Published : 05 Nov 2025, 01:10 AM
চীনের প্রভাব মোকাবেলায় তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানে সোমবারের ভূমিকম্পের পর দেশটির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ত্রাণ সহায়তা জোরদার করছে ভারত।
ভারত উপদ্রুত ওই অঞ্চলের দুর্যোগে দ্রুত সাড়া দেওয়া দেশ হিসাবে নিজেদের তুলে ধরছে- বলছেন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা।
ভূমিকম্পের পরই তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিকে প্রথম যারা ফোন করেছেন, তাদের মধ্যে আছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর।
তিনি জানিয়েছেন, সোমবার আকাশপথে ২১ টন ত্রাণ সামগ্রী আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৫ টন খাবার, কম্বল, তাঁবু, হাইজিন কিট, পানির ট্যাঙ্ক, জেনারেটর, রান্নার জন্য ব্যবহৃত বাসনপত্র, পানি শোধনের ছোট যন্ত্র, স্লিপিং ব্যাগ, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, হুইলচেয়ার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ওয়াটার পিউরিফিকেশন ট্যাবলেট, ও আর এস এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী।
মন্ত্রী বলেন, আফগানিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে ভারত নজর রাখছে। আগামী দিনে আরও ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হবে। ওদিকে, চীন মঙ্গলবার বলেছে, তারাও ভূমিকম্প বিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শহর মাজার-ই-শরিফের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ৯০০’র বেশি মানুষ।
রোববার সেখানে ভূমিকম্প হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬.৩; উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২৮ দশমিক কিলোমিটার গভীরে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ভূমিকম্পে বলখ প্রদেশের রাজধানী শহর মাজার-ই-শরিফের ঐতিহাসিক নীল মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাজার-ই-শরিফের লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ ২৩ হাজার।
কর্মকর্তারা জানান, ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলখ ও প্রতিবেশী প্রদেশ সামাংগান। মাজার-ই-শরিফের সবচেয়ে পবিত্র মাজার নীল মসজিদের অংশ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আফগানিস্তানের এই কঠিন সময়ে ভারত ও চীন দুই দেশই তালেবানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে আগ্রহী- বলেন নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন থিংক ট্যাংকের ফরেইন পলিসি স্টাডিজ এর প্রধান হার্শ প্যান্ট।
ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহে উষ্ন হয়েছে। যদিও দুই দেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা আছে।
হার্শ প্যান্ট বলেন, “আফগানিস্তানে ভারতের ত্রাণ সহায়তা নিয়ে তৎপর হওয়ার পেছনে আছে সেখানকার স্থানীয় জনগণের কাছে একটি ভাল ভাবমূর্তি তৈরি করা।”
তিনি আরও বলেন, “পশ্চিমারা চলে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা ভারত পূরণ করতে পারার সম্ভাবনা নেই। তবে ভারত যদি এই চেষ্টা না করে তাহলে চীন সেই শুন্যস্থান পূরণ করবে।”
ভারত গত মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলেও দূতাবাস নতুন করে খোলার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো গড়ে তুলতেও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।
ভারতের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আফগানিস্তানে ভারতের দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক সংকেত পাঠায়। সেটি তালেবানের স্বীকৃতি না হলেও আফগানিস্তানের মাটিতে ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতি বটে। পরবর্তীতে আরও সাহয্য-সহযোগিতা করা হবে বলে জানান তিনি।
সোমবার আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শহর মাজার-ই-শরিফের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের কাজে নেমেছেন।
আফগানিস্তান ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে, শত শত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কোনো বাড়ি পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে, আবার কোনো বাড়ি আধা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
ভূমিকম্প কেন্দ্রের কাছাকাছি তাঙ্গি তাশকুরগান এলাকায় মঙ্গলবার স্থানীয়রা ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার কাজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের কাজ চালাচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইয়াসিন জানান, “দোকানগুলোর ভিতরে গেলে ভয় লাগে, যে কোনো মুহূর্তে তা ধসে পড়তে পারে, হয়তো এখনই বা ১০ মিনিটের মধ্যে।
ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত আফগানিস্তান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। এর আগে গত অগাস্ট মাসের শেষে পূর্ব আফগানিস্তানে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
আফগানিস্তান প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ, তবে ভূমিকম্প সবচেয়ে প্রাণঘাতী। প্রতি বছর প্রায় ৫৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৮ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়।
ওই অঞ্চলের অধিকাংশ ঘর কাদামাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ধসে পড়ে এবং অনেক মানুষ ভেতরে আটকা পড়ে যায়। সে কারণে প্রাণহানিও হয় বেশি।
বিশেষজ্ঞরা নতুন ভবন পাকাপোক্ত ভাবে তৈরি এবং পুরনো ভবন মেরামত করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে ধসের সম্ভাবনা কমানো যায়।