Published : 19 Jul 2026, 12:13 AM
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বুধবার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় ইংল্যান্ডের; সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা।
কিন্তু ইংল্যান্ডের বিদায়ে দেশটিতে অনেকের মধ্যে তখন ভিন্ন এক অনুভূতির উদয় হতে থাকে। সেটা— ভয়।
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে বিবিসি লিখেছে, ইংল্যান্ডের যখন খেলা চলে, তখন দেশটিতে পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়। আর খেলায় হেরে গেলে সেই হার বেড়ে হয় ৩৮ শতাংশ।
বিবিসির খবরে বলা হয়, বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট চলার সময় ইংল্যান্ডের অনেক নারী ও কিশোরীকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হয়।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল দেখছিলেন পারিবারিক নির্যাতনবিরোধী দাতব্য সংস্থা—সোলেইসের কর্মী রেবেকা গোসহক।
তিনি বলেন, “আমরা জানি, তখন অনেক নারী আতঙ্কে থাকেন। তাদের সঙ্গী বাড়ি ফিরলে কী ধরনের পরিস্তিতি ঘটবে, মূলত সেটা ভেবে আতঙ্কে থাকেন তারা।”
“তাদের সঙ্গে চিৎকার-চেচামেচি করা হয়; অপমান করা হয়; নানা কটু কথাও শোনানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনও চলে।”
২০২৪ সালের ইউরো চলার সময় ৩০০ অভিযোগ
ফুটবল ম্যাচের পর নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতা ইংল্যান্ডে নতুন কোনো ঘটনা নয়।
ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিলের (এনপিসিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরো ফুটবল আসর চলাকালে এ ধরনের নির্যাতনের ৩০০টি অভিযোগ আসে।
ভুক্তভোগীরা মনে করেন, তাদের সঙ্গে অভিযুক্তরা কেমন আচরণ করবেন, তা ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করে।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে কত নারী এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেই পরিসংখ্যান এখনো সামনে আসেনি।
তবে গোসহকের মতে, নারীবিদ্বেষ কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের সামগ্রিক প্রবণতায় তেমন পরিবর্তন আসেনি।
একটি বড় ক্রীড়া আসর সবার জন্যই আনন্দ বয়ে আনার কথা। কিন্তু এসব নির্যাতনের ঘটনা একটা অন্ধকার হিসেবে হাজির হয়েছে।
গোসহক বলেন, সোলেইস মনে করে না যে, ফুটবলই এজন্য দায়ী। এই দায় তাদের, যারা নির্যাতন চালায়। আর নির্যাতন চালানো ব্যক্তিদের অধিকাংশই পুরুষ।
তিনি বলেন, “ম্যাচের সময় অতিরিক্ত মদ্যপানও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। এতে হার বা হতাশার অনুভূতি তীব্র হয় এবং তা অনেক ক্ষেত্রে আগ্রাসী আচরণে রূপ নেয়।”
সোলেইস মনে করে, এ ধরনের আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব।
গোসহক বলেন, “যেসব পুরুষ নিজেদের নির্যাতনমূলক আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য পরামর্শ নেওয়ার হেল্পলাইন রয়েছে।
“আর যেসব পুরুষ সহিংসতা চালান না, তাদের দায়িত্বটা হলো, পরিবার ও পরিচিত মহলে এ ধরনের আচরণকে নিরুৎসাহিত করা।”
‘বিশ্বকাপ নির্যাতনের অজুহাত হতে পারে না’
পারিবারিক নির্যাতনের বিচার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে সরকারি সংস্থা— ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস)।
তাদের হিসাবে, পারিবারিক নির্যাতন বিষয়ে সিপিএসে পুলিশের পাঠানো মামলার ৮০ শতাংশেই অভিযোগ গঠন করা হয়।
সিপিএসের কর্মকর্তা অলিভিয়া রোজ বলেন, তারা শুধু শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা নয়, মানসিক নির্যাতনের ঘটনা নিয়েও কাজ করেন।
“অনেক সময় মানসিক ব্ল্যাকমেইলও করা হয়। যেমন, সঙ্গী সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া।”
রোজ বলেন, “এ ধরনের আচরণ যে শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, আইনের দৃষ্টিতেও অপরাধ, সেই বার্তা বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
সিপিএস মনে করে, এ ক্ষেত্রে সমাজের অন্যদের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
এ কারণে বিশ্বকাপ বা বড় কোনো ক্রীড়া আসর চলাকালে আশপাশের কেউ ঝুঁকিতে আছেন কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোজ বলেন, “আমরা জানি, পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে অভিযোগ জানানো কতটা কঠিন। কিন্তু আপনি যদি সামনে আসেন, তাহলে আপনার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
“বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার উৎসব হওয়া উচিত। এটি কখনোই নির্যাতন বা সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না।”