Published : 01 Sep 2025, 07:17 PM
চীনের তিয়ানজিন শহরে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে প্রথম যৌথ ঘোষণায় কাশ্মীরের পেহেলগামে জঙ্গি হামলার নিন্দা জানিয়েছে সদস্যদেশগুলো।
সোমবার প্রকাশিত এই ঘোষণা ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
পেহেলগামে হামলা নিয়ে এসসিও’র সদস্যদেশগুলো কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে ঠিক তখন, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা দিয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের উপস্থিতিতেই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে সম্মেলনে কড়া বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী৷ এসসিও সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও ভারতের বার্তাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
ঘোষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, “২২ এপ্রিলে পেহেলগামে সংঘটিত জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।” পাশাপাশি নিহতদের পরিবার ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে সদস্যদেশগুলো।
এবছর ২২ এপ্রিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল৷ চীনে এসসিও সম্মেলনের দেশগুলো ওই হামলার আয়োজক, অর্থদাতা এবং মদতদাতাদের ন্যায়বিচারের মুখোমুখি করার কথা উল্লেখ করেছে ঘোষণাপত্রে।
সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশগুলো। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া বার্তা—‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়’ উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেশগুলো আহ্বান জানিয়েছে সীমান্ত অতিক্রমকারী সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যৌথভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।
কূটনৈতিকভাবে এটি ভারতের জন্য বড় সাফল্য বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, মাত্র দুমাস আগেই এসসিও’র যৌথ বিবৃতিতে পেহেলগাম হামলার উল্লেখ ছিল না। সেকারণে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিবৃতিতে সই করেননি।
ভারতের এই দৃঢ় অবস্থান এসসিও’র ভেতরে কূটনৈতিক ভারসাম্য নাড়িয়ে দেয়। ভারত স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে কোনও আপস করা হবে না।
ভারতের জিরো টলারেন্স নীতির প্রতিফলনই এই সিদ্ধান্ত। চীন বর্তমানে এসসিও’র সভাপতিত্বে থাকা দেশ। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে চীন প্রথমে পেহেলগাম হামলার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু তিয়ানজিন বৈঠকে সব সদস্য দেশের একযোগে সন্ত্রাসের নিন্দা পাকিস্তানের জন্য একটি কূটনৈতিক ধাক্কা বলেই মনে করা হচ্ছে।
তাছাড়া, তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় পেহেলগাম হামলার নিন্দায় ভারতের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। দুই মাস আগের অনড় অবস্থান আজকের এই কূটনৈতিক জয় এনে দিয়েছে বলেই মনে করছে ভারত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পদক্ষেপ কেবল পাকিস্তানকেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলকেও বার্তা দিয়েছে যে, ভারত সন্ত্রাস প্রশ্নে কোনওভাবেই নমনীয় অবস্থান নেবে না।
এসসিও সম্মেলনের যৌথ ঘোষণার আগে ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, “গত চার দশক ধরে সন্ত্রাসবাদে ভারতে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে। “সম্প্রতি পেহেলগামে সন্ত্রাসের ভয়ঙ্কর রূপ আমরা দেখলাম। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বন্ধু দেশগুলোকে, যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
“এ হামলা শুধু ভারতের আত্মায় আঘাত নয়, মানবতাবাদে বিশ্বাসী প্রতিটি দেশের জন্য এক খোলামেলা চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হল:—কিছু দেশ যে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে, তা কি গ্রহণযোগ্য?”
তিনি আরও বলেন, “নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিটি দেশের উন্নতির মূল শর্ত। সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ এ পথে বড় চ্যালেঞ্জ। এ লড়াই কোনো একটি দেশের জন্য নয়, মানবতার জন্য।
“তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক কণ্ঠে বলতে হবে—দ্বিমুখী নীতি চলবে না। সন্ত্রাসবাদের সব রূপকেই প্রতিরোধ করতে হবে। মানবতার প্রতি এটাই আমাদের দায়িত্ব।”
প্রধানমন্ত্রীর এ ভাষণই ছিল এসসিও’র তিয়ানজিন ঘোষণার মূল বাণী। তবে সরাসরি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়নি ঘোষণায়।
এর আগে তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ভারত, রাশিয়া ও চীনের নেতারা একসঙ্গে সৌহার্দ্যের বার্তা দেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হাসি, করমর্দন ও কোলাকুলি করতে দেখা গেছে।
এমন ছবি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নীতির মুখে এক শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা দিয়েছে বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
ভারতীয় পত্রিকা এনডিটিভি লিখেছে, বিশেষভাবে নজর কাড়ে মোদী ও পুতিনের হাত ধরে হাঁটা, পরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা।
তাদের স্বচ্ছন্দ দেহভঙ্গি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে—কোন আলোচনায় মগ্ন ছিলেন তিন নেতা? তবে বার্তাটি স্পষ্ট— যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ভারত-রাশিয়া-চীন সম্পর্ক দুর্বল করতে পারবে না।