Published : 14 Apr 2026, 08:28 PM
চলমান যুদ্ধের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে চলেছে লেবানন সরকার।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। কয়েক দশক পর দু’পক্ষে এটিই হবে প্রথম সরাসরি আলোচনা। এর আগে সর্বশেষ দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল ১৯৯৩ সালে।
এবারের বৈঠকে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েশিয়েল লাইটার এবং লেবাননের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মাওয়াদ ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় মার্কিন পররাষ্ট্রদপ্তরে আলোচনায় বসবেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন লেবাননে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইকেল ইসাও। তবে হিজবুল্লাহর আপত্তির কারণে এ প্রচেষ্টায় কোনও অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী বৈঠক শুরুর আগেই এই প্রচেষ্টাকে ‘নিরর্থক’ আখ্যা দিয়ে লেবানন সরকারকে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহ নেতা কাশেম নঈম সোমবার বলেছেন, এই আলোচনা ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াই করে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সমর্পণ করানোর জন্য একটি চাল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ এর জবাবে ইসরায়েলে হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েলও।
এখনও ইসরায়েল লেবাননে জোর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির অংশ হিসাবে লেবাননে হামলা বন্ধ করতেও ইসরায়েল অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনার পট প্রস্তুত হয় গত সপ্তাহান্তে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের মধ্যে এক নজিরবিহীন ফোনকলের মাধ্যমে। কারণ, দুই দেশের মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে দুই দেশ এই আলোচনায় বসতে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রদপ্তর এই বৈঠককে ‘হিজবুল্লাহর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসাবে অতি প্রয়োজনীয় বলে বর্ণনা করেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই করছে, লেবাননের সঙ্গে নয়। সেকারণে দুই দেশ আলোচনায় না বসতে পারার কোনও কারণ নেই।
এখন কেন আলোচনা?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হওয়ার পরও ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ করেনি। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
এই হামলার ফলে বহু মানুষ নিহত হওয়া ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত ইসরায়েলের হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও ছয় হাজার পাঁচশোর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
লেবানন বলেছে, দেশটিতে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করাই আলোচনার লক্ষ্য।
তবে ইসরায়েল বলছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা নয়, বরং হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণ করা নিয়ে তারা আলোচনা করতে চায়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয় গত সপ্তাহে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সেই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন পিড়ে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়ে দেশটিতে হামলা আরও জোরদার করেন।
এরপর তিনি লেবানন সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার ঘোষণা দেন।
আলোচ্যসূচি কি?
আলোচনার বিষয় হিসাবে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে একটি যুদ্ধবিরতি করা, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা, বৃহত্তর একটি শান্তি চুক্তির পথ খোঁজা। তবে দুইপক্ষ অনেকটাই ভিন্ন ভিন্ন আলোচ্যসূচি নিয়ে বৈঠক শুরু করতে চাইছে।
ইসরায়েল কি চায়?
ইসরায়েল লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণের পাশাপাশি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকতে পারে এমন একটি প্রকৃত শান্তিচুক্তি চায়।
এই লক্ষ্য অর্জনে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননকে তিনটি নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এমনটাই।
তিনটি নিরাপত্তা অঞ্চলের প্রথমটি হবে সীমান্ত থেকে ৮ মাইল দূরে। সেখানে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি থাকবে। যতদিন হিজবুল্লাহ পুরোপুরি নিরস্ত্র না হয় ততদিন পর্যন্ত থাকবে এই উপস্থিতি।
দ্বিতীয় নিরাপত্তা অঞ্চলটি হবে লিটানি নদী পর্যন্ত। সেখানে ইসলায়েলি বাহিনী অভিযান চালিয়ে যাবে। তবে ধীরে ধীরে এলাকার নিয়ন্ত্রণ তারা লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করবে।
তৃতীয় নিরাপত্তা অঞ্চলটি হবে লিটানি নদীর উত্তরে। সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপরই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পুরো দায়িত্ব থাকবে।
তবে ইসরায়েলের কর্মকর্তারা অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ লেবাননে একটি ‘বাফার জোন’ গড়ার পরিকল্পনার কথাও বলে আসছেন।
এই পরিকল্পনা কয়েক দশক আগে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে বাধার মুখে কয়েক দশক আগেই বাদ হয়ে গিয়েছিল।
লেবানন সরকারের অবস্থান:
ওয়াশিংটনের এই আলোচনাকে লেবানন ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডে বিরতি নিশ্চিত করার পথে একটি প্রাথমিক বৈঠক হিসাবেই দেখছে বলে জানিয়েছেন লেবানিজ সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘাসান সালামি।
তিনি সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার কাছে স্বীকার করেছেন যে, লেবাননের উদ্দেশ্যসিদ্ধির পথে কোনও সুবিধা নেই। তবে তিনি বলেন, সরকার নতুন করে রাষ্ট্রীয় কর্তত্ব খাটিয়ে লেবাননের সংঘাতকে ইরান সংঘাত থেকে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা নিয়েছে।
হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার ইসরায়েলের দাবির বিষয়ে সালামি বলেন, এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এটি কয়েকদিনেই বাস্তবায়ন করে ফেলা যাবে না।
গতবছর লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের চাপে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।
তবে হিজবুল্লাহ এই দাবিকে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণের সামিল বলে তা প্রত্যাখ্যান করে।
গোষ্ঠীটি ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, প্রথমে ইসরায়েলকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে হিজবুল্লাহ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলে হামলা শুরু করেছিল।
এরপর লেবাননের দক্ষিণ থেকে ইসরায়েলি সেনা সরিয়ে নেওয়া এবং ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর উপস্থিতি না থাকার শর্তে ২০২৪ সালে দুপক্ষে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
তবে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত না মেনে দক্ষিণ লেবাননে সেনা উপস্থিতি বহাল রাখে এবং প্রায় প্রতিদিনই হামলা অব্যাহত রাখে।