Published : 12 Jul 2025, 10:50 PM
ভারতের আহমেদাবাদে এয়ার ইনডিয়ার লন্ডনগামী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার এক মাসের মাথায় প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের সুইচ বন্ধ হওয়াকে বোয়িং ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮ দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার সকালে ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি) ১৫ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রাথমিক তদন্তে তদন্তকারীরা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় খুঁজে পেয়েছেন। জুনের এই ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হন।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ১২ বছরের পুরনো উড়োজাহাজটির উভয় ইঞ্জিনের জ্বালানি সুইচ ‘রান’ (চালু) থেকে আকস্মিকভাবে ‘কাটঅফ’ (বন্ধ) অবস্থানে চলে যায়। জ্বালানি সুইচ দুটি এই ‘কাটঅফ’ অবস্থানে যাওয়ার অর্থ উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, এতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন শক্তি হারিয়ে ফেলে। সাধারণত উড়োজাহাজ অবতরণ করার পর জ্বালানি সুইচ ‘কাটঅফ’ অবস্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ককপিটের ভয়েস রেকর্ডিং উড়োজাহাজটির দুই পাইলটের কথোপকথন ধারণ করেছে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে এক পাইলট আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কেন কাট-অফ (সুইচ বন্ধ) করলেন?” উত্তরে অপর পাইলট বলেন, “আমি কিছু বন্ধ করিনি।”

এই রেকর্ডিং এটি স্পষ্ট করেনি কোন কথাটি কোন পাইলট বলেছেন। উড্ডয়নের সময় সহ-পাইলট উড়োজাহাজটি উড়িয়েছিলেন এবং ক্যাপ্টেন সবকিছু তদারকি করছিলেন।
এরপর তারা সুইচগুলোকে আবার চালু করেন। এতে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন ফের স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় একটি ইঞ্জিনে থ্রাস্ট (যে বলে উড়োযান সামনে চালিত হয়) ফেরা শুরু হলেও অন্য ইঞ্জিনটি সক্রিয় হলেও সম্পূর্ণ শক্তি তখনও ফিরে পায়নি।
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১ বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ৪০ সেকেন্ডেরও কম সময় আকাশে ভেসে ছিল। তারপর জ্বালানি ভরা উড়োজাহাজটি খুব দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে গুজরাটের আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের অদূরে একটি মেডিকেল ছাত্রাবাসে আছড়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে, উড়োজাহাজে থাকা ২৪২ জনের মধ্যে কেবল একজন বেঁচে যান, এবং মাটিতে থাকা আরও প্রায় ১৯ জন নিহত হন।
তদন্তকারীরা উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ তদন্ত করে ও ককপিট রেকর্ডারের (ব্ল্যাক বক্স নামে পরিচিত) তথ্য বিশ্লেষণ করে উড্ডয়নের পরপরই কোন ভুলের কারণে এমন ঘটনা ঘটল তা বোঝার চেষ্টা করছেন।

ফ্লাইটরাডার টোয়েন্টিফোরের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে অবস্থানের তথ্য হারানোর আগে পরিষ্কার আবহাওয়ার মধ্যে মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় উঠেছিল।
তদন্তকারীরা বলেছেন, ওই লিভার-লক ফুয়েল সুইচ দুটি দুর্ঘটনাবশত সক্রিয়করণ রোধ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, এগুলো চালু অথবা বন্ধ করার জন্য সুইচগুলোকে টান দিয়ে একটু উপরে তুলে তারপর উপরে বা নিচে নামাতে হয়। টান দিয়ে উপরে না তুললে সুইচগুলোকে নড়ানো যায় না। এটি অপেক্ষাকৃত অনেক নিরাপদ একটি পদ্ধতি।
নির্ভুল মান অনুযায়ী নির্মিত এই পদ্ধতি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। অনিচ্ছাকৃতভাবে পাইলটদের হাত যেন এই সুইচগুলোর দিকে চলে না যায় তার জন্য এগুলোর দুই পাশে দুটি সুরক্ষা ব্র্র্যাকেট দেওয়া আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানাডাভিত্তিক এক বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী বিবিসিকে বলেছেন, “এক হাতের একবারের নড়াচড়ায় উভয় সুইচকে টেনে তোলা প্রায় অসম্ভব, এই কারণেই দুর্ঘটনাবশত এগুলোর অবস্থান পরিবর্তন অসম্ভব হয়ে যায়।”
আর এই বিষয়টিই এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাটিকে স্বতন্ত্র করে রহস্য আরও গভীর করেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে হওয়া তদন্তে বোয়িং, জেনারেল ইলেকট্রিক, এয়ার ইন্ডিয়া, ভারতের নিয়ন্ত্রক বোর্ডের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেরও কয়েকজন অংশ নিয়েছেন।