Published : 28 Mar 2026, 06:56 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রাতে যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তাতে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে ইরানের হাতে আর নয় দিন সময় রয়েছে।
এর মধ্যে চুক্তি না হলে সময়সীমা বাড়ানো হতেই পারে। কিন্তু একেকটি দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানে মার্কিন স্থল হামলার প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস মনে করছে, স্থল হামলার ভয়ে ইরান নতি স্বীকারে বাধ্য হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।
মার্কিন বাহিনীর ৩১তম ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ (এমইইউ) সাধারণত জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থান করে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে সেটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে।
এর বাইরে ক্যালিফোর্নিয়ার মেরিন কোর বেস ক্যাম্প পেন্ডলটন থেকে পাঠানো ১১তম নৌ ইউনিট পৌঁছানোর কথা এপ্রিলের মাঝামাঝিতে।
প্রতিটি ইউনিটে একাধিক যুদ্ধজাহাজ থাকে। একেকটি ইউনিটে প্রায় ২ হাজার ৫০০ নৌসেনা, ওসপ্রে টিল্টরোটর হেলিকপ্টার, ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং স্থল ও বিমান হামলা চালানোর যান থাকে।
প্রতিটি ইউনিটে ১২০০ থেকে ১৫০০ সেনা থাকে, যারা উপকূলে নামতে সক্ষম এবং একবার রসদ নিয়ে টানা ৩০ দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন।
এর বাইরে ৮২তম পদাতিক ডিভিশন থেকে দুই হাজার প্যারাট্রুপার উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করেছে পেন্টাগন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রায় প্রতিটি মার্কিন সংঘাতে অংশ নেওয়া এই অভিজাত ইউনিট বিশ্বের যেকোনো স্থানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যেতে পারে। তারা শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডে প্যারাশুটের মাধ্যমে নেমে বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দখল করতে সক্ষম।
শুক্রবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, দুটি নৌ ইউনিট ও প্যারাট্রুপারের বাইরে আরো ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় রয়েছে।

স্থল হামলার রসদ জড়ো করার ক্ষেত্রে কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি এবং কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানকে বেছে নেওয়া হতে পারে।
এসব ঘাঁটিতে আগে থেকেই সামরিক নানা অবকাঠামো থাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে বিমান হামলা চালাতে পারবে মার্কিন বাহিনী।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ লিখেছে, একেকটি লক্ষ্য অর্জনে আলাদা আলাদা স্থল হামলার প্রয়োজন পড়বে।
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালিতে খার্ক দ্বীপের অবস্থান ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে। আট বর্গমাইলের চেয়ে ছোট এ দ্বীপ থেকে ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ ছাড় হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, খার্ক দখল করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যতটা কঠিন, ধরে রাখাটা তার চেয়ে বেশি কঠিন; মারাত্মক পরণতিও ডেকে আনতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর খার্ক দ্বীপে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এক দফা বিমান হামলা চলায় মার্কিন বাহিনী।
মার্কিন স্থলবাহিনী নামার সম্ভাব্য অন্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫৮৮ বর্গমাইলের কেশম দ্বীপ। এর অবস্থান খার্ক থেকে আরও দক্ষিণে। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটি ইরান এই দ্বীপ থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রণালির পশ্চিম প্রবেশমুখের কাছে অবস্থিত তিনটি দ্বীপ— আবু মুসা, গ্রেটার ও লেসার তুনব দখলের নির্দেশও দিতে পারেন ট্রাম্প।
আবু মুসা দ্বীপের দাবিদার সংযুক্ত আরব আমিরাতও। যদিও সেখানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অত্যাধুনিক সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে লারাক দ্বীপ। হরমুজ প্রণালির সরু অংশের এ দ্বীপ কব্জায় নিতে পারলে নৌযানগুলোকে ইরানি হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া সহজ হবে।
উপকূলীয় আক্রমণ
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত হলে। সেখানে ১০ থেকে ১২ হাজার সেনা মোতায়েন হতে পারে।
এ ধরনের অভিযানে মার্কিন বাহিনীর মূল লক্ষ্য হবে, উপকূল এলাকা থেকে ইরানি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করা। হরমুজ প্রণালির দিকে তাক করানো পাথুরে ভূখণ্ডের গভীরে স্থাপন করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সাইলো নেটওয়ার্কও ধ্বংস করতে হবে ট্রাম্প বাহিনীকে।
তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় তাদের সামরিক বাহিনীর ১০ লাখ সদস্য প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের হাতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ যে ইউরেনিয়াম থাকার কথা বলা হচ্ছে, সেটা দেখতে সাদা স্ফটিকের মতো। ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড নামের এই ধাতু ইস্পাতের সিলিন্ডারে সংরক্ষিত থাকে।
ম্যাসাচুসেট্স ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) জ্যেষ্ঠ পারমাণবিক গবেষক অস্টিন লং বলেন, এই ইউরেনিয়াম বিস্ফোরক দিয়ে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা যায় না। সিলিন্ডারে ছিদ্র হলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক গ্যাস নির্গত করে।
ইস্পাহান থেকে এগুলো উদ্ধার করে আনতে হলে মার্কিন সেনাদের একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। এরপর তাদেরকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করতে হবে; পাল্টা হামলার ঝুঁকি তো আছেই।

এছাড়া ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম ইস্পাহানের বাইরে আরো দুটি স্থানে ছড়িয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে একাধিক অভিযানের দরকার পড়বে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সিএনএন লিখেছে, ইরান খার্কের সৈকতে মাইন পেতে রেখেছে, ফাঁদ (বুবি-ট্র্যাপ) বসিয়েছে এবং সেখানে বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রসহ সেনা মোতায়েন করেছে। সমুদ্রপথে অগ্রসর হলে সেনারা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে থাকবে। আকাশপথে অবতরণও জটিল, কারণ বিমানঘাঁটির রানওয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বীপটি দখল করা গেলে ইরানের অর্থায়নের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে দখল ধরে রাখতে হলে পাল্টা হামলার ঢেউ সামলাতে হবে।
পারমাণবিক হুমকি নিষ্ক্রিয় করা
বৃহস্পতিবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দখলের জন্য তিনি কোনো অভিযানের পরিকল্পনা করছেন কিনা, তা তিনি প্রকাশ করবেন না।
তবে তিনি এমন অভিযানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচও করেননি। এ ধরনের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে ফোরদো বা অন্যান্য শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত সংরক্ষণস্থলের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে। ১২ দিনের যুদ্ধে ব্যাপক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবেশপথের ধ্বংসস্তূপ সরাতে খননযন্ত্রের প্রয়োজন হবে।
আরো পড়ুন
ইরান যুদ্ধে জড়াল হুতিরা, হুমকিতে সুয়েজ খাল?
সৌদি আরবে বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত
আলোচনার আড়ালে ট্রাম্প কি স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করল ইরান, জাহাজ চলাচলে কড়া হুঁশিয়ারি
ইরানে 'চূড়ান্ত হামলার' প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প: মার্কিন সংবাদমাধ্যম
ট্রাম্পের জন্য খার্ক দখল যতটা কঠিন, ধরে রাখা আরো কঠিন
মধ্যপ্রাচ্যে 'আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর' কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ইরানি জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা আরও ১০ দিন স্থগিত, বললেন ট্রাম্প