Published : 19 May 2026, 04:29 PM
একদিকে ভারতে দেখা দিয়েছে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার গাড়িচালকদের প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিন (মোটরযানের জ্বালানি) কিনতে গুনতে হচ্ছে ৬ ডলার করে।
আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনা দুটি ভিন্ন মনে হলেও আসলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকটেরই দুটি লক্ষণ। পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের ধাক্কা কীভাবে বিশ্বজুড়ে ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করছে, এ যেন তারই এক পরিষ্কার চিত্র।
হামলার শিকার ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে খনিজ তেলের সরবরাহ শিকল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ আছে।
ফলে আমদানিকারক দেশগুলো জ্বালানি সংকট সামাল দিতে তাদের আপৎকালীন মজুদ শেষ করতে বাধ্য হচ্ছে, এতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সংকট ।
এই বিশ্বব্যাপী সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের নেওয়া নিজস্ব কিছু জরুরি পদক্ষেপও পরোক্ষভাবে বিশ্বের অন্য প্রান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর অন্যতম উদাহরণ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সরবরাহ ধরে রাখার জন্য ভারত সরকারের মরিয়া প্রচেষ্টা।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে রান্নার প্রধান জ্বালানি হলো এলপিজি। যুদ্ধের আগে ভারতের মোট এলপিজি আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আসত পশ্চিম এশিয়া থেকে।
কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই সরবরাহ লাইন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় নয়াদিল্লি বাধ্য হয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোকে এলপিজির উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই নির্দেশ মানতে গিয়ে শোধনাগারগুলো ‘অ্যালকাইলেট’ নামক এক ধরনের মোটর জ্বালানি সংযোজনী (অ্যাডিটিভ) উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা মূলত এলপিজিকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি হতো।
ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য অ্যালকাইলেটের এই সরবরাহ কমে যাওয়া নতুন শঙ্কা তৈরি করছে। কারণ পশ্চিম এশিয়ার অপরিশোধিত তেল না পাওয়ায় এশিয়ার অন্য শোধনাগারগুলো ইতিমধ্যেই জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে, যা ক্যালিফোর্নিয়ায় গ্যাসোলিন সংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যালকাইলেটের চাহিদা অত্যন্ত বেশি, কারণ অন্য উপাদানগুলোর চেয়ে এটি তুলনামূলক কম দূষণ ঘটায় এবং ধোঁয়াশা কমাতে এখানে এই অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব নিয়মে তৈরি একটি বিশেষ মিশ্রণের গ্যাসোলিন ব্যবহার করতে হয়।
এই কারণেই যুদ্ধের ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার গাড়িচালকদের দ্বিমুখী সংকটে পড়তে হয়েছে: এশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি কমে যাওয়ায় তাদের মোটর জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা সরাসরি ধাক্কা খেয়েছে, অন্যদিকে ভারতের রান্নার গ্যাস বাঁচানোর নীতির কারণে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ মিশ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল বা অ্যাডিটিভ সংগ্রহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাসন হ্যামিল্টন জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ভারতে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সেখানকার শোধনাগারগুলো অ্যালকাইলেট উৎপাদন ও রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় ক্যালিফোর্নিয়ার গ্যাসোলিন বাজার বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।
রান্নার গ্যাসকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ভারত
জ্বালানি বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান জানান, ক্যালিফোর্নিয়ার চালকরা ইতোমধ্যেই ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যে গ্যাসোলিন কিনছেন। এর মধ্যে ভারতের অ্যালকাইলেট রপ্তানি কমায় গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে ঘাটতি ও দাম আরও বাড়বে। ক্যালিফোর্নিয়া এনার্জি কমিশন (সিইসি) পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে।
গত ৭ মে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ১৬ ডলারে পৌঁছানোর পর ক্যালিফোর্নিয়ায় খুচরা জ্বালানির গড় মূল্য এখন গ্যালন প্রতি ৬ দশমিক ১৪ ডলার। গ্যাসবাডির তথ্যমতে, সেখানে গ্যাসোলিনের মজুদ রেকর্ড সর্বনিম্নের কাছাকাছি।
ডি হান জানান, আগামী সপ্তাহে এই দাম গ্যালন প্রতি ৬ দশমিক ৫০ ডলার ছাড়াতে পারে।
কেপলারের প্রধান গবেষণা বিশ্লেষক নিখিল দুবে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর পরিবেশগত নিয়মের কারণে গ্রীষ্মে কম দূষণকারী জ্বালানি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় খরচ বাড়ে। ফলে দেশজুড়ে যেখানে গড় দাম ৪ দশমিক ৫২ ডলার, সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ায় খরচ অনেক বেশি।
বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরীণ এলপিজি সংকট এত তীব্র যে সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং কালোবাজারি চলছে; রেস্তোরাঁ ও হোটেল ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। ফলে গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এলপিজি উৎপাদন বাড়াতে অ্যালকাইলেট রপ্তানি কমিয়েছে।
কেপলারের তথ্যমতে, গত মার্চের দৈনিক ৬১,০০০ ব্যারেল অ্যালকাইলেট রপ্তানি এপ্রিলে প্রায় অর্ধেকে নেমে ৩৩,০০০ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন।
বিকল্প পথ সীমিত
নয়াদিল্লি যেভাবে এলপিজি সংকট মোকাবিলা করছে, ঠিক একইভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের হাতেও জ্বালানির দাম কমানোর বিকল্প পথ খুব সীমিত, যতক্ষণ না এই যুদ্ধ থামছে।
বিশ্লেষক ডি হান জানান, দাম কমানোর জন্য সাময়িকভাবে ট্যাক্স বা কর মওকুফের মতো পদক্ষেপ নিলে তা মূলত জ্বালানির চাহিদা আরও বাড়িয়ে দেবে।
এর ফলে অ্যালকাইলেটের সংকট আরও ঘনীভূত হবে এবং গ্রাহকদের আরও বড় ধাক্কা সইতে হবে। তিনি বলেন, “যে ব্যবস্থাটি ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে, তার ওপর আপনি নতুন করে চাপ বাড়াতে পারেন না।”
ডি হানের মতে, গভর্নরের সামনে এখন একমাত্র কার্যকর পথ হতে পারে ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর পরিবেশগত জ্বালানি নীতি সাময়িকভাবে শিথিল করা, যাতে অ্যালকাইলেটের ওপর নির্ভরতা কমে।
তিনি বলেন, “তার হাত বাঁধা। এটিই এখন তার একমাত্র উপায়।”
তবে সিইসি-র মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই মিশ্রণের নিয়ম শিথিল করলেও খুব একটা লাভ হবে না বলে তারা মনে করছেন।