Published : 09 Jul 2026, 07:52 PM
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন এনজিও ‘ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’র (এনইডি) প্রেসিডেন্ট ড্যামন উইলসন।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে-তে অনুষ্ঠিত ‘চায়না ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (সিআইটিডব্লিউ) সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
উইলসন বলেন, চীন বিশ্বব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে পুনর্গঠন করার চেষ্টায় তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। যার নেতিবাচক প্রভাবে গত বিশ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
দেশটিকে একটি ‘গণতন্ত্র-বিরোধী পরাশক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি, অথ্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বেইজিং এখন গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। নতুন নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে চীন তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একটি উক্তি টেনে উইলসন বলেন, শি প্রায়ই দাবি করেন, “বিশ্ব এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি।”
মূলত শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো একনায়কতান্ত্রিক নেতারা সম্মিলিতভাবে এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
ড্যামন উইলসন সতর্ক করে বলেন, নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য চীনের এমন কিছু সহযোগী এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়, যারা তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।
লক্ষ্য অর্জনে চীন দুর্নীতি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সীমানা পেরিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন-পীড়ন এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
গণতন্ত্র কখনওই নিজে নিজে টিকে থাকে না, বরং একে টিকিয়ে রাখতে হয়। ড্যামন উইলসনের মতে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানের মানুষকে দুর্বল করার জন্য 'গ্রে জোন' কৌশল (সরাসরি সংঘাত নয় বরং রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করা) ব্যবহার করছে।
উইলসনের মতে, বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হল তাইওয়ানের সমাজে বিভেদ তৈরি করা, জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়া, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমানো এবং মুক্ত বিশ্বকে এটা বিশ্বাস করানো যে, একনায়োকচিত শাসনই শেষ পর্যন্ত অবধারিত।
এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তাইওয়ান এখন স্বৈরাচার ও স্বাধীনতার মধ্যকার এই কৌশলগত লড়াইয়ের একদম সম্মুখভাগে অবস্থান করছে।
তবে এই সংকট মোকাবেলায় সামরিক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক সম্পর্ক জোরদার করে তাইওয়ান এখন বিশ্বের মুক্তকামী মানুষের জন্য একটি বড় মেলবন্ধনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রমনা দেশ, সংস্থা এবং নেতারা তাইওয়ানের দিকে ঝুঁকছেন এবং সেখানে একত্রিত হচ্ছেন।
তাইপে সম্মেলনে অংশ নিয়ে জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইন্দো-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বনি গ্লেসারও প্রায় একই সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে কেবল সামরিক সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, বরং পুরো সমাজে ‘সামগ্রিক প্রতিরোধ’ গড়ে তুলতে হবে।
গ্লেসারের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক যুদ্ধ ও ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাইওয়ান এখন গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতার একটি ‘জীবন্ত পরীক্ষাগার’ হয়ে উঠেছে।
গ্লেসারের কথায়, তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা কেবল তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এ কারণে যে, অন্যান্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশ এখন যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া শুরু করেছে, তাইওয়ান সেই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলা করেছে অনেক আগে থেকে এবং নিবিড়ভাবে।”
বিশেষ করে চীন থেকে আসা নানা হুমকি, গুজব বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মোকাবেলা করে তাইওয়ান যেভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, তা থেকে গোটা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এখন শিক্ষা নিতে পারে।