Published : 24 Oct 2025, 11:12 AM
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ বেটিং এবং মাফিয়া পরিচালিত পোকার জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের সাঁড়াশি অভিযানে এক বাস্কেটবল খেলোয়াড় ও কোচসহ কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন মায়ামি হিট দলের খেলোয়াড় টেরি রোজিয়ার এবং পোর্টল্যান্ড ট্রেইল ব্লেজার্সের প্রধান কোচ চনসি বিলাপস।
বিবিসি লিখেছে, ৩১ বছর বয়সী রোজিয়ারসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে খেলায় ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত পাওয়ার ভান করে বাজির বাজার প্রভাবিত করার অভিযোগে।
আর বিলাপসসহ ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অবৈধ পোকার খেলার মামলায়। ওই চক্রের সঙ্গে সাবেক এনবিএ খেলোয়াড় ও নিউ ইয়র্কের মাফিয়া পরিবারগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
প্রসিকিউটররা বলছেন, নিউ ইয়র্কের পাঁচটি বড় অপরাধচক্রের মধ্যে চারটির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এই চক্রের সঙ্গে।
তারা এমন এক জালিয়াতি চক্র চালাত, যেখানে বিখ্যাত ক্রীড়া তারকাদের সঙ্গে পোকার খেলতে প্রলুব্ধ করে জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নেওয়া হত।
আর এই জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত হত বিশেষ প্রযুক্তি—যেমন চিহ্নিত তাস পড়তে সক্ষম কনট্যাক্ট লেন্স ও চশমা। এমনকি এক্স-রে টেবিলের মত প্রযুক্তিও ব্যবহুত হত, যেখানে টেবিলে উল্টে রাখা তাসের নিচের অংশ দেখা যেত।
এনবিএ এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখছে এবং রোজিয়ার ও বিলাপসকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
“আমরা এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। খেলাধুলার সততা বজায় রাখা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,” বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে রোজিয়ারের আইনজীবী সিবিএস নিউজকে বলেছেন, “টেরি জুয়াড়ি নন। তবে তিনি এই আইনি লড়াই থেকে পিছু হটবেন না, আদালতে প্রমাণ করবেন যে তিনি নির্দোষ।”
রোজিয়ারকে বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো আদালতে হাজির করা হয়। ছয় মিলিয়ন ডলারের বাড়ি জামানত রেখে তিনি জামিন পান।
ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে গ্রেপ্তার বিলাপসকেও আদালতে হাজির করা হচ্ছে। তিনিও মোটা অঙ্কের জামানত রেখে জামিন পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুটি মামলার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি অঙ্গরাজ্যে এই সমন্বিত অভিযান চালানো হয়েছে।
“আমরা এমন এক জালিয়াত চক্রের মুখোমুখি হয়েছি, যারা বহু বছর ধরে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।”
নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি জোসেফ নোচেল্লা জুনিয়র বলেন, “অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে যেভাবে তারা এতদিন জুয়া জিতে আসছিল, সেই খেলা শেষ।”
এনবিএ ম্যাচে জালিয়াতির অভিযোগ
প্রসিকিউটররা বলছেন, প্রথম মামলায় যারা ধরা পড়েছেন, তারা গোপন তথ্য ব্যবহার করে বড় বড় বেটিং প্ল্যাটফর্মে ফলাফল প্রভাবিত করতেন।

নোচেল্লা বলছেন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে অনলাইন বেটিং বৈধ হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা এটি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সাতটি এনবিএ ম্যাচ এ তদন্তের আওতায় এসেছে। এর একটি ম্যাচ ছিল শার্লট হর্নেটস বনাম নিউ অরলিন্স পেলিকানস এর, যেখানে রোজিয়ার তখন হর্নেটসের হয়ে খেলেছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, রোজিয়ার এক বন্ধুকে আগেভাগে জানিয়েছিলেন যে তিনি চোটের কারণে ম্যাচ ছেড়ে যাবেন। পরে ওই বন্ধু ও তার সহযোগীরা রোজিয়ারের বাজে পারফরম্যান্সের পক্ষে বাজি ধরে ২ লাখ ডলারের বেশি অর্থ জিতে নেন।
প্রসিকিউটররা বলছেন, রোজিয়ার সেদিন আহত হওয়ার ভান করে নয় মিনিটের মাথায় খেলা ছেড়ে উঠে পড়েন আর বাজির সঙ্গে যুক্তরা লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নেন।
সেই ম্যাচে রোজিয়ার মাত্র পাঁচ পয়েন্ট তুলেছিলেন; অথচ সাধারণত তিনি গড়ে ২১ পয়েন্ট তুলতে পারতেন।
নিউ ইয়র্কের পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, “এই মৌসুমে তার খেলা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে—চোটের কারণে নয়, অসততার কারণে।”
অন্যদিকে রোজিয়ারের আইনজীবী জেমস ট্রাস্টি বলেন, “প্রসিকিউটররা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের বদলে অবিশ্বাস্য সূত্রের কথায় ভরসা করেছেন। এনবিএ ইতোমধ্যে তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। অথচ তারা (এফবিআই) সেই পুরনো মামলা আবার টেনে এনেছে।”
সাবেক এনবিএ খেলোয়াড় ডেমন জোনসকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেস লেকারস বনাম মিলওয়াকি বাকস ম্যাচ এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লেকারস বনাম ওকলাহোমা সিটি থান্ডার ম্যাচে গড়াপেটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ক্রীড়াঙ্গনে বেটিং নিষিদ্ধ ছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যগুলোকে এ বিষয়ে নিজস্ব আইন করার অনুমতি দিলে বেটিং ব্যবসা দ্রুত বাড়তে থাকে।
এরপর বড় বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সংবাদমাধ্যম বেটিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিলিয়ন ডলারের এই শিল্পে যুক্ত হয়।
জুয়াচুরি
দ্বিতীয় মামলায় ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অবৈধ পোকার খেলায় প্রতারণা করে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে আছেন নিউ ইয়র্কের কুখ্যাত বোনান্নো, জেনোভেস ও গামবিনো অপরাধচক্রের ১৩ সদস্য ও সহযোগী।
নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি নোচেল্লা বলেন, “আসামিরা লাস ভেগাস, মায়ামি, ম্যানহাটন ও হ্যাম্পটনসের মত জায়গায় সাবেক তারকা খেলোয়াড়দের (যেমন বিলাপস ও জোনস) সঙ্গে পোকার খেলার জন্য ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ করত। প্রতিটি খেলায় ভুক্তভোগীরা কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হারাতেন।
জুয়ায় জালিয়াতির জন্য এ চক্র বিশেষ কার্ড শাফলিং মেশিন, চিহ্ন দিয়ে রাখা তাস শনাক্ত করার চশমা, এমনকি উল্টো কার্ড দেখার এক্স-রে টেবিল ব্যবহার করে আসছিল।
“যারা খেলায় অংশ নিতেন, তারা বুঝতেই পারতেন না যে ডিলার থেকে শুরু করে অন্য খেলোয়াড় সবাই জুয়াচুরিতে জড়িত,” বলেন নোচেল্লা।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এভাবে তারা মোট ৭০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয়; একজন ভুক্তভোগী একাই খোয়ান ১৮ লাখ ডলার।
নিউ ইয়র্ক পুলিশ কমিশনার টিশ বলেন, “কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে সংগঠিত অপরাধচক্রগুলো হুমকি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করত।”
এই মামলায় জুয়াচুরি, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি, ব্যাংক জালিয়াতি ও অবৈধ জুয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।