লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের নিশানা করছে শত্রুরা: সেন্টকম
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর রন ওয়াইডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পেণ্টাগনের মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত মোবাইল লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের নিশানা করছে শত্রুপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর রন ওয়াইডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে।
ঘটনাটি যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি ও সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগনকে প্রায় এক দশক ধরেই এই বিপদের বিষয়ে সতর্ক করে এসেছিলেন তাদের নিজ ঠিকাদার, বিশ্লেষক এবং গোয়েন্দারা।
এবার সামনে আসা পেন্টাগনের সেন্টকমের নতুন চিঠিতে- এই বাস্তবতাই প্রকাশ পেয়েছে যে, ওই সতর্কবার্তা এতদিন আমলে নেওয়া হয়নি। সেন্টকম এখন যুদ্ধক্ষেত্রে সেই বিপদই ঘটতে দেখছে বলে নিশ্চিত করল।
সিনেটর ওয়াইডেনকে দেওয়া চিঠিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, “যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু বা নজরদারি করতে শত্রুপক্ষ বাণিজ্যিক লোকেশন ডেটার অপব্যবহার করছে, এমন একাধিক হুমকির রিপোর্ট তারা পেয়েছে।”
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী প্রযুক্তি বা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা বিক্রি হয় ডেটা ব্রোকারদের কাছে। এই বাণিজ্যিক ডেটা ব্যবহার করে শত্রুরা সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদেরকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকান সেনাদের খোঁজ বের করতে এই ডেটা ব্রোকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে ব্যবহার হচ্ছে- সেন্টকমের চিঠিটি এর প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি। রন ওয়াইডেন চিঠিটি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে শেয়ার করেছেন। গত ১৪ এপ্রিল পাঠানো এই চিঠিতে হৃমকির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি।
তবে সেন্টকমের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর রয়েছে, যেখানে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর উত্তেজনা বিরাজ করছে। এসব সংবেদনশীল অঞ্চলেই একাধিক হুমকির খবর পাওয়ার কথা জানাল সেন্টকম।
সিনেটর ওয়াইডেনসহ দ্বিদলীয় একদল আইনপ্রণেতা বৃহস্পতিবার পেন্টাগনকে দেওয়া এক চিঠিতে বলেছেন, কোনও সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনারা যে এভাবে নিশানা হচ্ছে, সেটি এই প্রথম সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হল। পেন্টাগনকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে মার্কিন সেনারা কোথায় জড়ো হচ্ছেন এবং তাদের দৈনন্দিন গতিবিধি কেমন, তা চিহ্নিত করা সম্ভব। শত্রুপক্ষ এই তথ্যের অপব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং রাস্তার পাশে বোমা (রোডসাইড বোম) হামলা চালাতে পারে।”
ওয়াইডেন এক বিবৃতিতে বলেন, এখন সময় এসেছে “বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি (অ্যাডটেক) শিল্পকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার।”
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের জন্য লোকেশন ডেটা এখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বড় আয়ের উৎস। স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিভাইস থেকে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে ডেটা ব্রোকারদের কাছে তা বিক্রি করে। পরে এসব তথ্য পুনরায় বিক্রি হয়, কখনও কখনও তা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বা জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও বিক্রি হয়।
এর আগে ২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এই বাণিজ্যিক ডেটা ব্যবহার করে মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্যদের সিরিয়ার একটি সংবেদনশীল ঘাঁটি পর্যন্ত ট্র্যাক করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। সম্প্রতি জার্মানির ১১টি মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা ঘাঁটির কর্মকর্তাদের নিখুঁত গতিবিধিও এভাবে ফাঁস করা হয়েছে।
আইনপ্রণেতারা বলেছেন, এই ঝুঁকির কথা আগে থেকেই জানা থাকায় সামরিক কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় পেন্টাগনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। সরকারি ডিভাইসে থাকা বিজ্ঞাপনের আইডি নিষ্ক্রিয় করা, স্বয়ংক্রিয় লোকেশন শেয়ারিং বন্ধ করা এবং গুগলের ক্রোম ব্রাউজারের পরিবর্তে সুরক্ষামূলক বিকল্প ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আইনপ্রণেতাদের একজন প্যাট হ্যারিসন বলেন, ক্রোমের মতো ব্রাউজারগুলো ব্যবহারকারীর ডেটা সংগ্রহের জন্যই তৈরি, যা শত্রুপক্ষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার শামিল। গুগল অবশ্য দাবি করেছে যে, ক্রোমে শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা ডেটা ব্রোকারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পক্ষে। এই বিষয়ে পেন্টাগন কোনও মন্তব্য করেনি।
