Published : 03 Jun 2026, 01:23 AM
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দল তৃণমূলের ভেতরে ডামাডোল ক্রমশ বাড়ছে। একের পর এক নেতা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। বিধায়কদের নিয়ে ডাকা বৈঠকে ৬০ জন অনুপস্থিত থাকছেন। দলের দুই বিধায়ক বহিষ্কৃত হয়েছেন।
দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫০-৬০ জন বিধায়ক বিদ্রোহ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। অধিকাংশ বিধায়ক, সাংসদ ও কাউন্সিলরই দলত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং স্পিকারের কাছে ৪৮ জন বিধায়ক যৌথভাবে চিঠি জমা দিতে চলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দল। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, দলত্যাগী বিধায়কের সংখ্যা ৫২ তে দাঁড়ালে তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীকের ওপর বর্তমান নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ আর নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, হাতছাড়া হতে পারে তৃণমূলের প্রতীকও।
তৃণমূল নেতারা মনে করছেন দল এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে। সে কারণে তারা ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে তাকানো উচিত বলে মনে করছেন। তৃণমূলের লোকসভা এমপি’রাও অসন্তুষ্ট। কারণ, তারা এখন ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলের ভবিষ্যৎ ভাল বলে মনে করছেন না।
আবার দলের কিছু এমএলএ যারা দল ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন, তারা অতীতে মমতার ‘দিদি’ ভাবমূর্তির জোরেই নির্বাচনে জিতেছিলেন, নিজেদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির বদৌলতে নয়। এখন মমতার সেই ভাবমূর্তি আর না থাকায় তারা দল ছাড়তে চাইছেন।
তৃণমূলের কিছু বিদ্রোহী নেতা সম্প্রতি বৈঠক করেছেন। তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাতিজা ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই সোমবার তৃণমূল দুই বিধায়ক সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করে।
পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেসে এই নজিরবিহীন ভাঙন ও বিদ্রোহের মুখে অভাবনীয় রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েছেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ওদিকে, বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেয়ে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় আসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তৃণমূলের এই পরিণতির জন্য মমতার দীর্ঘদিনের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের মারাত্মক ক্ষোভের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে। মানুষ তৃণমূলের অনাচার, নৈরাজ্য থেকে মুক্তি চেয়েছিল বলে দাবি তাদের।
নির্বাচনের পরও কয়েকদিন আগেই দক্ষিণ ২৪ পরগণার সোনারপুরে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের হাতে হেনস্থা হয়েছেন মমতার ভাতিজা অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। আরেক তৃণমূল সাংসদ কল্যাণও ব্যানার্জিও প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এসব হামলার জন্য আঙুল উঠেছে বিজেপি’র দিকে।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তৃণমূল সাহস নিয়ে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন। ২০২৯ সালে লোকসভা নির্বাচন এবং ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আগামী ৫ বছর মমতা বন্দোপাধ্যায় কি পারবেন বিজেপি’কে টক্কর দেওয়ার জন্য তৃণমূলকে টিকিয়ে রাখতে?
বিজেপি অনেক বড় শক্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও ক্ষমতাশালী হবে। আর তূণমূল এরই মধ্যে ভেঙে পড়ছে। মমতা অবশ্য দলকে অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঁচাতে এরই মধ্যে ‘করো নয়ত মরো’ লড়াইয়ে ডাক দিয়েছেন।
এর মধ্য দিয়ে তৃণমূল নেত্রী কর্মীদের মধ্যে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, পিছিয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই- হয় নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে হবে, নয়ত অস্তিত্ব হারাতে হবে। সাংগঠনিক ভিত্তি অটুট রাখা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় করাই তার এই বার্তার উদ্দেশ্য।
তৃণমূল কর্মীদের ওপর হামলা হওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাদের জন্য এটি করো অথবা মরো এর লড়াই। কিছু মানুষ তৃণমূলকে ভেঙে দিতে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। বিজেপি-বিরোধী দলগুলো দেশজুড়ে আমাদের কর্মসূচিরে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দিল্লিতে বৈঠক করবে।”
তৃণমূলের অন্যান্য নেতারা দল ছেড়ে গেলেও মমতা কর্মীদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, তিনি কখনও কর্মীদের ছেড়ে যাবেন না। মমতার এই বক্তব্যের সময় তাকে ঘিরে থাকা সমর্থকরা বিজেপি বিরোধী স্লোগান দিচ্ছিল।
মমতা এর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে বিজেপি-কে নিশানা করেও বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেন, “গায়ের জোরে যা ইচ্ছে করে যান, তৃণমূলকে ভাঙা যাবে না।” কয়েকদিন আগেই মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, এবার থেকে সাংবাদিক বৈঠক করবেন না। তার যা বলার, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে বলবেন।
এরপর দল থেকে দুই বিধায়ককে বহিষ্কারের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ ভিডিও করে মমতা বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের পুলিশ দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, দল ভাঙুন, অমুক লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
তিনি বলেন, “প্রথম ফোন পুলিশের তরফ থেকে যাচ্ছে। দ্বিতীয়টা বিজেপির অফিস থেকে। এটা গণতন্ত্রের নমুনা? বিধায়কদের ভয় দেখানো হচ্ছে। কালকে আমাকে চারজন বিধায়ক জানিয়েছে, তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। ইডি ধরবে। সিবিআই ধরবে। বাড়বাড়ন্তের সীমা থাকা দরকার।”
এরপর তৃণমূলের ভেতরেই যখন ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়ছে, তখন মমতা বলেছেন, “তৃণমূল কংগ্রেসকে আপনারা ভাঙতে চান? যতই চেষ্টা করুন, তৃণমূল কংগ্রেস আরও শক্তিশালী হবে। তৃণমূল কোনও নেতাভিত্তিক দল নয়, এটি কর্মীভিত্তিক দল। নেতারা ভয় পেতে পারেন, কর্মীরা পান না। কর্মীরা পাশে থাকলে আমি আবার দল গড়ে তুলব।”
তবে মমতা যা-ই বলুন, তার দলের ভেতরে অসস্তোষ এখন খোলাখুলিভাবেই প্রকাশ পাচ্ছে। সোমবার পাঁচতারা হোটেলে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে মমতা-অভিষেকের নেতৃত্বের বাইরে বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ পায়।
ফেইসবুক লাইভে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও বিদ্রোহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু নেতা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি আগ্রহী।
তাছাড়া, গত রোববার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ডাকা বৈঠকে বিধায়কদের একটি বড় অংশ উপস্থিত না থাকাটাও দলের সংকটের গভীরতা প্রকাশ করেছে। মমতা তার বিধায়কদের একতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফল তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের স্পষ্ট প্রতিফলন। আর তাই ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটির ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে না।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন তার বয়স ছিল ৪০ এর কোঠায়। এখন ৭১ বছর বয়সে তাকে নিজ হাতে গড়া তিন দশকের পুরোনো দলকে ধরে রাখতে লড়াই করতে হচ্ছে।
এতগুলো বছরের মধ্যে ১৫ বছর দলটি ক্ষমতায় ছিল। ফলে মমতার দল রক্ষার কাজও ছিল সহজ। পশ্চিমবঙ্গের গত ৫০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ক্ষমতা হারানোর পর কোনও দল আর রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারেনি।
ব্যতিক্রম ছিল কংগ্রেস, তবে সেটিও ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত। তূণমূলও এখন একই ভাগ্য বরণ করবে কিনা প্রশ্ন সেটি।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল- মমতা ও অভিষেকের নেতৃত্ব ছাড়া তৃণমূলের কোনও ভবিষ্যৎ আছে কিনা সেটি। উদ্ধব ঠাকরে বা শরদ পাওয়ারের দলের মতো তৃণমূলেও কি ভাঙন ধরে দলটি প্রতিষ্ঠাতা মমতার হাতছাড়া হতে পারে?
এ মুহূর্তে বিকল্প কোনও নেতৃত্ব চোখে না পড়লেও রাজনীতিতে কিছুই অসম্ভব নয়। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দুই বিধায়ককে তৃণমূলের বরখাস্ত করার ঘটনাই দেখিয়ে দেয় মমতা বিধায়কদেরকে একাট্টা রাখার জন্য কতটা সংগ্রাম করছেন।
মমতার দীর্ঘদিনের সহযোগী ও তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও বিধায়কদের উদ্দেশে বলেছেন, “আমরা নিজেদের শক্তিতে জিতে আসিনি। তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই জিতেছি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, তৃণমূল হয়ত এখনই বিলীন হয়ে যাবে না। কিন্তু নেতাদের দলত্যাগ ঠেকানো, তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, দলকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা এবং বিজেপি’র উত্থান মোকাবেলার কাজটা মমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন মমতা, তেমনি সেটিই দলটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। কারণ, দলটির পরিচয় বলতে গেলে মমতাকেন্দ্রিক। তবে মমতা দলের প্রাণশক্তি। তার যতক্ষণ লড়াই করার ইচ্ছাশক্তি থাকবে, ততক্ষণই দলের লড়াই করার সুযোগ থাকবে।
এ মূহূর্তে মমতা ও তার দল তৃণমূল বিজেপি’র অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং একইসঙ্গে দলের অভ্যন্তরীন কোন্দলের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাই সামনের দিনগুলোতে তৃণমূলের টিকে থাকা এখন পরীক্ষার মুখে।
নির্বাচন-পরবর্তী ঝড়ের মধ্যে তৃণমূল হয়ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। কিন্তু এর জন্য দলটিকে কী রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: এনডিটিভি/ইন্ডিয়া টুডে