Published : 11 May 2026, 03:00 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন জোরদার হয়ে উঠছে, তখন আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তাকে তছনছ করে দিচ্ছে বলে নতুন তথ্যউপাত্তে উঠে এসেছে।
“জনগণকে পরিস্থিতি এবং দেশে যেসব বিধিনিষেধ আছে তা বাস্তবতার নিরিখে বুঝতে হবে,” মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণ নিয়ে আলোচনায় রোববার জড়ো হওয়া একদল কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে রোববার এমনটাই বলেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
“এই পথে অসুবিধা ও সমস্যা থাকবে এটাই স্বাভাবিক, তবে জনগণের সহযোগিতা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে,” তিনি এমনটাই বলেছেন বলে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আল জাজিরা।
পেজেশকিয়ানের মন্তব্যের আগের দিনই ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র (এসসিআই) ২০ এপ্রিল শেষ হওয়া ফারসি ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস ফারভারদিনে আগের বছরের তুলনায় ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির খবর দিয়েছিল। আগের মাসের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ৫% বেড়েছে বলেও জানিয়েছিল তারা।
ভিন্ন পদ্ধতি ও তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার বের করা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য বলছে আগের বছরের তুলনায় এবারের ফারভারদিনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭%, আগের মাসের তুলনায় ৭% বেশি।
দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যে খানিকটা গরমিল থাকলেও ইরানে মূল্যস্ফীতি যে হু হু করে বাড়ছে তা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, এবং এটি ইরানিদের ক্রমশ আরও দরিদ্র করে তুলছে।
তেহরানের এক বাসিন্দা আল জাজিরাকে বলেছেন, গত মাসেও তিনি এমন অনেক কিছু কিনতে পেরেছেন, যা এ মাসে পারছেন না।
“কেবল আমি-ই নই, আমার মনে হয় সমাজের বেশিরভাগ মানুষই এখন তাদের চাওয়া অনুযায়ী অনেক কিছু কিনতে পারছেন না,” বলেছেন এ নারী।
এসসিআই এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়ের দেওয়া তথ্যেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি যে অনেক বেশি তাও দেখা যাচ্ছে। অর্থ্যাৎ, লোকজনকে এখন তাদের কমতে থাকা বেতনের সিংহভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই খরচ করতে হচ্ছে।
এসসিআই-এর হিসাব বলছে, ফারসী বছরের প্রথম মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের বছরের তুলনায় ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, কিছু কিছু অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে তিনগুণ।
এর মধ্যে ডালডা’র (কঠিন উদ্ভিজ্জ তেল) দাম বেড়েছে ৩৭৫%, তরল রান্নার তেল ৩০৮%, আমদানি করা চাল ২০৯%, ইরানি চাল ১৭৩% ও মুরগির দাম ১৯১% বেড়েছে। সবচেয়ে কম বেড়েছে মাখনের দাম—৪৮ শতাংশ। এরপর আছে শিশুখাদ্য ৭১%, পাস্তা ৭৫%।
রাজধানীতে একটি কলিজার কাবারের দোকানে কাজ করা তরুণ মাজিদ বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের দোকানে খাবারের দাম তিনবার বাড়ানো হয়েছে।
“কলিজার দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা যখন সরবরাহকারীদের কাছে এর কারণ জিজ্ঞাসা করি, তখন তারা হয় ঘাটতির কথা বলে, নয়তো বলে ভেড়া রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে। সত্যি বলতে কী, কোনো নজরদারি নেই,” ভাষ্য তার।
রাষ্ট্র-পরিচালিত ভোক্তা ও উৎপাদনকারী সুরক্ষা সংস্থা শনিবার ইরানজুড়ে ৩১ গভর্নরকে পাঠানো এক নির্দেশনায় রান্নার তেলের দাম বৃদ্ধিকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে তা আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে বলেছে। তবে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা কীভাবে এটা ঘটার প্রত্যাশা করছে, সে সম্বন্ধে এতে কিছু বলা হয়নি।

দেশটির সঙ্কট জর্জরিত মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড পতনও গত দুই সপ্তাহ ধরে অব্যাহত আছে। রোববার বিকালে খোলাবাজারে এক ডলারের বিপরীতে মিলছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল, এক বছর আগেও যা ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার।
ভর্তুকি ও ‘শত্রুর চক্রান্ত’
মূল্যস্ফীতির এ নাভিশ্বাস মোকাবেলায় সরকার ভর্তুকি ও নানা ধরনের কুপন দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে; একইসঙ্গে জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধির অন্যতম কারণ মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানও চালাচ্ছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ দিয়ে রাখায় এসব পদক্ষেপ সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না।
রোববার ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাবের জবাব পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠিয়েছে তারা।
পেজেশকিয়ান বলেছেন, “যদি আলোচনা নিয়ে কথা হয়ও, তা আত্মসমর্পণ বোঝায় না।”
সরকার এখন নির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মাসিক নগদ ভর্তুকি ও ইলেকট্রনিক কুপন দিলেও জনপ্রতি তার পরিমাণ ১০ ডলারেরও কম। কর্তৃপক্ষ এ ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর কথা ভাবলেও ব্যাপক বাজেট ঘাটতি এমন পদক্ষেপ নেওয়ার পথকে জটিল করে তুলেছে।
পেজেশকিয়ান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদুলনাসের হেমমাতি বলছেন, তারা দামবৃদ্ধি সম্বন্ধে অবগত। দুজনই এজন্য ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধকে দায় দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি তারা দামে কারসাজি ও মজুদদারির বিরদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজও করছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের অনেক আইনপ্রণেতা, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো জিনিসপত্রের অত্যধিক দামবৃদ্ধিকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
তাদের মতে, লাগামহীন এ দামবৃদ্ধি মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ শত্রুদের ‘অর্থনৈতিক প্রতিশোধের’ অংশ।
“আমি চাই লোকজন যেন শত্রুদের সৃষ্ট দামবৃদ্ধিতে বোকা না বনে। অসাধারণ অনেক কিছু হয়েছে, সামনেও অসাধারণত অনেক কিছু অপেক্ষা করছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক সাফল্য অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অতুলনীয়,” শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ওফোগ চ্যানেলে এক অতিথিকে এমনটাই বলতে শোনা যায়।
এদিকে ইন্টারনেট প্রায় বন্ধ রাখায়ও নানান সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে টানা প্রায় ১১ সপ্তাহ ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট অনেকটাই অচল করে রাখা হয়েছে।
সরকারের অনেক কর্মকর্তা, ইন্টারনেট অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলো এবং সরকার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাও এখন কার্যকর থাকা স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কিন্তু এ নিয়ে তাদের অন্তত করার কিছু নেই; কেননা দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশে এই ‘ব্ল্যাকআউট’ চলছে, যা যুদ্ধ না শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় অব্যবস্থাপনা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, যুদ্ধ আর ইন্টারনেট বন্ধ—সবই ইরানি জনগণ আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে।
“দেশের স্টার্টআপ বাস্তুতন্ত্র শেষ হয়ে গেছে, আমরা এর সমাধিফলক খুঁজছি,” শনিবার এক বিবৃতিতে এমনটাই বলেছে দেশটির ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গিল্ড অ্যাসোসিয়েশন।