Published : 23 Apr 2026, 11:21 AM
মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্প্রতি এশিয়ার সমুদ্রে ইরানের পতাকাবাহী অন্তত তিনটি তেলের ট্যাংকারকে গন্তব্যে যেতে বাধা দিয়ে অন্য দিকে সরিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে নৌ চলাচল ও নিরাপত্তা বিষয়ক একাধিক সূত্র।
ট্যাংকার তিনটিকে ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছে আটকানো হয়েছিল, সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এমনটাই জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ওয়াশিংটন সমুদ্রপথে ইরানের বাণিজ্যে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। এদিকে তেহরানও একাধিক নৌযানে গুলি চালিয়েছে যেন সেগুলো উপসাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে না পারে।
মাস দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলে পড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। পরে তাতে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোও জড়িয়ে পড়ে। এ মাসের শুরুর দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলে উত্তেজনা কিছুটা কমে আসে। পরে ওই বিরতির মেয়াদ বাড়লেও শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশের সরবরাহে ভাটা পড়েছে; এর ধাক্কায় বিশ্বজুড়েই মারাত্মক জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা একটি ইরানি কার্গো জাহাজ ও একটি তেলের ট্যাংকার আটক করেছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা দুটি কনটেইনার জাহাজকে আটক করেছে।
আটকের আগে এ দুটিসহ মোট তিনটি নৌযানে গুলিও চালিয়েছে তারা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আগে কখনোই কোনো নৌযান আটক করেনি ইরান।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনী আরও অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী তেলের ট্যাংকারকে নির্ধারিত পথ থেকে সরিয়ে অন্য দিকে পাঠিয়ে দেয় বলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই নৌ-চলাচল সূত্র এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলাদা দুই পশ্চিমা সূত্র বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছে।
এশীয় সমুদ্রে ইরানি জাহাজকে বাধা এবং তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার এ খবর প্রসঙ্গে রয়টার্স মন্তব্য চাইলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইরানি পতাকাবাহী এই নৌযানগুলোর একটি ‘ডিপ সী’ সুপারট্যাংকার; অপরিশোধিত তেলে আংশিক বোঝাই এ নৌযানটি সপ্তাহখানেক আগেও মালয়েশিয়া উপকূলের কাছে ছিল বলে এর শনাক্তকরণ ট্রান্সপন্ডারের সঙ্কেত বলছে। নৌচলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিক ও একাধিক সূত্রও এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আরেকটি ইরানি পতাকাবাহী ছোট ট্যাংকার সেভিনকেও মার্কিন বাহিনী পথিমধ্যে আটকেছিল। ট্যাংকারটির সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১০ লাখ ব্যারেল, আটকানোর সময়ে সেটি তার ধারণক্ষমতার ৬৫% তেল বহন করছিল। এক মাস আগে নৌযানটিকে মালয়েশিয়া উপকূলের কাছে সর্বশেষ দেখা গেছে বলে জানাচ্ছে নৌচলাচল বিষয়ক তথ্য উপাত্ত।
২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই ইরানি পতাকাবাহী সুপারট্যাংকার দোরেনাকে তিন দিন আগে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের কাছে সর্বশেষ দেখা গেছে বলে একাধিক সূত্র এবং মেরিন ট্রাফিক প্ল্যাটফর্মের তথ্যউপাত্ত নিশ্চিত করেছে।
বুধবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, তাদের দেওয়া অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করায় ভারত মহাসাগরে দোরেনা’কে হেফাজতে নিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার।
মার্কিন বাহিনী হয়তো ইরানের পতাকাবাহী আরেকটি ট্যাংকার দেরিয়া’কেও আটকেছে বলে মনে করছে একাধিক সূত্র।
রোববার পর্যন্ত ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে ছাড় ছিল তার মধ্যে নৌযানটি ভারতে ইরানি তেলের কার্গো খালাস করতে পারেনি।
নৌযানটিকে সর্বশেষ শুক্রবার ভারতের পশ্চিম উপকূলে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে মেরিন ট্রাফিক।
এদিকে মঙ্গলবার মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মুখে সমুদ্রপথে ইরান ও রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ২৯টি নৌযানকে ইরানি বন্দরে যেতে বা বের হতে বাধা দিয়েছে।
যেসব নৌযানের যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে সেগুলোর সবার নাম প্রকাশ করেনি মার্কিন সামরিক বাহিনী। দেরিয়া ও ডিপ সী নিয়ে মন্তব্য চাইলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
সমুদ্রে নিরাপত্তা সংক্রান্ত তৃতীয় আরেকটি সূত্র বলেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি থেকে দূরে, খোলা সমুদ্রে ইরানি নৌযানগুলোকে ‘টার্গেট’ করতে চাইছে, যেন অভিযান চলাকালে ভাসমান মাইনের ঝুঁকি এড়ানো যায়।