Published : 22 May 2026, 04:24 PM
তিন দশক আগে দু্টি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় কিউবার ৯৪ বছর বয়সী সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের পর ওয়াশিংটনের ‘রেজিম চেঞ্জের’ তালিকায় হাভানা-ই যে পরবর্তী লক্ষ্য, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে।
গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির ওপর এখন সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বড় অংশ এখন দেশটির ৬৬ বছরের পুরোনো কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থারও অবসান চাইছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, তিনি বড় কোনো সংঘাত বা ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির’ প্রয়োজন দেখছেন না। তবে হোয়াইট হাউস সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফ্লোরিডা উপকূল থেকে মাত্র ৯০ মাইল (১৪৪ কিলোমিটার) দূরে কোনো ‘দুষ্ট রাষ্ট্র’ তারা বরদাশত করবে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিউবার ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে—অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নাকি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ, এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলছে বিবিসি।
মাদুরোর মতো রাউল কাস্ত্রোকে ‘অপহরণ’
১৯৯৬ সালে কিউবার যুদ্ধবিমান তাদের ‘আকাশসীমা লঙ্ঘন করা’ দুটি মার্কিন বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল; ওই ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যুও হয়। তিন দশক আগের এ ঘটনাতেই রাউলের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর পরপরই আলোচনা শুরু হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনী তাকে আটক করে আমেরিকার আদালতে দাঁড় করানোর জন্য কোনো সামরিক অভিযান চালাতে পারে কি না।
এ ধরনের অভিযানের নজির তো খুব একটা পুরনোও নয়। এ বছরের জানুয়ারিতেই মার্কিন কমান্ডোরা কিউবার দীর্ঘদিনের মিত্র ভেনেজুয়েলায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ করে’ নিউ ইয়র্কে এনে মাদক ও অস্ত্র মামলায় বিচারের মুখোমুখি করে।
এর আগে ১৯৮৯ সালে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর অধীনে হাজার হাজার মার্কিন সেনা পানামায় আক্রমণ করে দেশটির তৎকালীন নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে বন্দি করেছিল।
কিউবাতেও এ ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা আছে কিনা, এখন পর্যন্ত এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন ট্রাম্প। যদিও ফ্লোরিডার সেনেটর রিক স্কটসহ একাধিক মার্কিন আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যেই এমন অভিযানের দাবি তুলছেন।
স্কট সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমাদের কোনো বিকল্পই আলোচনার টেবিল থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। মাদুরোর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, রাউল কাস্ত্রোর ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হওয়া উচিত।”
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাস্ত্রোকে আটক করা সম্ভব বলে মনে হলেও তার বার্ধক্য এবং কিউবান বাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিরোধের কারণে এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হবে।
ওয়াশিংটন অফিস অন ল্যাটিন আমেরিকা নামের একটি বেসরকারি সংস্থার আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম আইজ্যাকসন বলেছেন, “তাকে বের করে আনা হয়তো সহজ হতে পারে। তার যে প্রতীকী মূল্য, তার কারণে তাকে হয়তো অত্যন্ত কড়া পাহারায় রাখা হয়, তবে এটি করা অবশ্যই সম্ভব।”
২০১৮ সালেই প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানো রাউল ব্যক্তি বা বিপ্লবী হিসেবে কিউবাতে বেশ প্রভাবশালী হলেও তাকে ‘তুলে আনার ঘটনা’ কিউবার শাসন কাঠামোতে খুব একটা বড় প্রভাব ফেলবে না বলেও মনে করেন তিনি।
আইজ্যাকসন বলেন, “কাস্ত্রো পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী হলেও, তারা যে ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে তার কেন্দ্রে তারা এখন আর নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি বড় একটি সাফল্য হিসেবে দেখা হতে পারে। কাস্ত্রো পরিবারকে অপমান করতে এবং ১৯৫৯ সালের প্রকৃত বিপ্লবীদের একজনকে কারাগারে ঢোকাতে মার্কিন প্রশাসন খুবই পছন্দ করতে পারে। তবে এর কৌশলগত মূল্য কতটা হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।”
হাভানার নেতৃত্বে বদল
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, ট্রাম্পসহ মার্কিন কর্মকর্তাদের চাওয়া অনুযায়ী হাভানার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে।
এক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলায় যেভাবে মাদুরোর জায়গায় ডেলসি রদ্রিগেজকে বসানো হয়েছে, সেরকম কিছু একটা হতে পারে। ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের ওই কৌশল দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রেখেই সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পথ খুলে দিয়েছিল।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা কিউবার ভেতরকার কিছু পক্ষ মার্কিন সহায়তার আশায় রয়েছেন; তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে বলে ট্রাম্প এর মধ্যে জানিয়েছেনও।
গত ১২ মে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, “কিউবা সাহায্য চাইছে এবং আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি।”
এর কিছুদিন পরই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র পরিচালক জন র্যাটক্লিফ কাস্ত্রোর নাতি রাউল গুইলারমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রো এবং কিউবার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী লাজারো আলভারেজ কাসাসের সঙ্গে বৈঠক করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কিউবানদের সঙ্গে আলোচনা করব, তবে দিনশেষে তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের বর্তমান ব্যবস্থা আর কাজ করছে না।”
ওয়াশিংটন চায় কিউবা তার অর্থনীতি উন্মুক্ত করুক, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াক এবং দ্বীপটিতে রুশ বা চীনা গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি বন্ধ করুক।
পুরো শাসনব্যবস্থা বদলাতে গেলে কিউবা অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে, সে কারণেই ভেনেজুয়েলার মতো ট্রাম্প ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির শাসনকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ব্যক্তি বদলের কথা ভাবতে পারেন, মনে করছেন জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মাইকেল শিফটার।
কিউবা ‘পুরোপুরি ভেঙে পড়তে’ পারে
তৃতীয় যে সম্ভাবনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে সেটি হল- প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপের মুখে কিউবার পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে। দেশটিতে এখনই প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এবং তীব্র খাদ্য সংকট চলছে।
ট্রাম্প দিনকয়েক আগে বলেছেন, “কিউবায় কোনো উত্তেজনা বৃদ্ধির দরকার নেই। এটি এমনিতেই ভেঙে পড়ছে। এটি একটি বিপর্যয় এবং তারা এক প্রকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।”
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়লেও কিউবান সরকারের নিরাপত্তা ও জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনও বেশ শক্তিশালী। ফলে যতটা সহজ মনে করা হচ্ছে, কিউবাকে ‘বশ করা’ ততটা সহজ নাও হতে পারে।
এদিকে অর্থনৈতিক কারণে ক্যারিবীয় দেশটি ভেঙে পড়লে তার চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও পড়বে। অঞ্চলজুড়েও এর প্রভাব হবে মারাত্মক।
দলে দলে কিউবান নাগরিকরা তখন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কিংবা মেক্সিকোর দিকে ছুটবে, যা আরেকটি বড় অভিবাসন সংকট তৈরি করতে পারে।
এই ধরনের অভিবাসনের প্রস্তুতি এখনও শুরু না হয়ে থাকলে ‘অবাকই হবেন’ বলে জানিয়েছেন আইজ্যাকসন।
“দেশটির লোকেরা এখন দিনে এক থেকে দেড় হাজার ক্যালরি পাচ্ছে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাও নেই। ধরে নিতে পারেন যে, তারা নৌকা বানানো শুরু করে দিয়েছে,” বলেছেন তিনি।