Published : 18 Feb 2026, 03:36 PM
চুক্তি করতে তার আগ্রহের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আগে থেকেই চাউর হয়ে আছে, তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে তার প্রিয় দুই দূতকে জেনিভায় একই দিনে দুই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সঙ্কটের আলোচনা সামলাতে পাঠিয়েছেন, তা দেখে পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই হতবাক হয়ে গেছেন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা এবং রাশিয়া-ইউক্রেইন সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে মঙ্গলবার জেনিভায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনার যে ‘শাটল কূটনীতির’ আশ্রয় নিয়েছেন, তা কেবল তাদের ওপর বাড়তি চাপ কিংবা তারা আদৌ সক্ষম কিনা সে প্রশ্নই তুলছে না, দুই সঙ্কটের একটিও তারা সফলতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও সংশয় সৃষ্টি করেছে, ভাষ্য বিশেষজ্ঞদের।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম বছরে একাধিক যুদ্ধ-সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব দাবি করা ট্রাম্প যে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ব্যাগে ভরে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ীদের তালিকায় নিজের নাম ঢোকাতে তৎপর, তা তিনি আগেই স্পষ্ট করেছেন।
তা সত্ত্বেও, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট নিয়ে তড়িঘড়ি আলোচনা এবং একইদিনে দুটি বৈঠকের স্থান হিসেবে একই শহরকে বেছে নেওয়ার কারণ কী, ওয়াশিংটন এখনও সেই ব্যাখ্যা দেয়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
জেনিভাকে বেছে নেওয়ার একটি কারণ থাকতে পারে, তা হল- আন্তর্জাতিক কূটনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সিদ্ধান্তের সাক্ষী এ শহর। কিন্তু তাই বলে একইদিনে ভৌগোলিকভাবে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের দুই সঙ্কট নিয়ে বসতে হল? তাও উইটকফ, কুশনারকে একসঙ্গে? সঙ্কট সামলাতে পারদর্শী আর কোনো মার্কিন কূটনীতিক নেই? এমন একাধিক প্রশ্ন উঠছেই।
“কূটনীতির জটিল বিস্তৃত কাজের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প মনে হয় মানের চেয়ে সংখ্যায় বেশি নজর দিচ্ছেন। একই স্থানে একই সময়ে উভয় ইস্যুকে সামলানোর কোনো অর্থ দাঁড়াচ্ছে না,” বলেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক পরামর্শদাতা ব্রেট ব্রুয়েন। তিনি এখন কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান।
জেনিভায় মঙ্গলবারের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় ইরানকে দিয়ে। সুইস ও ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী শহরটির দুটি স্থানে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ আলোচনা।
ওমানের মধ্যস্থতায় সাড়ে তিন ঘণ্টার এ আলোচনায় উইটকফ, কুশনারের মার্কিন প্রতিনিধিদের বিপরীতে ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ আলোচনায় ‘খানিকটা অগ্রগতির’ ইঙ্গিত দিলেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি আসন্ন এমন কোনো আভাস মেলেনি।
এই আলোচনার মধ্যেও ইরানের আশপাশে সৈন্য সমাবেশ ক্রমেই বাড়িয়ে চলছেন ট্রাম্প। যাতে বোঝা যাচ্ছে, শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে হামলার সম্ভাবনা এখনও খারিজ করেননি তিনি। ওয়াশিংটনের এ মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যকে তটস্থ করে রেখেছে।
এবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা পুরো অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যুদ্ধের সূচনা করতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষকই আশঙ্কা করছেন।
‘অত্যধিক দায়িত্ব’?
ইরান আলোচনা শেষ হওয়ার পর মঙ্গলবার কোনো বিরতি ছাড়াই মার্কিন প্রতিনিধিরা ওমানের কূটনীতিক মিশন থেকে সোজা চলে যান পাঁচ-তারকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে, সেখানে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেইন দুই দিনের শান্তি আলোচনার প্রথম দিনের বৈঠক।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেইনে ‘সর্বাত্মক অভিযানে’ নেমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় স্থলযুদ্ধ ফেরায়। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারে এ যুদ্ধ একদিনে শেষ করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, কিন্তু সোয়া এক বছর হতে চললেও সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইউক্রেইনের দখলে থাকা দনবাসের বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু ইস্যুতে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় এ দফার আলোচনাতেও কোনো ব্রেক থ্রু আসবে বলে মনে হচ্ছে না।
ইরানের নেতাদের ঘনিষ্ঠ একটি আঞ্চলিক কার্যালয় বলছে, জেনিভায় মার্কিন দল যে ‘ডবল এজেন্ডা’ নিয়ে হাজির হয়েছে তাতে কোনো সঙ্কটের কূটনৈতিক সমাধানে ওয়াশিংটনের আগ্রহ আদৌ আছে কিনা সে সন্দেহই জোরদার হচ্ছে।
“এই পদ্ধতিতে (মার্কিন) দলটির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এটা অনেকটা এরকম—হাসপাতালের জরুরি কক্ষে দুই গুরুতর রোগীর জন্য একজনই চিকিৎসক আছেন, ফলে তিনি কোনো রোগীর দিকেই পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারছেন না, যা ব্যর্থতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন এক কর্মকর্তা।
বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মোহানাদ হাজ-আলি বলছেন, ইরান সঙ্কটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, কিন্তু এ ধরনের কূটনীতিতে সেসব স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
“উইটকফ ও কুশনারের দলকে বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব দেওয়া, সত্যি বলতে কি, এটি চমকে দেওয়ার মতো বাস্তবতা,” বলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার জগত থেকে আসা এই দুই মার্কিন দূতের যোগ্যতা নিয়েও অনেক বিশেষজ্ঞই সন্দিহান।
আরাগচি এবং রুশ কূটনীতিকদের যে প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা সেই তুলনায় এরা অনেকটাই শিশু, এবং দুই অঞ্চলের দুই সংঘাতময় পরিস্থিতির অনেক কিছুই তাদের মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা, বলছেন তারা।
এদের জায়গায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থাকলেও অনেক কাজে দিত বলে মত তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক রুবিও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবেও খ্যাত। কিন্তু জেনিভার দুটি বৈঠকেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।
এসব প্রসঙ্গে মন্তব্য চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, ট্রাম্প ও তার দল ইউক্রেইনে প্রাণহানি বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই পক্ষকে একত্রিত করতে ‘অন্য যে কারও চেয়ে বেশি কাজ করে যাচ্ছে’।
তিনি প্রেসিডেন্টের ভূমিকা নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘সমালোচকদের’ মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করলেও জেনিভায় একইদিনে দুই বৈঠক নিয়ে রয়টার্সের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব দেননি।
‘সবকিছুর দূত’
চুক্তি করার ক্ষেত্রে দক্ষতা, ট্রাম্পের আস্থা এবং প্রচলিক কূটনৈতিক পদ্ধতির ব্যর্থতাকে উদ্ধৃত করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেকদিন ধরেই উইটকফ ও কুশনারের ভূমিকার গুণগান গেয়ে যাচ্ছেন।
দায়িত্বের আওতা বিস্তৃত হওয়ায় ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধু উইটকফকে এখন প্রায়ই ‘সবকিছুর দূত’ বলে ডাকা হয়। তিনি গত বছর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রেখেছিলেন। ওই চুক্তির কারণে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের অবসান হলেও স্থায়ী সমাধানের পথে এখনও বড় ধরনের কোনো অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গাজায় পারলেও ইরান ও রাশিয়া ইস্যুতে উইটকফের নিয়মিত দৌড়ঝাঁপে এখন পর্যন্ত বলার মতো সফলতা আসেনি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কুশনার আব্রাহাম চুক্তিতে বিভিন্ন আরব দেশকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। ওই চুক্তির বলে একাধিক মুসলিম দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। তবে ট্রাম্পের এবারের মেয়াদে এখন পর্যন্ত ওই চুক্তির আর কোনো অগ্রগতির খবর শোনা যাচ্ছে না।
অনেকে বলছেন, ট্রাম্প যে এবার ক্ষমতায় বসেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন, তাও কুশনার ও উইটকফের কূটনৈতিক দায়িত্ব সামলানোর সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
“আমরা আমাদের কূটনৈতিক বেঞ্চকে ফোকলা করে ফেলতে দেখেছি। সে কারণেই বড় বড় জটিল বিষয়গুলো সামলানোর মতো উপযুক্ত লোক আমাদের এখন আছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে,” বলেছেন ওবামা আমলের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক পরামর্শক ব্রুয়েন।