Published : 07 Apr 2026, 06:25 PM
ভিয়েতনামের আইনপ্রণেতারা মঙ্গলবার সর্বসম্মতভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লামকে নতুন করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছেন।
এর মাধ্যমে তিনি গত কয়েক দশকের মধ্যে ভিয়েতনামের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতায় পরিণত হলেন। বহু প্রত্যাশিত এই পদক্ষেপ ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী ‘সম্মিলিত নেতৃত্ব’ ব্যবস্থা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্মিলিত নেতৃত্ব ব্যবস্থায় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং প্রেসিডেন্ট পদে আলাদাভাবে দুইজন মানুষ নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তো লাম একাই এই দুই পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই একক শাসনব্যবস্থায় একজনের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশটিতে কর্তৃত্ববাদী শাসন আরও বাড়তে পারে। তবে প্রতিবেশী চীনের মতো এখন ভিয়েতনামেও অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
তো লাম ২০২৪ সালের অগাস্টে দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় দলীয় প্রধান নির্বাচিত হন এবং ৭ এপ্রিলে তিনি ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন পাঁচ বছর (২০২৬-২০৩১) মেয়াদে।
পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে জানানো হয়, মঙ্গলবার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে উপস্থিত ৪৯৫ জন প্রতিনিধির সবাই কমিউনিস্ট পার্টির এই মনোনয়নকে সমর্থন জানিয়েছেন। মাত্র পাঁচ জন আইনপ্রণেতা অনুপস্থিত ছিলেন।
গত মার্চ মাসের শেষ দিকে এক বৈঠকে শীর্ষ এই পদগুলোর মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তো লাম মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির আরেক অধিবেশনে লে মিন হুংকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
নতুন প্রবৃদ্ধির মডেলের অঙ্গীকার:
ভোটের পর টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তো লাম বলেছেন, একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া তার জন্য সম্মানের।
তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল রূপান্তরকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে ‘নতুন প্রবৃদ্ধির মডেল’ তৈরির অঙ্গীকার করেন।
তার শীর্ষ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, দ্রুত ও টেকসই জাতীয় উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লে হং হিয়েপ বলেন, “তো লামের হাতে অধিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”
তবে তিনি এও বলেন যে, এর ফলে ভিয়েতনাম আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারবে।
আমেরিকার এশিয়া-প্যাসিফিক সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের আলেকজান্ডার ভুভিং বলেন, এই দ্বৈত ভূমিকা ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীন রাজনীতিকে এমন এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থায় নিয়ে যাবে যেখানে সম্মিলিত নেতৃত্বের পুরনো ধারণাগুলো আর কার্যকর থাকবে না।
তো লাম এর আগে ২০২৪ সালে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নগুয়েন ফু ট্রং-এর মৃত্যুর পর কয়েক মাস এই দুটি পদে আসীন ছিলেন।
পরে সেনাবাহিনীর জেনারেল লুয়ং কুয়ংকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও তো লাম বিভিন্ন বিদেশ সফর ও বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নিজেকে দেশের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবেই উপস্থাপন করে আসছিলেন।
সংস্কারপন্থি ও জাতীয় শিল্পের সমর্থক:
পার্টি প্রধান হিসেবে প্রথম মেয়াদে ৬৮ বছর বয়সী তো লাম ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেছিলেন, যা প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি সমালোচিতও হয়েছে।
তিনি ভিয়েতনামের রপ্তানি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি-নির্ভর সস্তা শ্রমের মডেল থেকে বেরিয়ে এসে নতুন একটি মডেলে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চান।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভিয়েতনামের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তো লামের ব্যবসা-বান্ধব অবস্থানের প্রশংসা করলেও তার ‘ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন’ বা দেশীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অতি-সমর্থন এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কেউ কেউ উদ্বিগ্ন।
এর ফলে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং সম্পদের বুদবুদ তৈরির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তো লাম ভিয়েতনামের প্রথাগত ‘ব্যাম্বু ডিপ্লোম্যাসি’ বা নমনীয় কূটনীতি বজায় রেখেছেন এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান:
ভিয়েতনামের নব-নির্বাচিত ৫৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন।
তিনি সবচেয়ে কম বয়সে ওই পদে আসীন হওয়ার রেকর্ড গড়েছিলেন। তিনি ফাম মিন চিহ্নের স্থলাভিষিক্ত হলেন। হুং পার্টির ভেতরে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাধারণত প্রচারের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন।
যদিও তিনি প্রথাগতভাবে অর্থনীতিবিদ নন, তবে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে অর্থনৈতিক দক্ষতা নিশ্চিত করতেই তাকে এই পদে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।
নির্বাচিত হওয়ার পর আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে হুং টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বোচ্চ চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দেন।
তার ব্যক্তিগত কোনও নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তবে তার বাবা জননিরাপত্তা মন্ত্রী ছিলেন এবং তার দুই ভাই নিরাপত্তা বাহিনীর জেনারেল।