Published : 17 Jun 2026, 11:56 PM
যুদ্ধ অবসানে ইরানের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত নথি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আছে ১৪ টি দফা। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বুধবার দফাগুলো পড়ে শুনিয়েছেন।
এই চুক্তি শুক্রবারেই সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজেও থাকতে পারেন বলে জানিয়েছেন।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত নয় এবং এটি পছন্দ না হলে তিনি আবার ইরানে বোমা ফেলবেন। তাছাড়া, ইরান চুক্তিতে অটল না থাকলেও তাদের ওপর বোমা ফেলা হবে বলে তিনি হুমকি দেন। চুক্তির বিস্তারিত তখনও সামনে আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রাথমিক এই চুক্তিতে কী কী আছে তার বিস্তারিত খুঁটিনাটি প্রকাশ পেল দুইপক্ষের মধ্যে গত রোববার এটি সই হওয়ার তিনদিন পর।
‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শীর্ষক এই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশে দেরি হওয়া নিয়ে অনেক শোরগোলের পর বুধবার তা প্রকাশ করা হল।
এতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনার আশাবাদ রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিড্টে মাসুদ পেজেশকিয়ান শুক্রবার চুক্তিটি সই করতে পারেন।
তবে ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, বিষয়টি এখনও চিন্তাভাবনার পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
দুই দেশের নেতা চুক্তিটি সই করলে তা হবে উভয় পক্ষের জন্যই একটি বড় পদক্ষেপ। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে হাতে থাকবে ৬০ দিন।
চুক্তিতে যে ১৪ টি বিষয়ে একমত হয়েছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো হল-
১. ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে।
উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে কোনও শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকবে।
লেবাননের আঞ্চলিক অখন্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিতেও লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করবে।
২. ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান দেখাবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।
৩. ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালাবে। পারস্পরিক সম্মতিতে এ সময় বাড়ানো যেতে পারে।
৪. সমঝোতা স্মারক সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে।
৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ পুরোপুরি সমাপ্ত হবে এবং এ সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।
তাছাড়া, চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশেপাশের এলাকা থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে।
৫. ইরান সমঝোতা স্মারক সইয়ের পরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নেবে এবং ৬০ দিনের জন্য কোনও ধরনের টোল নেবে না।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবে এবং ইরানকে এই জলপথে প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মাইন অপসারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
৬. যুক্তরাষ্ট্র ও এর আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসাবে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
৭. যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮. ইরান আবারও প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছে যে, তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় সমাধান করা হবে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষই বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়াবে না।
১০. সমঝোতা স্মারক সইয়ের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির অনুমোদন দেবে। ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও এর মধ্যে থাকবে।
১১. সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ বা অবরুদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত যে কোনও সুবিধাভোগীকে এ অর্থ দেওয়া যাবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্র দেবে।
১২. সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি তদারক করার জন্য একটি নির্বাহী কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩. সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পর এবং এই স্মারকের ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরুর বাধ্যবাধকতায় সেগুলোর বাস্তবায়ন চলার মধ্যেই উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবনার মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
সূত্র: সিএনএন/বিবিসি