Published : 19 Jun 2026, 10:54 PM
ব্রিটেনের রাজনীতিতে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম অপরিচিত কেউ নন। এক দশকের বেশি সময় আগে তিনি দুবার লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তবে সফল হননি।
এখন আবার তাকে দলটির ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে জনমত জরিপে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং মে মাসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হতাশাজনক ফলের পর দলের অনেক এমপি এখন দলকে পথে আনার জন্য বার্নহ্যামকে যোগ্য নেতা মনে করছেন।
মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে বার্নহ্যাম রিফর্ম ইউকে-এর প্রার্থীকে ৯ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন।
এই জয়ের মাধ্যমে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বিদায়ী মেয়র বার্নহ্যাম ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির পাওয়া ৪৫ শতাংশ ভোটকে প্রায় ৫৫ শতাংশে নিয়ে গেছেন।
এই জয় তার জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লেবার পার্টির নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে এমপি হওয়া প্রয়োজন।
নির্বাচনের আগে বার্নহ্যাম বলেছিলেন, মেকারফিল্ডে জিততে পারলে তিনি সম্ভাব্য নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন।

এভারটনের ভক্ত ও ইন্ডি মিউজিক প্রেমী
১৯৭০ সালে লিভারপুলে জন্ম নেওয়া বার্নহ্যাম বেড়ে ওঠেন চেশায়ারের কালচেথ এলাকায়। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ টেলিকমের প্রকৌশলী, মা ছিলেন একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের রিসেপশনিস্ট। দুজনই ছিলেন লেবার পার্টির সমর্থক।
কৈশোরেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় বার্নহ্যামের। বিবিসির জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘বয়েজ ফ্রম দ্য ব্ল্যাকস্টাফ’ দেখে ১৪ বছর বয়সে লেবার পার্টিতে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা তিনি নিজেই বলেছিলেন।
ফুটবল ক্লাব এভারটনের আজীবন সমর্থক বার্নহ্যাম স্কুলজীবনে খেলাধুলাতেও সক্রিয় ছিলেন। একজন ফাস্ট বোলার হিসেবে তিনি ল্যাঙ্কাশায়ার স্কুল ক্রিকেটেও খেলেছেন।

স্থানীয় রোমান ক্যাথলিক স্কুলে পড়ার সময় বার্নহ্যাম একবার ছায়া নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।
বার্নহ্যাম এবং তার দুই ভাইয়ের আগে পরিবারের আর কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে পড়ালেখা করেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। নিজের বই ‘হেড নর্থ’-এ তিনি লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়েছিল। নিজেকে তার ‘বহিরাগত’ বলে মনে হত।
তবে ‘দ্য স্মিথস’ ও ‘দ্য স্টোন রোজেস’এর মত উত্তরের ইন্ডি ব্যান্ডের ভক্ত বার্নহ্যামের ভাষ্য, ম্যানচেস্টারের সংগীতের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তাকে ‘একটি আলাদা পরিচয় ও সুবিধা’ দিয়েছিল।

সাংবাদিকতা থেকে মন্ত্রিসভায়
স্নাতক শেষ করে সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার শুরু করেন বার্নহ্যাম। শুরুর দিকে 'ট্যাংক ওয়ার্ল্ড' এবং 'প্যাসেঞ্জার ওয়ার্ল্ড ম্যানেজমেন্ট'-এর মত ট্রেড ম্যাগাজিনের হয়ে কাজ করেন।
বয়স যখন কুড়ির কোঠায়, রাজনীতিতে প্রথম বড় সুযোগ পান বার্নহ্যাম। প্রয়াত টেসা জোয়েলের গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন, যিনি তখন ডুলউইচ ও ওয়েস্ট নরউডের এমপি ছিলেন। জোয়েল পরে টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন।
ওয়েস্টমিনস্টারকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি অনীহা থাকলেও বার্নহ্যাম দ্রুত দলীয় নেতৃত্বের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসেন। তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী ক্রিস স্মিথের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। এরপর ২০০১ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারে নিজের শহর লি থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
টনি ব্লেয়ারের অধীনে তিনি প্রথমে জুনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় ট্রেজারির চিফ সেক্রেটারি, সংস্কৃতি মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী হন।
সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া মন্ত্রী থাকাকালে হিলসবরো ট্র্যাজেডির ২০তম বার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দর্শকদের তোপের মুখে পড়েন বার্নহ্যাম।
১৯৮৯ সালের ওই স্টেডিয়াম দুর্ঘটনায় লিভারপুলের ৯৭ জন ভক্ত নিহত হয়েছিলেন। সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি বিষয়টি মন্ত্রিসভায় তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত ওই বিপর্যয়ের দ্বিতীয় তদন্ত শুরু করতে ভূমিকা রাখে।
২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির পরাজয়ের পর গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করলে বার্নহ্যাম দলের শীর্ষ নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামেন। এড মিলিব্যান্ডের কাছে হেরে গিয়ে তিনি পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন।

পরের পাঁচ বছর তৃণমূলের কর্মীদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কাজ করেন বার্নহ্যাম। ২০১৫ সালে আবারও দলের নেতা হওয়ার জন্য লড়েন, তবে সেবার জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন।
সমালোচকরা বার্নহ্যামকে বলেন ‘ওয়েদার ভেন’ বা ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদী’। তাদের মতে, সাফল্যের সর্বোচ্চ সুযোগ পেতে রাজনৈতিক হাওয়া বুঝে নিজের মতাদর্শ বদলে ফেলতে পারদর্শী তিনি।
ব্রেক্সিট গণভোটের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ছিলেন বার্নহ্যাম। এমনকি নিজের জীবদ্দশায় যুক্তরাজ্যকে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেখার আকাঙ্ক্ষাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিলেও ব্রেক্সিট-সমর্থক মেকারফিল্ডে উপনির্বাচনের সময় তিনি বিষয়টি বেশি প্রচারে আনেননি।
দলে টনি ব্লেয়ারের অনুসারী বা মধ্য-ডানপন্থি হিসেবে পরিচিতি থাকার পরও জেরেমি করবিনের শ্যাডো ক্যাবিনেটে শ্যাডো হোম সেক্রেটারির দায়িত্ব পেয়েছিলেন বার্নহ্যাম।
বিবিসি লিখেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে বামপন্থার দিকে ঝুঁকতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে পানি ও জ্বালানি খাত জাতীয়করণের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।
২০১৬ সালে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের বিরোধিতায় যারা পদত্যাগ করেছিলেন, বার্নহ্যাম তাদের মধ্যে ছিলেন না। বরং তিনি ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রথম মেয়র হওয়ার জন্য পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন।
সেই নির্বাচনে বার্নহ্যাম ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং ২০২১ সালে আরও বড় ব্যবধানে পুনরায় নির্বাচিত হন।

'বি নেটওয়ার্ক' ও ‘লকডাউন’
মেয়র হিসেবে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য প্রশংসিত হন বার্নহ্যাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টার লন্ডনের বাইরের প্রথম অঞ্চল, যেখানে বাস পরিষেবা পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং `বি নেটওয়ার্ক’ নামে অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের সঙ্গে একীভূত করা হয়।
মেয়র হিসেবে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২০ সালের মধ্যে তার এলাকায় আর কাউকে ফুটপাতে ঘুমাতে দেখা যাবে না। তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
কোভিড মহামারীর সময় তার পরিচিতি আরও বাড়ে। আঞ্চলিক লকডাউন বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রতি ‘অবজ্ঞা’ প্রদর্শন করেছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। সরকারের সঙ্গে এই মুখোমুখি অবস্থান তাকে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ খেতাব এনে দেয়।
২০২৫ সালের শরতে দলীয় সম্মেলন মৌসুমের মধ্যেই বার্নহ্যাম শীর্ষ পদের জন্য প্রকাশ্যে কৌশল সাজাতে শুরু করেন এবং আবারও নেতৃত্বের দৌড়ে নামার আভাস দিতে থাকেন।
তবে তার কিছু মন্তব্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। সরকার বন্ড মার্কেটের কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে—এমন অভিযোগ করে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
গত জানুয়ারি মাসে ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হয় বার্নহ্যামের সামনে। ওই সময় গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এমপি অ্যান্ড্রু গুইন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তাতে গোর্টন ও ডেন্টন নির্বাচনি এলাকায় উপনির্বাচনের দরকার হয়ে পড়ে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রক পর্ষদ বার্নহ্যামকে নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দেয়।
তবে মে মাসে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির ফল বিপর্যয় ঘটে। জনমত জরিপে রিফর্ম পার্টির জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। তবে বার্নহ্যামের নিজের এলাকায় লেবার পার্টি বেশ ভালো ফল করে।
সব মিলিয়ে স্যার কিয়ার স্টারমারও চাপের মুখে পড়েন। কিছু এমপি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি তোলেন। কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগও করেন।
এরপর বার্নহ্যামের পার্লামেন্টে ফেরার পথ সুগম করতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মেকারফিল্ড আসনে লেবার পার্টির এমপি জশ সাইমন্স।
পরে বার্নহ্যাম ওই নির্বাচনী এলাকার জন্য লেবার পার্টির প্রার্থী নির্বাচিত হন এবং উপ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
এই জয়ের মাধ্যমে তিনি আবারও ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরেছেন এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।