Published : 31 May 2026, 10:49 PM
যুদ্ধ চলছে। মুহুর্মুহু হামলা হচ্ছে। গোলা-বারুদের বিকট শব্দ। সেনাও আছে। কিন্তু তাদের পানি লাগে না, খাবারও লাগে না। দিনের পর দিন খাবার-পানি ছাড়াই যুদ্ধ করছে তারা। এমন হওয়া আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও বাস্তবে হচ্ছে সেটিই।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে এই পন্থাই অবলম্বন করছে ইউক্রেইন। রুশ সেনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশেষ এক ধরনের যোদ্ধা বাহিনীকে কাজে লাগাচ্ছে তারা। এদের দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে এরাই এখন ইউক্রেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই যোদ্ধারা রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং যন্ত্রসেনা বা রোবট। ২০২২ সাল থেকে চলমান এই যুদ্ধে ইউক্রেইন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে আর সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছে না। মানুষের পরিবর্তে মেশিন বা যন্ত্রের ওপরই নির্ভরতা বাড়াচ্ছে তারা।
ইউক্রেইনের এক একটি অভিযানে বিস্ফোরক বোঝাই একাধিক রোবট রুশ ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। অথচ ইউক্রেইনের কোনও সেনাকে সেখানে সরাসরি উপস্থিত থাকতে হচ্ছে না। আকাশে নজরদারি চালাচ্ছে গোয়েন্দা ড্রোন।
দূরে বসে অপারেটররা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন এই রোবটগুলোকে। রাশিয়ার সেনাদের ভাষায়, বিস্ফোরকবাহী এই রোবটগুলোই হচ্ছে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ (নিঃশব্দ মৃত্যু)।
একসময় ইউক্রেইনের যে কমান্ডাররা যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী লড়াই লড়েছেন, এখন তারাই যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারি থেকে বহু দূরে বসে কম্পিউটার স্ক্রিন, লাইভস্ট্রিমের সাহায্যে এই প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।
প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে সেনা সঙ্কটে ভুগছে ইউক্রেইন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য পাওয়াটাও তাদের জন্য অনিশ্চিত। যুদ্ধক্ষেত্রে যাতে রক্ত-মাংসের সেনার মৃত্যু কমানো যায়, সেকারণেই বিকল্প হিসাবে এই পথে হেঁটেছে ইউক্রেইন।
মনুষ্যবিহীন ড্রোন, রোবোটিক যান, দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র- এসবই এখন ইউক্রেইনের যুদ্ধের মাঠে দিন দিন বেশি ভূমিকা রাখছে, যা রুশ বাহিনীকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গত এপ্রিল মাসে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, প্রথমবার শুধুমাত্র রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করেই যুদ্ধ চালাচ্ছে তাদের সেনারা। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে রক্ত-মাংসের সেনার পরিবর্তে যন্ত্র সেনা ব্যবহার করে ২২ হাজারেরও বেশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
ইউক্রেইনের সেনারা জানিয়েছেন, যুদ্ধে তাদের হাতে ধরা পড়া রুশ সেনারা ইউক্রেইনের বিস্ফোরকবাহী রোবটগুলোকে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ নাম দিয়েছে। কারণ, এই যন্ত্রসেনারা এতটাই নিঃশব্দে চলে যে, শত্রুপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধরাশায়ী হয়।
রুশ সেনারা এই রোবোটগুলোর উপস্থিতি তখনই টের পায়, যখন সেগুলো মাত্র ১০ মিটারের মধ্যে (বিস্ফোরণের মূল ব্যাসার্ধ) চলে আসে। ফলে এই যন্ত্রগুলোর অপ্রত্যাশিত হামলা নিয়ে রুশ বাহিনীতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
ইউক্রেইনের এক সেনা কর্মকর্তার কথায়, ‘“এই ধরনের যন্ত্রসেনা আগে হাতে এলে, আমাদের বহু কমান্ডারের প্রাণ বাঁচত।’’ তিনি বলেন, ‘‘প্রতিনিয়ত যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে। আগে যেভাবে যুদ্ধ হত, এখন সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি হচ্ছে।”
ইউক্রেইনের একটি স্পেশাল ইউনিট প্রায় ১৬৪টি সফল হামলার পর হিসাব কষে দেখেছে, রোবটগুলো দিয়ে যে পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব, তার সমপরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে অন্তত ২ হাজার ৩০০ সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হতো।
ইউক্রেইনের এক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা মাসে ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা আহত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর নতুন তথ্য বলছে, চার বছর ধরে চলা ইউক্রেইন যুদ্ধে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ রুশ সেনার মৃত্যু হয়েছে।