Published : 02 May 2026, 08:20 AM
‘হরমুজ প্রণালি এখন থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা’— তেহরানের এমন ঘোষণা উদযাপন করতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গেল ১৭ এপ্রিল ট্রুথ সোশালে একটি পোস্ট দেন।
সেখানে তিনি লেখেন, “ইরান বলেছে যে প্রণালিটি পুরোপুরি খোলা এবং চলাচলের জন্য প্রস্তুত।”
ট্রাম্পের ‘এই পুরোপুরি’ খোলা বেশি দিন টেকেনি। কিন্তু তাড়াহুড়া করে করা ওই মন্তব্যেই হয়ত তিনি নিজের অজান্তে আট সপ্তাহের ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতির কথাটি তুলে ধরেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিক লিখেছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত এখন ‘ইরানের প্রণালি’ হয়ে উঠেছে।
তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, তেহরানের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা কিংবা ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন— ট্রাম্পের কোনো লক্ষণই পূরণ হয়নি।
বিশ্লেষণধর্মী সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন না হলেও এই যুদ্ধ স্থায়ী কিছু পরিবর্তন ডেকে এনেছে।
প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা ও অর্থনীতি খাতের বিশ্লেষকরা মোটা দাগে দুই ধরনের পরিণতির কথা বলেছেন— একটি স্বল্পমেয়াদি, অন্যটির মেয়াদ হবে দীর্ঘ।
স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের উদাহরণ দিতে গিয়ে তারা বলছেন, গেল মাসে দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পর অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা খুব কাছাকাছি সময়ে দেখা যাচ্ছে না।
আলোচনার পদ্ধতি কিংবা চাওয়া-পাওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য। হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি অবরোধের বিষয়টিও আলোচনার অচলাবস্থাকে জিইয়ে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ এখনো আশা করেন, যুদ্ধের প্রভাবে যে অর্থনৈতিক চাপ তারা সইছেন, তা দ্রুতই শেষ হবে। কিন্তু সেটি ঘটবেই, সেই নিশ্চয়তা নেই।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিতে যুদ্ধবিষয়ে মুক্ত সংলাপ আয়োজন করা হয়। সেখানে যুদ্ধের প্রভাবকাল সম্পর্কে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলের কাছে প্রশ্ন করেন উপস্থাপক।
জবাবে সিআইএর সাবেক ওই বিশ্লেষক বলেন, এই প্রভাব কাটতে দুই থেকে নয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তার এই উত্তর অনেক দর্শককে আশাহত করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূগোল সম্ভবত চিরতরে বদলে গেছে।

যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যতটা প্রভাব ছিল, এখন সেটা আরো বেশি। ইরান এখন এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা সব জাহাজে অতিরিক্ত টোল বসাতে পারে। চাইলে ইরানসহ কয়েকটি দেশ মিলে এই সমুদ্রপথ পরিচালনা এবং এর মুনাফা ভাগাভাগিও করতে পারে।
তেহরান সমুদ্রপথটি পুরোপুরি খুলেও দিতে পারে। কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে যে, ইরান যেকোনো শক্তি উপেক্ষো করে যেকোনো সময় প্রণালিটি বন্ধ করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উচ্চপদস্থ কূটনীতিক রিচার্ড হাস বলেন, “ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও অন্তর্নিহিত একটা নিয়ন্ত্রণ সবসময় থাকবে। কারণ তারা একবার এটি বন্ধ করেছে, তাই তারা জানে আবারও করতে পারবে।”
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়।
এটি কার্যত বন্ধ থাকায় নানা বিকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, বন্দর সম্প্রসারণ ও লোহিত সাগর হয়ে (যদিও পুরোপুরি নিরাপদ হবে না) বিকল্প রুট তৈরির মতো পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ধরনের বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ পুনর্গঠন হলে একসময় হরমুজ প্রণালি অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে ঠিকই, কিন্তু এমন পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের যে নিয়ন্ত্রণ, তা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাবে। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের দাম বহু বছর বাড়তি থাকবে। মুদ্রাস্ফীতিও বাড়াবে। আর মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধে নিজেকে দাবি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কেউ কেউ মনে করেন, ট্রাম্প নতুন করে হামলা চালাতে ইচ্ছুক নন। যদিও যুদ্ধে না জড়ানোর বিকল্প এখনো তার সামনে আছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের পাশাপাশি হোয়াইট হাউজের কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের প্রথম দুই মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যে হারে অস্ত্রের মজুদ ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
রোববার ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, হরমুজ প্রণালি কীভাবে খোলা থাকবে, সেই মীমাংসার আগে পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে রাজি নয়।ফলে দুই দেশ এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কে বেশি অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটিই বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতির ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করবে, যা তাদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হবে। অথবা ইরানের তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা ফুরিয়ে যেতে পারে, যা তাদের রপ্তানি মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেবে।
হোয়াইট হাউজ হিসাব কষছে, এই দুই পরিস্থিতির যেকোনো একটি ইরানকে আবার আলোচনারে টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে এবং সেই আলোচনার জেরে হরমুজ খুলে যাবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের’ হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা তাদের যুদ্ধের আগের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।
এই ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরান হয়ত হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে না। সেক্ষেত্রে এই জলপথ থেকে টোল আদায় করে তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
বর্তমানে ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২১টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। সেখানে স্থায়ীভাবে তাদের এই উপস্থিতি প্রয়োজন পড়তে পারে।
আর সেটা ঘটলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে এবং যুদ্ধের ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
সম্প্রতি পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত হিসাব কর্মকর্তা জুলেস হাস্ট কংগ্রেসের শুনানিতে বলেন, এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে আড়াই হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
শুনানিতে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রো খান্না দাবি করেন, এই যুদ্ধের কারণে প্রতি মার্কিন পরিবারে জ্বালানি ও খাদ্য ব্যয় বছরে গড়ে ৫ হাজার ডলার বেড়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিণতিতে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় শঙ্কায় ট্রাম্পকে হয়ত যুদ্ধে ছাড় দিতে হতে পারে।
জাতিসংঘের সংস্থা— ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে ঠেকেছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সড়কের পাশে থাকা গ্যাস স্টেশনের বোর্ডগুলোতে দাম বাড়ার বিষয়টি দৃশ্যমান; প্রতি গ্যালন গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৮ ডলার। দেশটিতে ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলনির্ভর সার শিল্পে সরবরাহ সংকটের কারণে এ বছর খাদ্যপণ্যের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক আনবিক সংস্থা— আইইএ সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় হুমকির’ মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।
এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান।
জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা।
এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।
যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই দেশ। এর তিন দিন পর ৪৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের পাঁচ তারকা হোটেলে সেই আলোচনা শুরু হয় ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায়। দফায় দফায় বৈঠকের মধ্যদিয়ে পরের দিন সকালে গড়ানো সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ হয় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।
এর মধ্যে গেল মঙ্গলবার দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকি ও অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
আরো পড়ুন
হরমুজের নাম ট্রাম্প প্রণালি, প্রকাশ্যে এল নতুন মানচিত্র
যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে 'যন্ত্রণাদায়ক জবাব' দেওয়ার হুমকি ইরানের
নতুন বার্তায় উপসাগরে 'যুক্তরাষ্ট্রহীন ভবিষ্যতের' দৃঢ়সঙ্কল্প মুজতাবা
শান্তি আলোচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: সমঝোতার পথটা বন্ধ নয়, বন্ধুর