Published : 30 Mar 2026, 10:11 PM
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা চলার সময়েই ইরানে স্থল অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড (প্রায় ৪০০ কেজি) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কব্জায় আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এই ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে। এজন্যই এই ইউরেনিয়াম সঞ্চয় করে রেখেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অভ্যন্তরীন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ট্রাম্প তার পরামর্শদাতাদেরকেও ইরানকে চাপ দিতে বলেছেন, যেন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে তারা এই পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়।
ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন, ইরান এই উপাদান রাখতে পারবে না। আলোচনার টেবিলে ইরান রাজি না হলে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে এই ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার কথাও তিনি আলোচনা করেছেন।
তবে এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। তার কথায়, ‘খুব দ্রুত একটি চুক্তি হতে পারে।’
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্ক। তবে এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে সরাসরি কোনও আলোচনা শুরু হয়নি।
ট্রাম্পের লক্ষ্য:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নেপথ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। তবে একটি বিষয়ে ট্রাম্প বরাবরই অনড় ছিলেন যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা চলবে না।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত, বিশেষ করে ইরানের কাছে থাকা প্রায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি উপযোগী ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা দখলে নেওয়ার ক্ষেত্রে, সে বিষয়ে ট্রাম্প এখনও অনেকটাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
স্থলসেনা:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার স্থল সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ৩,৫০০-এর বেশি সেনা, যার মধ্যে আছে ২,৫০০ মেরিন সদস্য, ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে গেছে।
রোববার রাতে ট্রাম্প আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে চলতে হবে, না হলে “তাদের দেশই আর থাকবে না।” ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে তিনি বলেন, “তারা আমাদের কাছে সেই পারমাণবিক ধূলিকণা হস্তান্তর করবে।”
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি:
গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালানোর আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ উচ্চমাত্রার প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ বিভাজ্য পদার্থ (ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল) ছিল।
এই বিভাজ্য পদার্থকে সহজেই ৯০ শতাংশ অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব। হামলার পর দাবি করা হয়েছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, এই উপাদান ইরানের ইস্পাহান ও নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ দুটি স্থানে সুরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়া, ইরানের আছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ যন্ত্র সেন্ট্রিফিউজ এবং মাটির নিচে নতুন সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা গড়ার সক্ষমতাও তাদের আছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা:
‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও তার কিছু মিত্র দাবি করেছেন যে, এই ইউরেনিয়াম একটি সুনির্দিষ্ট অভিযান চালিয়েই কব্জা করে নেওয়া সম্ভব।
এতে যুদ্ধের সময় খুব বেশি বাড়বে না এবং যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই সংঘাত শেষ করতে পারবে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ঝুঁকি:
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম দখলের অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ইরানে প্রবেশ করতে হতে পারে, যা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ ইরানের পাল্টা হামলা উসকে দিতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অভিযানে অংষ নেওয়া সেনাদেরকে শত্রু অঞ্চলে প্রবেশ করে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং ক্ষএপণাস্ত্রের হুমকির সম্মুখীন হতে হবে।
এই হুমকির মুখে সেনাদেরকে প্রথমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে তারপর ধ্বংসাবশেষ, ভূমিমাইন ও অন্যান্য ফাঁদ এড়িয়ে ইউরেনিয়ামের সন্ধান করতে হবে। এরপর বিশেষ দলের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করে তা নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে।
ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ৪০ থেকে ৫০টি বিশেষ সিলিন্ডারে সংরক্ষিত থাকতে পারে। সেগুলো নিরাপদে পরিবহনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়াম উত্তোলনের স্থানে যদি উপযুক্ত বিমানপোত না থাকে তবে সরঞ্জাম পরিবহণ এবং উত্তোলিত পদার্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীকে নিজেদেরই একটি বিমানঘাঁটি স্থাপন করতে হবে। এই গোটা অভিযান শেষ করতে কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে একমত নন প্রশাসনের সবাই:
ইরান নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীদের মধ্যে ইরান নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থানে আছেন। তবে ট্রাম্প বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলেও গ্যাবার্ড দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-সহ কিছু শীর্ষ রিপাবলিকান ইরানে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানের ইউরেনিয়াম কব্জায় নেওয়ার জন্য সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল ও সম্প্রসারিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।