১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

হুতি কারা, কী চায় তারা?

হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিরাও নিজেদের ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে ইরান-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

হুতি কারা,  কী চায় তারা?

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Oct 2026, 04:53 PM

Updated : 13 Oct 2026, 04:53 PM

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে চলছে তুমুল লড়াই।

গত সেপ্টেম্বরে হুতিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীর তীরবর্তী উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে গত ছয় মাসের যুদ্ধের পর হুতিদের এই অগ্রযাত্রা বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দামকে আরও উসকে দেয়।

এরপর অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলার সহায়তায় বড় ধরনের পাল্টা অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন কৌশলগত এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দাবি করে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী।

এই বিমান হামলার জবাবে হুতিরা প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করে। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমনই এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের মাটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা।

হুতি কারা?

হুতি মূলত উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা দেশটির জায়দি শিয়া সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় লড়াই করে আসছে। ‘জায়দিবাদ’ হলো শিয়া ইসলামের একটি শাখা।

হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি হুতিরাও নিজেদের ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে ইরান-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-এর অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে গোষ্ঠীটি ‘আনসারুল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্যকারী) নামে পরিচিত। ১৯৯০-এর দশকে তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুতির হাত ধরে এই আন্দোলনের সূচনা হয় এবং তার নামানুসারেই এই গোষ্ঠীর নাম রাখা হয় হুতি। ২০০৪ সাল থেকে হুসেইনের ভাই আব্দুল মালিক আল-হুতি গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পালন করছেন।

২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের অঞ্চলের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দেশটির তৎকালীন দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে দফায় দফায় বিদ্রোহে জড়ায় হুতিরা।

২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর গণঅভ্যুত্থানের মুখে সালেহ তাঁর উপ-রাষ্ট্রপতি আবদরাব্বুহ মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। তবে হাদির সরকার নানামুখী সংকটে পড়লে হুতিরা উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশ দখল করে এবং ২০১৪ সালে রাজধানী সানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

২০১৫ সালে তারা পশ্চিম ইয়েমেনের বিশাল অঞ্চল দখল করে প্রেসিডেন্ট হাদিকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। এর পরপরই ইয়েমেনি সরকারের পক্ষে সরাসরি সামরিক অভিযানে নামে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, এরপর থেকে চলা রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট। বর্তমানে দেশটির দুই কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন।

হুতিদের সামরিক শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ গোষ্ঠীটির সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন লাখে। ইয়েমেনের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বসবাস করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টতা কীভাবে?

সানায় সরকারের পতনের পর সৌদি আরবের প্রধান আশঙ্কা ছিল, হুতিরা পুরো ইয়েমেন দখল করে দেশটিকে তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

নির্বাসিত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে আরব দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি জোট গঠন করে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি আরব। এই অভিযানে তাদের গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক রসদ দিয়ে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।

তবে বছরের পর বছর বিমান হামলা এবং ইয়েমেনি সেনা ও হুতিবিরোধী মিলিশিয়াদের স্থল অভিযান সত্ত্বেও দখল করা এলাকাগুলো থেকে হুতিদের হঠাতে পারেনি জোট।

২০২২ সালে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত অনেকটাই থেমে যায়। ওই বছরই প্রেসিডেন্ট হাদি তার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন নতুন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল’-এর কাছে, যা বর্তমানে এডেনভিত্তিক সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলের দিকে এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে হুতিরা।

বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সুরক্ষায় লোহিত সাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে পশ্চিমা দেশগুলো। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল। ইসরায়েলি হামলায় হুতিদের স্বঘোষিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির পর হুতিরা ইসরায়েলে হামলা সাময়িক বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালানোর পর তারা আবারও হামলা শুরু করে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত কীভাবে?

হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যকার অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু করে গত জুলাই মাস থেকে।

সৌদি আরবের ওপর ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ জারির ঘোষণা দিয়ে দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরের ট্যাংকারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে শুরু করে হুতিরা। তাদের দাবি ছিল, হুতি-নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে সৌদি অবরোধ এবং জুলাইয়ে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাবেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

এরপর সেপ্টেম্বরে বিদ্যুৎগতির এক অভিযানে দক্ষিণ-পশ্চিম লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) এলাকা দখল করে নেয় হুতিরা, যার মধ্যে রয়েছে কৌশলগত মোখা বন্দর ও পেরিম (মায়্যুন) দ্বীপ।

এর মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে গোষ্ঠীটি। তবে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে কোনও হুমকি নেই বলে দাবি করে তারা।

চলতি অক্টোবরে হুতিদের দখলে থাকা সব এলাকা পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয় ইয়েমেন সরকার। সৌদি আরবের তীব্র বিমান হামলার সহায়তায় বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন এলাকা সরকারি বাহিনী পুনরুদ্ধার করেছে বলে জানানো হলেও হুতিরা অঞ্চল হারানোর দাবি অস্বীকার করেছে।

সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং জাতিসংঘের হিসাবে নতুন করে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

হুতিদের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছিল।

এর সঙ্গে সৌদি বিমানবন্দর এবং তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হুতিদের লাগাতার ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে সৌদির ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে’ হামলার ঘটনা ঘটে, যার পেছনে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করা হয়।

এই অস্থিরতা পশ্চিমা শক্তিগুলোকেও নতুন করে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে রক্তক্ষয়ী হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও “সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের” স্বার্থে সৌদি যুদ্ধবিমানকে মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য সামরিক বিমান মোতায়েন করতে রাজি হয়েছে।

হুতিদের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা কে?

জাতিসংঘ আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের পুরো সময়ে ইরান হুতিদের কাছে ড্রোন, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ আধুনিক অস্ত্র পাচার করেছে বলে দাবি করে আসছে সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো।

২০২৪ সালে জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানায়, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি), লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি বিশেষজ্ঞদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সহায়তায় হুতিরা একটি পুরোদস্তুর আধুনিক সামরিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৬ সালের মে মাসে ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’ (সিএআর)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে তেহরান সরাসরি তৈরি অস্ত্র পাঠালেও এখন তারা বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে, যা নিজেদের ভূখণ্ডেই হুতিরা সংযোজন করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে হুতিদের হাতে ক্রমশ উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তুলে দিচ্ছে ইরান।

তবে হুতিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে তেহরান। তাদের দাবি, গোষ্ঠীটির প্রতি তাদের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।