Published : 13 Nov 2025, 04:07 PM
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে পানি সঙ্কটে হিমশিম খাওয়া ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, যে ভয়াবহ খরা ইরানকে কাবু করে রেখেছে তা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই এক কোটি বেশি বাসিন্দার শহর তেহরান বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে বৃষ্টি না হলে সরকার তেহরানে পানি রেশনিং বা পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম শুরু করতে পারে।
“রেশন করার পরও যদি বৃষ্টি না হয়, তাহলে এক পর্যায়ে আমাদের কাছে কোনো পানি থাকবে না। তখন তাদের (নাগরিক) তেহরান ছেড়ে যেতে হবে,” গত বৃহস্পতিবার পেজেশকিয়ান এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তেমন কিছু হলে তা ইরানের মোল্লাতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের বিপত্তি সৃষ্টি করতে পারে। ২০২১ সালে পানির ঘাটতির কারণে ইরানের দক্ষিণের খুজেস্তান প্রদেশ সহিংস বিক্ষোব দেখেছে। ২০১৮ সালেও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে পানি নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু বিক্ষোভ হয়েছে, কৃষকরা তখন এমন সঙ্কটের জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছিলেন।
রয়টার্স বলছে, ভয়াবহ গ্রীষ্মের পর ইরানে যে পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে, তার জন্য কেবল কম বৃষ্টিই দায়ী নয়।

বেশি বেশি বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ কূপ খনন, অদক্ষ উপায়ে কৃষিকাজসহ দশকের পর দশকের অব্যবস্থাপনায় দেশটিতে পানির রিজার্ভ কমেছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে একাধিক সমালোচক ও পানি বিশেষজ্ঞ বলেছেন। পানি সঙ্কট এখন এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছে যে গণমাধ্যমগুলোতে এখন এ নিয়েই নিয়মিত প্যানেল আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক চলছে।
পেজেশকিয়ানের সরকার ভয়াবহ এ সঙ্কটের জন্য ‘আগের সরকারগুলোর নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পানি ব্যবহারসহ’ নানান কারণ হাজির করছেন।
যদিও এখন পর্যন্ত এ সঙ্কট নিয়ে বিক্ষোভের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না যে ইরানিরা এমনিতেই চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এ সঙ্কটের প্রধানতম কারণ দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা, যা দেওয়া হয়েছে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে।
পশ্চিমাদের ভয়, ইরান ধীরে ধীরে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের পথে অগ্রসর হচ্ছে। তবে তেহরান এই আশঙ্কাকে অমূলক বলে আসছে। তাদের ভাষ্য, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি একেবারেই শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে মোটেও আগ্রহী নয়।
এ বাধাবাধির মধ্যে এখন শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির বাসিন্দারা নতুন করে তীব্র পানির সঙ্কটে পড়েছেন। উঁচু, উঁচু ভবন সম্বলিত রাজধানী থেকে শুরু করে মাঝারি, ছোট সব শহর এই সঙ্কটের তীব্রতা টের পাচ্ছে।
দিনকয়েক আগে যখন তেহরানের পূর্বাঞ্চলে মেহনাজের অ্যাপার্টমেন্টের কলে পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল, তিনি তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। আগে থেকে কোনো সতর্কবার্তা না থাকায় বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারেননি।
“তখন রাত ১০টার মতো বাজে, ভোর ৬টার আগে পানি আসেনি,” বলেছেন তিনি। কোনো পাম্প বা পানি সংরক্ষিত না থাকায় তাকে ও তার দুই সন্তানকে বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। দাঁত মাজতে ও হাত ধুতে হয়েছে বোতলের পানি দিয়ে।
ইরানের ন্যাশনাল ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার কোম্পানি তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে পানি রেশনিংয়ের খবর উড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তবে কোম্পানিটি বলেছে, তেহরানে রাতের বেলায় পানির চাপ হ্রাস করা হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও এটি শূন্যেও নামতে পারে।
বেশি বেশি পানি ব্যবহার নিয়ে জুলাইয়ে সতর্কও করেছিলেন পেজেশকিয়ান। সেসময় পানি কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তেহরানের ৭০% বাসিন্দা প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত ১৩০ লিটারের বেশি পানি ব্যবহার করছেন।

গত কয়েক বছর ধরে চাহিদা যখন বেশি থাকে তখনই বারবার পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে ইরানিরা।
“এক জটিলতা গেলে আরেকটা আসে, কোনোদিন পানি থাকে না, তো পরদিন বিদ্যুৎ থাকে না। বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত অর্থও নেই আমাদের কাছে। এসবের কারণ অদক্ষ ব্যবস্থাপনা,” মধ্য তেহরান থেকে ফোনে রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন স্কুলশিক্ষক ও তিন বাচ্চার মা শেহলা।
দিনকয়েক আগে ইরানের পানিসম্পদ ইনস্টিটিউটের প্রধান মোহাম্মদরেজা কাভিয়ানপোরকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, গত বছর ইরানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৫৭ বছরের গড়ের চেয়েও ৪০ শতাংশ কম। খরা মৌসুম এ বছরের ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত চলবে বলেও পূর্বাভাসে ধারণা দেন তিনি।
তেহরান মূলত ৫টি জলাধারের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোতে পানি যায় শহরের বাইরের নদীগুলো থেকে। কিন্তু ওই পানির সরবরাহও দিন দিন কমে আসছে।
তেহরানের আঞ্চলিক পানি কোম্পানির প্রধান বেহজাদ পারসা কয়েকদিন আগে বলেছেন, পানির স্তর গত বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আমির কবির বাঁধে পানি নেমে এসেছে মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটারে, যা এর সক্ষমতার মাত্র ৮%।
তিনি জানান, তেহরানের জলাধারগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট, অথচ এখন সেখানে পানি আছে মাত্র ২৫ কোটি ঘনফুট, অর্থ্যাৎ ধারণক্ষমতার অর্ধেক। যে হারে পানি খরচ হচ্ছে, তাতে এই পানিও দুই স্প্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে।
সঙ্কট তীব্র কেবল তেহরানেই নয়। দেশজুড়ে ১৯টি প্রধান বাঁধ (ইরানের মোট বাঁধের প্রায় ১০ শতাংশ) কার্যত পানিশূন্য অবস্থায় আছে।
ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে সংরক্ষিত পানির পরিমাণ ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। শিয়াদের কাছে অতি পবিত্র এ শহরে বাসিন্দার সংখ্যাও প্রায় ৪০ লাখ।
“চাপ এত কম থাকে যে আদতে দিনের বেলায় পানিই পাই না আমরা। আমি পানির ট্যাঙ্কও বসিয়েছি, কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে? অব্যবস্থাপনার কারণেই এমনটা হচ্ছে,” বলেছেন মাশহাদের বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী রেজা। পানির সঙ্কটের কারণে তিনি এখন তার কার্পেট পরিষ্কারের দোকানও চালাতে পারছেন না।
রেকর্ড-ভাঙা তাপমাত্রা ও ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ের পর এই পানির সঙ্কট সামনে এসেছে। পানি ও জ্বালানি ব্যবহার যেন কম হয় সেজন্য সরকার জুলাই ও অগাস্টে জরুরি ছুটিও ঘোষণা করেছিল, কিছু কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে যাওয়ার পর সরকার অনেক সরকারি ভবন ও ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করেছিল।
কর্তৃপক্ষ পানির এবারের সঙ্কট তীব্র হওয়ার পেছনে জলবায়ু সঙ্কটকে দায়ী করে বলছে, বাড়তে থাকা তাপমাত্রায় বাষ্পীভবন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার গতি বাড়ছে।
কিছু কিছু খবরের কাগজ অদক্ষ ব্যবস্থাপকদের নিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার রাজনীতিকরণসহ সরকারের পরিবেশ নীতিরও কড়া সমালোচনা করছে। সরকার অবশ্য এসব দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।
কেউ কেউ সঙ্কট নিরসনে ঈশ্বরের হস্তক্ষেপও কামনা করছেন।

“অতীতে লোকজন বৃষ্টির জন্য প্রার্থনায় মরুভূমিতে যেত, ওই রীতিকে অবজ্ঞা করাও হয়তো ঠিক হবে না,” তেহরানের সিটি কাউন্সিলের প্রধান মেহদি সামরান এমনটা বলেছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
যতখানি পানি আছে তা দিয়ে খরার মৌসুমটা কাটিয়ে দিতে কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় পানির চাপ কমিয়ে দেওয়া, অন্যান্য জলাধার থেকে তেহরানে পানি সরবরাহসহ বেশকিছু অস্থায়ী ব্যবস্থাও নিয়েছে।
কিন্তু এগুলো আদতে কতটুকু কাজে দেবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
পানি সঙ্কট স্থায়ীভাবে মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই পানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক, পাম্প ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপনের ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন।
“অনেক দেরি হয়ে গেছে, যা হয়েছে তাও যৎসামান্য। তারা কেবল প্রতিশ্রুতিই দিয়েছে, কিন্তু আমরা কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। তাদের বেশিরভাগ ভাবনাই বাস্তবায়নযোগ্য নয়,” সরকারের সমালোচনা করে এসবই বলেছেন ইশফাহানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, যিনি তার নাম বলতে রাজি হননি।