Published : 09 Jul 2026, 09:52 PM
সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে নিয়ে শ্বাসনালী কেটে হত্যার শিকার আট বছরের মেয়ে ইরা মনির স্মৃতি ভুলতে পারছেন না মা রোকেয়া বেগম।
ইরা মনির খুনির ফাঁসির আদেশ এলেও তার মা বলছেন, আসামির ফাঁসি কার্যকর হলেই কেবল একটু শান্তি পাবেন।
হত্যাকাণ্ডের চার মাস পর বৃহস্পতিবার আসামি বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছে আদালত; রায়ে খুঁশি রোকেয়া বেগম ও মনিরুল ইসলাম দম্পতি।
রায় ঘোষণার পর চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়ালয় ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের ষষ্ঠ তলায় কান্নায় ভেঙে পড়ে ইরা মনির মা বলেন, “অনেক কষ্ট দিয়ে নির্মমভাবে আমার মেয়েটারে মেরেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি দেখব না তার ফাঁসি হয়েছে, ততক্ষণ আমি শান্তি পাব না। আমার মনে অনেক কষ্ট মেয়েটার জন্য।
“মেয়েটা চলে গেছে। তাকে তো আর ফেরত পাব না। আমি তার (আসামি) ফাঁসি দেখতে চাই। তারপর আমরা একটু শান্তি পাব।”
মনিরুল ইসরাম ও রোকেয়া বেগমের তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ইরা মনি ছিল দ্বিতীয় সন্তান।
গত ১ মার্চ সকালে তাকে চকলেট কিনে দেওয়া আর বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, ঘর থেকে বের করে নিয়ে যান বাবু শেখ। পরে বাসে করে কুমিরা থেকে সীতাকুণ্ডে যান। সেখান থেকে হেঁটে তারা বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার পাহাড়ে যান।
ঘটনার দিন দুপুরে ওই পাহাড়ে সড়ক সংস্কার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ‘গলা কাটা অবস্থায়’ ইরা মনিকে দেখতে পান। জঙ্গল থেকে পায়ে হেঁটে শিশুটি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেছিল।

এরপর শ্রমিকরা শিশুটিকে নিয়ে যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে দুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩ মার্চ ইরা মনি মারা যায়।
মা রোকেয়া বেগম বলেন, “আমার মেয়ে কি সুন্দর তার (আসামি বাবু শেখ) সঙ্গে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে গেছিল। তারে নিয়ে এভাবে মেরে ফেলল!”
রায় ঘোষণার আগে চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস ইরা মনির মা-বাবার উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনাদের মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারব না। সেই সাধ্য কারো নেই। রাষ্ট্রের সদিচ্ছায় এই মামলায় তড়িৎ বিচার হয়েছে। আমরা চাই না, আর কারো সন্তান এভাবে মৃত্যুবরণ করুক।”
রায়ে আসামি বাবু শেখকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ এর ৭ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং একই আইনের ৯ ধারায় ১০ বছরের সাজা ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়।
বিচারক বলেন, “আসামির প্রতিটি অপরাধ প্রমাণিত। তাই কোনো অপরাধ বিনা সাজায় যেতে পারে না।”
রায় ঘোষণার আগে বিচারক এই হত্যা মামলায় অল্প সময়ে ও যথাযথভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে রহস্য উদঘাটন করায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সাধুবাদ জানান।
রায় ঘোষণার পর তদন্ত কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড থানার এসআই মো. কামরুজ্জামান বলেন, “এই মামলার ক্লু উদ্ধার করা একটু কঠিন ছিল। যেহেতু এটা পাহাড়ের ভিতরে ছিল। জেলা পুলিশ সুপার ও ওসি মহোদয়ের সহযোগিতায় মামলার রহস্য উদঘাটনে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভালোভাবে তদন্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।
“এই মেয়েটার সমবয়সী আমার নিজেরও একটা মেয়ে আছে। তদন্তে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে সেই চেষ্টা করেছি। দেশ ও জাতির কাছে প্রত্যাশা, আমাদের মেয়েরা ও শিশুরা যেন নিরাপদ থাকে।”
ইরা মনির বাবা মনিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রায়ে আমরা খুশি। একটা খুশির সাজা ঘোষণা হয়েছে। আরেকটা খুশি হইনি। সেটা হল, যতক্ষণ ওরে ফাঁসি দেওয়া হবে না ততক্ষণ শান্তি নাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফাঁসি কার্যকর চাই।”
ইরার মৃত্যুর পর ৩ মার্চ দুপুরে সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা এলাকা থেকে বাবু শেখকে (৪৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বাবু শেখের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার মধ্যম পুলুপাড়ায়। তিনি সীতাকুণ্ডে ইরা মনির পরিবারের পাশের ঘরে থাকতেন।
হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ইরা মনির বাবা মনিরুলের সঙ্গে বিরোধের জেরে তার আট বছরের মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা করে বাবু শেখ। এর অংশ হিসেবে শিশুটিকে ফুঁসলিয়ে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে নিয়ে প্রথমে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ এবং পরে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালান তিনি।
এ ঘটনায় ইরা মনির মায়ের করা মামলায় তদন্ত শেষে ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযোগ গঠন করা হয় ১৮ জুন। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২১ জুন থেকে।
বৃহস্পতিবার বিকালে রায় শেষে সবাই ফিরে গেলে বৃষ্টির মধ্যেই মনিরুল ইসলাম ও রোকেয়া বেগম দম্পতি সাত মাসের মেয়েকে নিয়ে বাসার পথে রওনা দেন। তখনো মেয়ের শোকে তাদের চোখে জল নামছিল বৃষ্টির মতই।
আরো পড়ুন-