এসেছে তার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। দেশটির অনেক এলাকায় গণমাধ্যম প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনও বিধিনিষেধ রয়েছে।
গত মাসেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হ্লাইং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে ১০০ দিনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবেই অনেক সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।
হ্লাইংয়ের নেতৃত্ব দেশটির সামরিক বাহিনী ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এর প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটিতে প্রথমে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়, পরে তা সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।
বিরোধীরা অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকে সক্রিয় সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধে। তাদের যৌথ আক্রমণে ২০২৪ সালে জান্তা একাধিক এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির সামরিক বাহিনী অনেক এলাকার পুনর্দখল নিতে পেরেছে বলে খবর মিলেছে।
উ-র বাহিনী এখন উত্তরের কাচিন রাজ্যের আরও ভেতরে ঢুকতে চাইছে, তাদের নজর চীন সীমান্তবর্তী খনিজ এলাকাগুলো, যেখান থেকে বিশ্বের ভারি বিরল মৃত্তিকা খনিজের প্রায় অর্ধেক উত্তোলিত হয়। এই ভারি বিরল মৃত্তিকা খনিজ বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের টারবাইন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অত্যন্ত জরুরি উপকরণ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। সশস্ত্র এ গোষ্ঠীর মুখপাত্র না বু বলেছেন, তাদের বাহিনী ওই অঞ্চলের দখল ধরে রাখতে প্রস্তুত, বিশেষ করে চিপুই ও পাংওয়া এলাকার।
“বন্দুকের নলের মাধ্যমে তাদের বরণ করে নেবো আমরা,” বলেছেন তিনি।
এর পাশাপাশি সামরিক বাহিনী পশ্চিম রণাঙ্গণ, অর্থ্যাৎ ভারত সীমান্তবর্তী চিন রাজ্যেও হামলা জোরদার করেছে। তারা এটার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে বিদ্রোহীদের সীমান্ত দিয়ে লজিস্টিকস আনা নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ এক পথ বন্ধ করে দিতে পারবে তারা।
আকাশপথে সামরিক বাহিনীর তুমুল বোমাবর্ষণের পর বিদ্রোহীরা ‘কৌশলগত কারণে’ ফালাম ও তনজং সরে গেছে বলে জানিয়েছেন চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের মুখপাত্র সালাই ভ্যান।
ইরানিদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে জেট জ্বালানি পাওয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণের পরিধি বেড়ে যায়, তারা মাত্র ১৫ মাসেই হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছিল বলে আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল রয়টার্স।
ইরানে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে তাও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলার তীব্রতা কমাতে পারেনি। তবে পশ্চিম এশিয়ার এ সংঘাত দেশটির কৃষক ও বেসামরিকদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী থাইল্যান্ডের কাছে অবস্থিত মিয়াওয়াদি-কাউকারেইক মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ নিতেও জোর অভিযান চালাচ্ছে।
২০২৪ সালে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) সীমান্তবর্তী শহর মিয়াওয়াদি দখলে নেওয়ার পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ওই বাণিজ্য পথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছিল।
মিন অং হ্লাইং আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যে বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে চান, তাদের মধ্যে কেএনইউ-ও আছে।
“শান্তি অর্জনের পথে অঙ্গীকারগুলো সেনাবাহিনী বারবার, লাগাতার ভঙ্গ করেছে; তারা চুক্তিগুলোতে গ্রাহ্যই করেনি। যে কারণে তাদের ওপর আমাদের কোনো আস্থা-ই নেই। তারা যে চেষ্টাই করুক, তা ব্যর্থ হবেই,” বলেছেন কেএনইউ-র মুখপাত্র স ত নি।