Published : 27 Mar 2026, 06:28 PM
র্যাপার গায়ক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বালেন্দ্র শাহ নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। কয়েক দশকের মধ্যে তিনিই নেপালের সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী।
গত বছর নেপালে তরুণ-যুবাদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বিশাল জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে দিয়ে ‘বালেন’ নামে পরিচিত বালেন্দ্র শাহ নেপালের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার বার্তা দিয়ে একটি গান প্রকাশ করেছেন।
৩৫ বছর বয়সী এই নেতার উত্থান নেপালের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অভিজাত শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কাছে তার পরিবর্তন নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
বালেন্দ্র শাহ তার প্রকাশিত গানের একটি লাইনের কথায় বলেছেন, ‘অবিভক্ত নেপালি, এবার ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।’ গানটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০ লাখের বেশি মানুষ সেটি দেখেছে।
এই গান ফিরিয়ে নিয়ে যায় শাহের গোপন সেই র্যাপ জগতের শেকড়ে, যেখানে তিনি গানে গানে নেপালের দুর্নীতি ও সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলতেন।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে মাত্র তিনবছর দায়িত্ব পালনের পর বালেন্দ্র শাহ ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’(আরএসপি)-তে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে এ মাসের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন।
শাহের সমর্থকরা তাকে পরিবর্তনের প্রতীক এবং নেপালের পুরোনো শাসক গোষ্ঠীর ব্যর্থতা থেকে মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখছে। তবে চার বছরের পুরোনো দল আরএসপি তাদের বলিষ্ঠ সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে কারও কারও সংশয় আছে।
বিদ্রোহী র্যাপার:
বালেন্দ্র শাহের জন্ম ১৯৯০ সালে কাঠমান্ডুর নরদেবীতে। মা–বাবার একমাত্র ছেলে তিনি। তার বাবা একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং মা গৃহিণী। শাহ বিবাহিত ও তার এক মেয়ে আছে।
স্কুল শেষের পর শাহ কাঠমান্ডু এবং পরে ভারতের কর্ণাটক রাজ্য থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০১৩ সালে নেপালের জনপ্রিয় এক র্যাপ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় জেতার পর তিনি আলোচনায় আসেন। তার গানের কথার মাধ্যমে তিনি সেই প্রজন্মের হতাশা তুলে ধরেছিলেন, যারা নিজেদের নিপীড়িত এবং অবহেলিত মনে করত।
এরপর শাহ আরও কিছু জনপ্রিয় গান প্রকাশ করেন যেগুলোতে নেপালের দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরে এর সমালোচনা করা হয়।
মিউজিক ভিডিওগুলোতে তার চিরচেনা কালো সানগ্লাস, কালো ব্লেজার ও কালো প্যান্ট তাকে এক ভিন্ন রূপ দিয়েছিল। তার জনপ্রিয় একটি গান ‘বলিদান’ (ত্যাগ) ইউটিউবে ১ কোটি ৪০ লাখ বার দেখা হয়েছে।
২০২২ সালে রাজনীতিতে নতুন মুখ হিসেবে শাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কয়েক দশকের প্রভাবশালী পুরোনো দলগুলোর প্রার্থীদের হারিয়ে বিপুল ভোটে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মেয়র আমলে তিনি শহর পরিষ্কার রাখা, দেশীয় ঐতিহ্য রক্ষা ও দুর্নীতি দমন অভিযান চালিয়েছেন। তবে অবৈধ ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চালিয়ে তিনি যেমন যানজট কমিয়ে প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি ফেরিওয়ালা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।
ক্ষমতায় উত্থান:
গত সেপ্টেম্বরে নেপালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ৭৭ জন নিহতের অনেকেই পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। সে সময় বালেন্দ্র শাহের বার্তা যুবসমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে শুরু হওয়া নেপালের আন্দোলন মূলত পরে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল।
বিক্ষোভকারীরা শাহের গান ‘নেপাল হাসেকো’ (নেপাল হাসছে)-কে তাদের স্তবগান হিসেবে গ্রহণ করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ঘরে ঘরে বাজতে থাকে এই গানের সুর।
শাহ তার নির্বাচনী প্রচারে সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার এড়িয়ে চলা এবং আলোচনার আড়ালে থাকার ভিন্ন এক কৌশল নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জবাবদিহিতা এড়াতে চেয়েছিলেন বলেই অভিমত সমালোচকদের।
শাহ মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। সেখানে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, বিচার বিভাগের সংস্কার ও ১২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন।
তার কৌশলে কাজ হয়েছে। গত ৫ মার্চের নির্বাচনে তার দল বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে তার নিজ নির্বাচনী আসনেই শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছেন শাহ।
বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ:
তবে বালেন্দ্র শাহের রেকর্ড অবশ্য একেবারে বিতর্কমুক্ত নয়। তিনি মেয়র থাকাকালে ফেরিওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলো তার সমালোচনা করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শাজ বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। গত নভেম্বরে তিনি একটি পোস্টে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও নেপালের কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে অশালীন কথা বলেছিলেন।
অবশ্য পরে তিনি সেই পোস্ট মুছে দেন। তবে এই বিতর্ক ছাড়াও এখন শাহ ও তার দলের সামনে আছে ভোটারদের বিশাল প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের সমস্যা, বেকারত্ব, ভেঙে পড়তে থাকা অর্থনীতি এবং শাসন পরিচালনায় দলের অভিজ্ঞতার অভাব সব মিলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে আছেন বালেন্দ্র শাহ।