Published : 09 Jul 2026, 09:54 AM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে ‘তীব্র আঘাত’ হানার ইঙ্গিত দেওয়ার পরপরই ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে বিবিসি লিখেছে, হরমুজ প্রণালির বন্দর নগরী সিরিক ও বন্দর আব্বাসসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছে।
মঙ্গলবার রাতভর উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ ঘটনা ঘটল।
সবশেষ হামলার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লিখেছেন, “জাহাজে গতকাল ইরানের বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। এমনটা আবারও ঘটলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে!”
ইরান এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হামলার ‘তাৎক্ষণিক জবাব’ দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলছে, গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলার প্রশ্নে তেহরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে’ এই হামলা চালানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, “একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অযৌক্তিক আগ্রাসনের জন্য ইরানকে দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র।”
কোনারক, চাবাহার শহরসহ ইরান উপকূলের অন্যান্য এলাকায় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং সিরিক ও জাস্ক বন্দর নগরীতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এসব এলাকায় দক্ষিণ ইরানে পড়েছে।
টেলিভিশনটি বলছে, দুটি প্রজেক্টাইলে আবু মুসা দ্বীপে আঘাত হেনেছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্দর আব্বাসে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলায় ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যম চাবাহারে বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং বুশেহরে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একটি ব্যারাকে আগুন লাগার খবর দিয়েছে।
ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, চাবাহারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত সচল করা হয়েছে এবং তৃতীয়টি খুব শিগগির চালু হবে।
বুধবার সন্ধ্যায় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল’ এবং তারা একটি চুক্তি করতে ‘খুবই মরিয়া’ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এও বলেন, “আমি ঠিক জানি না যে তারা আদৌ চুক্তি করার উপযুক্ত কি না; আমি জানি না যে তারা চুক্তিটিকে সম্মান করবে কিনা, এটাই সমস্যা।”
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে তারা ‘শক্তিশালী’ হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরান বুধবার দাবি করে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর মঙ্গল ও বুধবারের সংঘাতই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা।
ট্রাম্প বুধবার বলেন, গত মাসে ইরানের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘শেষ’ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “গত রাতে তাদের ওপর খুব শক্ত আঘাত হেনেছে” এবং “সম্ভবত আজ রাতেও তাদের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।”
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে চাই না, ওরা হচ্ছে নিচু জাতের মানুষ। আপনারা জানেন নিচু জাতের মানুষ কাকে বলে? তারা নিচু জাতের মানুষ। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।”
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক্স পোস্টে বলেন, “আমরা অসভ্যতার জবাব অসভ্যতা দিয়ে দিই না, বরং কাজ দিয়ে দিই: নির্ভীকভাবে এবং অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিতে ১৪টি শর্ত ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল—৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, এই সময়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা; হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের এ মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তবে ট্রাম্প বলছেন, তিনি পরবর্তী আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ হিসেবেই দেখছেন।
সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর এটিই প্রথম হামলার ঘটনা নয়। গত ২৬ জুন হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ইরানি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর দেশটির ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর ২৭ জুন একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনার জেরে আবারও মার্কিন হামলার ঘটনা ঘটে। তবে মাসটির শেষ দিকে উভয় পক্ষ ‘সংযত থাকতে’ সম্মত হয়েছিল।