Published : 29 Apr 2026, 04:15 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পার করা ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখন কোনো অবিসংবাদিত ধর্মীয় নেতার একচ্ছত্র দখলে নেই; অতীতের ধারাবাহিকতায় এই ছেদ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন আলোচনার কথা ভাবা তেহরানের অবস্থানকে ক্রমশ কঠোর করে তুলতে পারে।
১৯৭৯ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি কোনো না কোনো এক ধর্মীয় নেতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে; রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেবল তার-ই থাকতো।
কিন্তু এবারের যুদ্ধের শুরুর দিনই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা এবং পরে তার আহত ছেলে মুজতাবার সর্বোচ্চ নেতার পদে আরোহন ভিন্ন এক ব্যবস্থার সূচনা করেছে, যেখানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডারদের প্রতাপ আছে, কিন্তু নেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিদ্ধহস্ত, কর্তৃত্বপূর্ণ কোনো মধ্যস্থতাকারী।
মুজতাবা খামেনি এখনও এই ব্যবস্থার কেন্দ্রেই আছেন, কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার বদলে তার ভূমিকা দাঁড়িয়েছে মূলত জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদন, অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জ্ঞাত তিন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এসবই বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
যুদ্ধকালীন চাপ শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ক্ষমতাকে আরও সঙ্কুচিত, কট্টরপন্থি কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে এনেছে, যাদের পরিধি সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এসএনএসসি), সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় ও আইআরজিসি-তে বিস্তৃত। এ তিনের মধ্যে আইআরজিসি-ই এখন সামরিক কৌশল ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রভাব রাখছে, বলছেন ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা।
“ইরানি এত ধীরগতিতে সাড়া দেয়, যা যন্ত্রণাদায়ক। মনে হচ্ছে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক কোনো কমান্ড কাঠামো নেই। কখনো কখনো তাদের প্রতিক্রিয়া পেতে ২-৩ দিনও লেগে যায়,” বলেছেন ঊর্ধ্বতন এক পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা, যিনি ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা বিষয়ে বিশদ অবগত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে তেহরানের ভেতরকার অন্তর্কোন্দল বাধা নয়, বাধা হল—ওয়াশিংটন যা দিতে প্রস্তুত, আর ইরানের কট্টরপন্থি আইআরজিসি যা নিতে আগ্রহী, তার মধ্যে থাকা ফারাক।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় এতদিন ইরানের কূটনৈতিক মুখ ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি, সম্প্রতি তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পার্লমেন্টের স্পিকার বাকের কলিবফ, যিনি একাধারে আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার, তেহরানের সাবেক মেয়র ও প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী ছিলেন।
যুদ্ধের মধ্যে কলিবফ ইরানের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতাদের মধ্যকার যোগসূত্র হয়ে ওঠেন।
আর মাঠপর্যায়ে এই সেতুবন্ধনের মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করছেন আইআরজিসি-র কমান্ডার আহমাদ ভাহিদি। কয়েক সপ্তাহ আগে এক পাকিস্তানি ও দুই ইরানি সূত্র তাকে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করেন। এমনকি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার রাতেও তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেই দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরুর দিককার যে হামলায় বাবা ও পরিবারের অনেক সদস্য নিহত হন, সেই একই হামলায় মুজতাবাও গুরুতর আহন হন বলে খবর মিলেছে। তার মুখ বিকৃত হয়ে গেছে এবং পায়ে তিনি গুরুতর আঘাত পেয়েছেন বলে অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যম সূত্রের বরাত দিয়ে জানাচ্ছেও।
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার কারণে তিনি আইআরজিসি-র সদস্য বা সীমিত অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন, বলেছেন তার ‘ইনার-সার্কেলের’ ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি।
এসব বিষয়ে রয়টার্স ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের দিক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনাকে ঘিরে নিজেদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই বলে এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা বারবারই বলে এসেছেন।
প্রকৃত ক্ষমতা ‘যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের হাতেই’
সোমবার ইরান ওয়াশিংটনের কাছে নতুন এক প্রস্তাব হাজির করেছে, যেখানে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। এতে যুদ্ধ শেষ এবং উপসাগরে নৌচলাচল নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা একপাশে সরিয়ে রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক ঊর্ধ্বতন ইরানি সূত্র বলছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইছে, শুরু থেকেই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বলতে।
“কেউই আলোচনা চাইছে না,” বলছেন ইরান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার। তার মতে, দুই পক্ষেরই ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপর পক্ষ দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরান চাইছে হরমুজ প্রণালিতে তার নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনকে দুর্বল করতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধকে কাজে লাগাতে।
আপাতত, কোনো পক্ষই ছাড় দিতে নারাজ। ইরানের আইআরজিসি ওয়াশিংটনের কাছে নিজেকে দুর্বল না দেখাতে মরিয়া, এদিকে ট্রাম্পের সামনে আছে মধ্যবর্তী নির্বাচন, ছাড় দিলে যেখানে তাকে চড়া রাজনৈতিক মূল্য গুণতে হবে, বলেছেন আয়ার।
“উভয় পক্ষের জন্যই, ছাড় দেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হবে,” ভাষ্য তার।
ইরানের দিক থেকে এ সতর্কতা কেবল পরিস্থিতির চাপে নয়, দেশটির ভেতর ক্ষমতার চর্চাও এখন এভাবেই হচ্ছে।
মুজতাবা এখনও ইরানের শীর্ষ নেতা, কিন্তু তিনি নির্দেশদাতার ভূমিকায় থাকার চেয়েও অনেকটা সায় দেওয়া বা না দেওয়ার ভূমিকায় রয়েছেন; নিজে কিছু চাপিয়ে না দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তিনি সেগুলো অনুমোদন করছেন, বলেছেন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরকার কয়েকজন।
প্রকৃত ক্ষমতা সরে এসেছে সম্মিলিত যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের হাতে, যার কেন্দ্রে রয়েছে এসএনএসসি, বলছেন তারা।
“গুরুত্বপূর্ণ সব চুক্তি বা সিদ্ধান্ত হয়তো তার মাধ্যমেই পাস হয়, কিন্তু আমি তাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কোনো সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে দেখছি না। যারা যুদ্ধ চালাচ্ছে, তিনিই বা তাদের বিরুদ্ধে যাবেন কিভাবে?” বলেছেন ইরানি বিশ্লেষক আরাশ আজিজি।
যুদ্ধের সময় গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে নিজেদের জোর দেখানোর চেষ্টা করেছেন দেশটির সাবেক পরমাণু আলোচক সাঈদ জালিলি ও আরও কয়েকজন কট্টরপন্থি সাংসদ। তবে তাদের হাতে প্রতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নেই বললেই চলে। তাই বড় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আটকানোর সক্ষমতাও তাদের নেই।
মুজতাবার শীর্ষ নেতার পদে আরোহনেও আইআরজিসির বড় ভূমিকা ছিল। তারাই তুলনামূলক উদাপন্থি ও বাস্তববাদীদের একপাশে সরিয়ে তাদের কট্টরপন্থি সব এজেন্ডার বিশ্বস্ত অভিভাবক হিসেবে মুজতাবাকে বেছে নিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে এমনিতেই অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আইআরজিসির জোর বেড়েছে, পাশাপাশি মুজতাবার ওপর তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ইরান যে সামনে আরও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের ভেতর দমন-পীড়ন আরও কঠোর করার দিকে এগোবে তারই ইঙ্গিত মিলছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী চক্র সম্বন্ধে জানা একাধিক সূত্র রয়টার্সকে এমনটাই বলছে।
বিপ্লবী ইসলামপন্থা ও নিরাপত্তাই প্রথম বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালিত আইআরজিসির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা আর বাইরে বৈরি প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো।
দেশটির বিচার বিভাগ এবং ধর্মীয় শাসনকাঠামো-ও অনেকটা এই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। তারা কঠোর কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ও পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। যে কারণে পারমাণবিক কর্মসূচি বা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের নীতিতে তাদের আপসের সম্ভাবনা অনেক অনেক কম।
‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা থেকে অস্ত্রের ক্ষমতায়’
ইরানের ক্ষমতা হাতবদল হয়ে ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে চলে গেছে রেভল্যুশনারি গার্ডের কাছে, যারা এখন একইসঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
দেশ যুদ্ধের মধ্যে আছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও মৃত, সুতরাং তাদের বাধা দেওয়ার সক্ষমতাও কারও নেই বলে মত ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কাঠামো সম্বন্ধে অবগত ব্যক্তিরা।
“আমরা ঐশ্বরিক ক্ষমতা থেকে অস্ত্রের ক্ষমতায় চলে গেছি,” আইআরজিসিই এখন ইরান চালাচ্ছে অভিমত ব্যক্ত করে বলেন সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন মিলার।
নেতৃত্বের মধ্যে এখন কে মধ্যপন্থি, কে কট্টরপন্থি তা বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন পার্থক্য হল- কে কম কট্টর, আর কে বেশি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে চলে এসেছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো, মুজতাবা এখনও ক্ষমতার চূড়ায় রয়েছেন, কিন্তু তিনি প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন, বলছেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ৯ সপ্তাহের যুদ্ধ, চাপেও ইরানকে ভেঙে পড়তে দেখা যাচ্ছে না, কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা জানা নেই, রাস্তাই নেই কোনো বিক্ষোভও, বলছেন মিলার।
এই একতাই দেখাচ্ছে যে রেভল্যুশনারি গার্ড-ই যুদ্ধ পরিচালনা করছে। তাদের কৌশল হল- পুরোদস্তুর যুদ্ধ এড়ানো, হরমুজ প্রণালি নিয়ে দরকষাকষি অব্যাহত রাখা এবং সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হওয়া, বলেছেন সাবেক এ মার্কিন আলোচক।