Published : 05 May 2026, 01:39 AM
বুথফেরত ফলের আভাস এবার আর মিথ্যা হল না, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির গেরুয়া সুনামিতে ভেসে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের নীল দুর্গ।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লাগোয়া ভারতের এই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটল। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে প্রথমবারের মত রাজ্য চালানোর ভার দিল পশ্চিমবঙ্গবাসী।
এনডিটিভির রিসার্চ এডিটর অজিত কুমার ঝার ভাষায়, নির্বাচনে তৃণমূলের এই হার নিছক পরাজয় নয়, বরং এক ধরনের ‘কাঠামোগত ওলটপালট’। আর দ্য হিন্দুর সাংবাদিক শিব সাহাই সিংয়ের বিশ্লেষণ হল, নরেন্দ্র মোদীর দলের পশ্চিমবঙ্গ জয় নিছক জয় নয়, বরং বিরাট এক ‘আদর্শিক সাফল্য’।
বিজেপির এই বিপুল বিজয়কে ঝড় বা টর্নেডো মানতে আপত্তি নেই আনন্দবাজারের সাংবাদিক অনিন্দ্য জানার। তবে তার বিচারে এবারের বিধানসভা নির্বাচন আসলে ছিল ‘প্রত্যাখ্যানের’ ভোট। এই ভোটের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনকে ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে।
“তার মানে কি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রো-বিজেপি হয়ে গেছেন? আমার মনে হয়, এই ভোটটা ছিল ‘মমতা’ অর ‘নো মমতা’। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘নো মমতায়’ ভোট দিয়েছেন।”
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। তাতে রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোট পড়ে, যা নিয়ে নানা কথা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম কেটে দেওয়ার ঘটনাও কম সন্দেহ জাগায়নি। পশ্চিমবঙ্গ জিতে নিতে নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি কতটা মরিয়া, ভোটার তালিকা সংশোধনের ওই প্রক্রিয়াকে তার নমুনা হিসেবে দেখিয়েছে মমতার দল তৃণমূল।
অনিয়মের অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন। সে কারণে সোমবার ২৯৩ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়।
তাতে বিজেপি পেয়েছে ২০৬ আসন। আর মাত্র ৮১টি আসনে জিতে ভরাডুবির মুখে পড়তে হয়েছে তৃণমূল সংগ্রেসকে।
এর আগের বিধানসভা নির্বাচনে ২০২১ সালে তৃণমূলের আসন ছিল ২১৪টি। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে ১৩৩টি আসন তারা এবার খুইয়েছে। এমনকি দলের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজের আসনেও হেরেছেন। হেরে গেছেন তার সরকারের অন্তত ১৭ জন মন্ত্রী।
অন্যদিকে ২০২১ সালে মাত্র ৭৭ আসন পাওয়া বিজেপির ঘরে এবার যোগ হয়েছে ১২৯টি আসন। সব মিলিয়ে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনের জয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে বিপুল শক্তি নিয়ে।
এছাড়া কংগ্রেস ২টি, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ২টি সিপিআইএম ১টি এবং অল ইনডিয়া সেকুলার ফ্রন্ট ১টি আসনে জয় পেয়েছে।

খেলা শেষ
প্রত্যাবর্তন নয়, ভারতের বাংলা ভাষাভাষী এই রাজ্যের মানুষ এবার রায় দিয়েছে পরিবর্তনের পক্ষে।
সোমবার সকালে ভোট গণনা শুরুর পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস এবার মিলে যেতে চলেছে। দুপুরের পর থেকেই বিজেপি অফিসের সামনে শুরু হয়ে যায় উৎসব আর উদযাপন।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৪৭ আসন। রাত ৯টার আগে আগে বিজেপি সেই দাগ পেরিয়ে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন বিজেপিকর্মীরা। গেরুয়া আবির উড়িয়ে ‘জয় শ্রীরাম’স্লোগান দিতে থাকেন তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজ্য বিজেপি বার্তা দেয়, ‘খেলা শেষ’।
২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের আগে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন; যা পরে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও একাধিকবার এ স্লোগান ব্যবহার করেন। এবার সেই স্লোগানকে কটাক্ষ করে বিজেপি মমতার ‘খেলা শেষ’হওয়ার বার্তা দিল।
তবে পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ফল পাল্টে দেওয়ার’ অভিযোগ তুলে তিনি বলেছেন, ১০০টির বেশি আসন ‘লুট’ হয়েছে।
“এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।”
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে ফিরে এসেছে সেই ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ স্লোগান। বিহার, ওড়িশার মত পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ওপর ভরসা রাখায় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
দিল্লিতে বিজেপি সদর দপ্তরে নরেন্দ্র মোদী দলের বিজয় উদযাপন মঞ্চে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির প্রিয় পোশাক ধুতি পাঞ্জাবি পরে। তিনি বলেন, “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, সর্বত্র পদ্ম ফুটেছে।”
তার ভাষায়, “বাংলায় পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আজ থেকে বাংলা ভয়মুক্ত হল। বাংলায় রাজনৈতিক হিংসায় অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে, এবার বদলা নয়, বদল।”
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর বলছে, আগামী ২৫ বৈশাখ (৯ মে) কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অষ্টাদশ বিধানসভার শপথগ্রহণ হবে রাজভবনে।

পশ্চিমবঙ্গ জয় বিজেপির ‘ট্রফি’
এনডিটিভি লিখেছে, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় হলেন সেই কারণ, যার জন্য বিজেপি দাবি করে, তারা বাংলা ‘জয়ের’ জন্য এত কঠোর লড়াই করেছে। শ্যামা প্রসাদকে তারা দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করে।
দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রধান রাস্তা হল ‘এস পি মুখার্জি রোড’। কলকাতার অধিকাংশ বাসিন্দা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামের সাথে এই রাস্তাটির মাধ্যমেই পরিচিত। এই রাস্তাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে যুক্ত করেছে, যার মধ্যে কালীঘাট এবং ভবানীপুর এলাকাটিও রয়েছে, যেখানে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি এবং তার নির্বাচনী কেন্দ্র অবস্থিত।
প্রখ্যাত বাঙালি গণিতবিদ, আইনজীবী ও কলকাতা হাই কোর্টের সাবেক বিচারপতি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন জওহরলাল নেহেরুর মন্ত্রী সভায় ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী (বর্তমানে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়)। পরে রাজনৈতিক মতদ্বন্দ্বে তিনি নেহেরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সহযোগিতায় বিজেপির পূর্বসূরি দল ভারতীয় জনসঙ্ঘ দল প্রতিষ্ঠা করেন।
এনডিটিভি লিখেছে, এই নির্বাচনে বিজেপি বারবার শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা সামনে এনেছে তাদের ‘বাঙালি পরিচয়’ তুলে ধরার জন্য, যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ‘বহিরাগত’ তকমা মোকোবেলা করা যায়।
শুধু দলের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে নয়, বিজেপি শ্যামাপ্রসাদকে প্রাতঃস্মরণীয় করে রেখেছে আরেক কারণে। কারণ তিনি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলাকে ভেঙে হিন্দুদের জন্য পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গড়তে সহায়তা করছিলেন।
বিজেপির সাবেক সভাপতি জেপি নাড্ডা বলেন, “আজ যদি বাংলা ভারতের অংশ হয়ে থাকে, তবে তা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্য। শুধু তাই নয়, অবিভক্ত পাঞ্জাবের একটি বড় অংশ আজ ভারতের সাথে থাকার কারণও তার উত্থাপিত কণ্ঠস্বর।”
তবে বিবিসি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এক বড় ব্যতিক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মোদীর দল বিজেপি ভারতের হিন্দিভাষী বলয় জুড়ে জয়জয়কার করেছে, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং একসময়ের প্রতাপশালী আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করেছে। তবুও ‘সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার আত্মপরিচয়ে মগ্ন’ পশ্চিমবঙ্গ অটলভাবে তাদের প্রতিরোধ ধরে রেখেছিল।
১০ কোটির বেশি মানুষের পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা জার্মানির চেয়েও বেশি; যা এই নির্বাচনকে ভারতের সাধারণ কোনো রাজ্য পর্যায়ের ভোটের চেয়ে জাতীয় নির্বাচনের মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।

দীর্ঘ দেড় দশক পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দলের কর্তৃত্বে এল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। এনডিটিভির বিশ্লেষণ বলছে, ভোটের এই ফলাফল ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং অবকাঠামো নির্মাণের মত দলটির গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উদার জনকল্যাণমূলক অনুদান এবং দেশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে আবেদন পৌঁছানোর যে কৌশল মোদী গ্রহণ করেছেন, তা এখন একটি নিশ্চিত জয়ের ফর্মুলায় পরিণত হয়েছে। এমনকি বিরোধীদের শক্ত ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতেও এটি কাজ করছে। এর পেছনে রয়েছে বিশাল নির্বাচনী তহবিল, যার তুলনায় বিরোধীদের অর্থবল একেবারেই নগণ্য।
আহমেদাবাদ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক নীলঞ্জন সরকার বলেন, “বিরোধীদের বড় দুর্বলতা হল আদর্শগতভাবে চালিত একটি স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করতে না পারা।”
তবে বিরোধী দল এবং কিছু বিশ্লেষক বলছেন, বিজেপির এই সাফল্য আসামে নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো বিষয়গুলোর প্রতিফলন, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ (যাদের মধ্যে অনেকেই মুসলিম) তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এই বাদ পড়াদের বড় অংশই তাদের সমর্থক। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, এই প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।

‘প্রত্যাখ্যানের’ ভোটে বাঁক বদল
এনডিটিভির রিসার্চ এডিটর অজিত কুমার ঝা এক মন্তব্য প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের হারের কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গ সবসময়ই এমন এক জায়গা, যা নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকাতে অস্বীকার করে, হোক তা কোনো সাম্রাজ্য, বা কোনো আদর্শ।
তিনি বলেন, “বিজেপির যখন নির্বাচনে জয়জয়কার, যখন গেরুয়া ঝড়কে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের মত অনিবার্য মনে হয়, তখন প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে এটি রাজনীতির কোনো কৌশল, জোট বা জনসভার চমৎকার পরিচালনার ফল। কিন্তু ভারতের রাজনীতি কখনোই কেবল সুপরিচালিত কোনো মঞ্চায়ন নয়। এটি আসলে রাজ্যের সার্বিক পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার ফল।”
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলকে পরিবর্তনের পক্ষে ‘বিশাল রায়’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলছেন, “এই রাজ্যে বিজেপির জয় একটি নজিরবিহীন ঘটনা, প্রায় একটি মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মত। কারণ, এখন পর্যন্ত বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের লালিত আবেগীয় মানচিত্রে সেভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। এমনকি বিজেপিবিরোধী রাজনীতিকদের তৈরি করা বয়ানটি ছিল অনেকটা, নিয়তিবাদের মত। তারা বলত, বিজেপি হল হিন্দি বলয়ের সৃষ্টি, যা তার সংকীর্ণ ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান’ ছাঁচে আটকে আছে। বলা হত, তারা এখানে স্থায়ী বাসিন্দা নয় বরং একজন অতিথি হয়েই থাকবে।
“তারপরই এল সেই ঢেউ। এটি কেবল নির্বাচনী উত্থান নয়, বরং বিশ্বাসের এক নতুন পথচলা, যাকে অতিশয়োক্তি ছাড়াই জনজোয়ারের এক ‘নীরব সুনামি’ বলা যেতে পারে।”
অজিত কুমারের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস, যারা একসময় রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিল, তাদের আসন সংখ্যা ২০২১ সালের ২১৫ থেকে কমে মাত্র ৯২-এ দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল হার নয়; এটি এক ধরনের উচ্ছেদ, এক ধরনের ‘সামষ্টিক ওলটপালট’।
আর আনন্দবাজারের সাংবাদিক অনিন্দ্য জানার ভাষায়, “ইট ইজ আ টোটাল রিজেকশন অফ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যান্ড হার গভর্নমেন্ট। ইট ইজ আ টোটাল রিজেকশন।”
এই প্রত্যাখ্যানের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রসঙ্গ টানেন, যেবার সিপিএম এর সাড়ে তিন দশকের সরকারের পতন ঘটেছিল এই মমতার হাতেই।
“সেটা ‘নো সিপিএম’ ভোট ছিল। এখন সেই তখন ২০১১ সালে মানুষ নো সিপিএম ভোট দেওয়ার জন্য একটা আধার মানুষের দরকার ছিল। সেই আধারটা প্রোভাইড করেছিলেন মমতা, কংগ্রেস, মাওয়িস্ট, এসইউসিআই সবাই মিলে।
“এটা মনে রাখতে হবে যে মমতা যখন ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন তার কিন্তু একটা প্রিলিউড ছিল, জোট ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে, যদিও সরকার চালানোর এক বছরের মধ্যে সেই জোট ভেঙে কংগ্রেস বেরিয়ে যায় বা কংগ্রেস সেই জোটে থাকতে পারেনি, তারপর থেকে মমতা একলাই চালিয়েছেন সরকার।”
এবারের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এইবারে, এই ক্ষেত্রে, বিজেপি সেই আধারটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে দিয়েছে। যে কারণে এই পরিমাণ ভোট (নো মমতা ভোটটা) এই বাক্সে গিয়ে পড়েছে। ঝড় উঠেছে।”

কিন্তু এই ঝড় কীভাবে উঠল? মমতার বিরুদ্ধে এরকম বিপুল প্রত্যাখ্যানের শক্তি কীভাবে জড়ো হল?
অনিন্দ্য জানা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির ব্র্যান্ডিংটাই ছিল–‘আমি তোমাদের লোক’। সেই রাজনীতিতে তিনি দীন, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠেছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারায় পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন তিনি।
“আমার খুব মনে হয়েছিল যে কোথাও উনি বোধহয় ওনার যে রাজনৈতিক ধর্ম, সেটা থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। এটা খুব সাম্প্রতিক ঘটনার কথা আমি বলছি। কিন্তু এটার একটা প্রিলিউড আছে, একাধিক কারণ আছে।
“প্রথম যদি কারণ আমরা ডিডিউস করতে বসি, সেটা হচ্ছে নিচুতলার নেতাদের টাকা তোলা, স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি, যার ফলে ক্রমশ গরিব মানুষের কাছ থেকে তৃণমূলের একটা সরণ হয়ে গিয়েছিল। যারা খুব গরিব মানুষ, যারা সিপিএমকে প্রত্যাখ্যান করে দিদির কাছে এসেছিল। এবার তারাই কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সরে যেতে লাগল বা তৃণমূলের কাছ থেকে সরে যেতে লাগল।”
বছরের পর বছর বিভিন্ন ফোরামে একতরফা ভোট করিয়ে, পুলিশের সাহায্যে ভোট করিয়ে তৃণমূল নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছে বলে মনে করেন এই সাংবাদিক।
তিনি বলেন, “যখন আমি জিজ্ঞাসা করেছি, পাবলিকলি এবার বড় ফুল না ছোট ফুল, তারা নির্দ্বিধায় গলা তুলে বলেছেন বড় ফুল এবার দেখাব। গাড়ির চালক, বাড়িতে কাজ করেন, গৃহসহায়িকা, দিনের পর দিন তারা তৃণমূলকেই ভোট দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি।
“এবার তারা নিজেদের ভোটটা দিয়েছেন। আর অ্যাজ উই অল নো, আমার ভোট, তোর ভোট, মুখ্যমন্ত্রীর ভোট, বিরোধী দলনেতার ভোট সকলের ভোটের মানই এক। ফলে এই যে একটা সামগ্রিক রিজেকশন, আমার মতে ইটস আ টোটাল রিজেকশন, অ্যান্ড এই রিজেকশনটা এত তীক্ষ্ণ, যে কারণে বিজেপি এরকম একটা অভাবনীয় ফল করেছে।”