Published : 11 Jun 2026, 08:36 AM
অপেক্ষার পালা প্রায় শেষ। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরু হতে চলেছে। বিশ্ব জুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনের নানা প্রশ্ন আর কৌতূহলের উত্তরও মিলতে শুরু করবে। এক মাসের বেশি সময় ধরে ফুটবল উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে থাকবে ভক্ত-সমর্থকরা।
লিওনেল মেসি কি আর্জেন্টিনাকে ২০২২ সালে কাতারে জেতা শিরোপা ধরে রাখতে পথ দেখাতে পারবেন? তার মতোই রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো পর্তুগালের হয়ে অধরা সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে পারবেন?
টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার লক্ষ্য স্থির করা তারকাখচিত অন্য দলগুলোরই বা কী হবে? স্পেন ও বিস্ময়-বালক লামিনে ইয়ামাল কি তাদের ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুটের সঙ্গে বিশ্বকাপও যোগ করতে পারবে? চার বছর আগের ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপের হ্যাটট্রিকের পরও রানার্সআপ হওয়া ফ্রান্স আবার শিরোপার মঞ্চে পা রাখবে? কিংবা ব্রাজিলের বহু কাঙ্ক্ষিত ‘হেক্সা মিশন’ সফল হবে? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষায় গোটা ফুটবল দুনিয়া।
তবে এসব তো শুধু মুদ্রার একটা পিঠ। অন্য পিঠে রয়েছে বিশ্বকাপ ঘিরে অনেক বিতর্ক। মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে বাইরের নানা বিতর্ক দানবীয় আকৃতির এই বিশ্বকাপটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত আসরগুলোর একটিতেও পরিণত করেছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা বিধিনিষেধ নিয়ে ক্ষোভ ও টিকেটের আকাশচুম্বী দাম বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ
এবারই প্রথম যৌথভাবে তিনটি দেশে হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ। প্রথমবার অংশ নেবে ৪৮টি দল, চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে ১৬টি বেশি। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত খেলা হবে ১৬টি শহরে- যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি, মেক্সিকোর তিনটি ও কানাডার দুটি। ম্যাচ হবে মোট ১০৪টি।
রেকর্ড ৩৯ দিন ধরে চলবে টুর্নামেন্ট। ২০২২ সালে কাতারে হয়েছিল ২৯ দিন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ৩২ দিন।
৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল ও তৃতীয় হওয়া সেরা আটটি দল নিয়ে হবে ‘রাউন্ড অব ৩২’ বা ৩২ দলের নকআউট পর্ব। এরপর যথারীতি শেষ ষোলো, কোয়ার্টার-ফাইনাল, সেমি-ফাইনাল ও ফাইনাল।

শুরু ও শেষ
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে মেক্সিকো।
আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল শেষে চূড়ান্ত হবে বিজয়ী।
নবাগত কারা
বিশ্বকাপে অভিষেক হচ্ছে চারটি দেশের- কেপ ভার্দ, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান।
সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে ৩৭ মাইল দূরে অবস্থিত কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা দেড় লাখের কিছু বেশি।
কুরাসাও ও আইসল্যান্ডের পর, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ কেপ ভার্দ। আফ্রিকার শক্তিশালী দল ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে বাছাইপর্বে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপের টিকেট নিশ্চিত করে ‘ব্লু শার্কস’ নামে পরিচিত দলটি। দেশটির জনসংখ্যা পাঁচ লাখ ২৫ হাজারের কম।
এশিয়া থেকে উজবেকিস্তান ও জর্ডান প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে।

ফেভারিট যারা
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন শক্ত ফেভারিটদের একটি। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের পথচলা ছিল প্রায় নিখুঁত। প্রথম পাঁচটি ম্যাচই জিতে, শেষটি ড্র করে, অপরাজিত থেকে বাছাই শেষ করে ২০১০ বিশ্বকাপ জয়ীরা।
পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, মিকেল মেরিনো, মার্তিন সুবিমেন্দি, ২০২৪ সালের ব্যালন দ’র জয়ী রদ্রি, বিশ্বের সেরা তরুণ প্রতিভাদের একজন লামিনে ইয়ামালের মতো খেলোয়াড় আছেন স্পেন দলে।
শিরোপা জয়ের জন্য এগিয়ে রাখা হচ্ছে ফ্রান্সকেও। ব্যালন দ’র জয়ী উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বার্কোলা, মাইকেল ওলিসে, কিলিয়ান এমবাপের মতো ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ আছে দিদিয়ে দেশমের দলে। ২০২২ বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলটি এবারের বাছাইপর্বে ছিল অপরাজিত।
গত দুটি ইউরোর রানার্সআপ ইংল্যান্ডও ফেভারিটদের একটি। টমাস টুখেলের দল বাছাইপর্বে কোনো গোল হজম না করে, আট ম্যাচের সবকটি জিতে ‘পারফেক্ট’ রেকর্ড নিয়ে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছে। জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের মতো বড় তারকা রয়েছে তাদের দলে। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে অবিশ্বাস্য এক মৌসুম কাটিয়ে এসেছেন কেইন।
বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বাছাইপর্বের শীর্ষে ছিল, দ্বিতীয় স্থানে থাকা একুয়েডরের চেয়ে ৯ পয়েন্ট বেশি নিয়ে।
মাত্র চার বছরে দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ ও ফিনালিসিমা জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। লিওনেল মেসির মতো মহাতারকাকে নিয়ে এবারও শক্তিশালী লিওনেল স্কালোনির দল।
বাছাইপর্বে হতাশাজনক পারফরম্যান্স (১৮ ম্যাচের ছয়টিতে হেরে পঞ্চম স্থান অর্জন) সত্ত্বেও ব্রাজিলকে কি ফেভারিটদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে? রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপার সবশেষটি তারা জিতেছে ২৪ বছর আগে, ২০০২ সালে। কার্লো আনচেলত্তির কোচিংয়ে দীর্ঘ সেই খরা কাটিয়ে উঠতেও মরিয়া সেলেসাওরা।
প্রতি বিশ্বকাপেই চমক দেখায় কিছু দল। ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে, গত আসরের সেমি-ফাইনালিস্ট মরক্কোরও অনেক দূর যাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন যত নিয়ম
২০২৬ বিশ্বকাপে বেশ কিছু নিয়ম পরিবর্তন করা হবে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো খেলার গতি কমিয়ে সময় নষ্ট করার কৌশল নির্মূল করা।
হাইড্রেশন ব্রেক (৩ মিনিট): ম্যাচের প্রতি অর্ধের মাঝে তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক পানি পানের একটি বিরতি থাকবে।
থ্রো-ইন কাউন্টডাউন (৫ সেকেন্ড): যদি কোনো খেলোয়াড় থ্রো-ইনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে খেলা পুনরায় শুরু করতে দেরি করেন, তাহলে থ্রো প্রতিপক্ষকে দেওয়া হবে।
গোল-কিক কাউন্টডাউন (৫ সেকেন্ড): গোলরক্ষকের ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করার চেষ্টার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে এবং তেমনটা হলে শাস্তিস্বরূপ প্রতিপক্ষকে কর্নার দেওয়া হবে।
মাঠের বাইরে চিকিৎসা (১ মিনিট): ফিজিওর চিকিৎসা নেওয়া খেলোয়াড়কে অবশ্যই এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হবে। তবে গোলরক্ষক বা যেসব খেলোয়াড় চোট পাওয়ায় প্রতিপক্ষ লাল কিংবা হলুদ কার্ড পাবে, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
মুখ ঢেকে রাখা: প্রতিপক্ষের সঙ্গে মুখোমুখি পরিস্থিতিতে কথা বলার সময় কোনো খেলোয়াড় মুখ ঢেকে রাখলে তাকে লাল কার্ড দেখানো হতে পারে।
কর্নার পর্যালোচনা: বিশ্বকাপে ভিএআরের (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। কর্নার সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করতে পারবে ভিএআর। তবে এটি অবশ্যই দ্রুত এবং খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার আগে করতে হবে। ভুলভাবে দেওয়া গোল-কিকের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।
দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পর্যালোচনা: দুটি হলুদ কার্ডের জন্য মাঠ থেকে বহিষ্কৃত খেলোয়াড়ের দ্বিতীয় হলুদ কার্ডটি পর্যালোচনা করা যাবে।
১০ সেকেন্ড বদলি: কোনো খেলোয়াড়কে বদলি করার সময় তিনি তার নিকটতম স্থান থেকে মাঠ ছাড়ার জন্য ১০ সেকেন্ড সময় পাবেন। এতে ব্যর্থ হলে খেলার পরবর্তী বিরতির আগ পর্যন্ত বদলি খেলোয়াড় অন্তত এক মিনিটের জন্য মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না, অর্থাৎ তার দলকে ১০ জন নিয়েই খেলা চালিয়ে যেতে হবে।

বিতর্কিত ও সমালোচিত অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম অংশগ্রহণকারী কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত আয়োজক দেশ!
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে গিয়ে খেলতে আপত্তি জানায় ইরান। তারপর থেকে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয় নানারকম বিভ্রান্তি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেইস ক্যাম্প মেক্সিকোয় সরিয়ে নেওয়াসহ অনেক টানাপোড়েনের মধ্যেই টানা চতুর্থ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে ইরান।
কঠোর ভিসা বিধিনিষেধে
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের ১০ দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পান ইরানের খেলোয়াড়রা। তবে গণমাধ্যমের খবর, দেশটির কয়েকজন ফুটবল কর্মকর্তা এখনও ভিসা পাননি।
ভিসা জটিলতায় পড়েছেন দর্শকরাও। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ভ্রমণ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী এক-চতুর্থাংশের বেশি দেশের সমর্থকরা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কঠোর বিধিনিষেধ অথবা উচ্চ হারে ভিসা প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
গত বছর ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। সেই দেশগুলোর একটি সোমালিয়ার রেফারি ওমার আব্দুলকাদির আর্তানকে বিশ্বকাপ শুরুর দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে তুমুল।
টিকেটের চড়া দাম
এই বিশ্বকাপে টিকেটের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে অনেক দিন ধরেই।
গত ডিসেম্বরে যখন গ্রুপ পর্বের ম্যাচের সবচেয়ে কম দামের টিকেট ১৪০ ডলার থেকে শুরু করে ফাইনালের জন্য ৮ হাজার ৬৮০ ডলার পর্যন্ত বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তখন এটিকে সমর্থকদের সঙ্গে ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করে সমর্থকদের সংগঠন ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই)। গত মার্চে টিকেটের অতিরিক্ত দাম নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে একটি মামলাও করে সংগঠনটি।
পরিবেশ দূষণ
পরিবেশগত প্রভাবের কারণেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এবারের বিশ্বকাপ। বিভিন্ন সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে যে, আয়োজক শহরগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ও অনেক বেশি বিমান ভ্রমণের কারণে এই টুর্নামেন্টে ৯০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হবে।
এই বিশ্বকাপে জলবায়ুগত ক্ষতির পরিমাণ গত বিশ্বকাপের দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।