০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

রেইনমেকার্স: কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি তৈরি, মেঘের রাজ্যে ড্রোনের রাজত্ব

কোম্পানিটির দাবি, তারা কেবল তিন ঘণ্টার মধ্যে আকাশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানি তৈরি করেছে।

রেইনমেকার্স: কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি তৈরি, মেঘের রাজ্যে ড্রোনের রাজত্ব

আবহাওয়া পরিবর্তনের এ ধারণা ৮০ বছরেরও বেশি পুরনো। ছবি: রেইনমেকার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Oct 2026, 11:47 AM

Updated : 09 Oct 2026, 11:47 AM

তীব্র পানি সংকট মোকাবেলায় বিশ্বজুড়ে ড্রোনের সাহায্যে মেঘে রাসায়নিক স্প্রে করে কৃত্রিম বৃষ্টি ঝরানোর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।

গত ২৩ অগাস্ট কুপার ফ্রিম্যানের বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না, তার মাথার ওপরের মেঘগুলোতে বৃষ্টি ঝরানোর জন্য রুপার তৈরি কোনো যৌগ বা ‘সিলভার কম্পাউন্ড’ মেশানো হচ্ছে।

আলাস্কার হোমার শহরের হাজার হাজার বাসিন্দা তখনও বিষয়টি জানতেন না। পরে তারা জানতে পারেন, স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ‘রেইনমেকার্স’ ক্লাউড-সিডিং বা কৃত্রিম উপায়ে মেঘে বৃষ্টি নামানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই অঞ্চলে একটি পরীক্ষা চালিয়েছে।

কোম্পানিটির দাবি, তারা কেবল তিন ঘণ্টার মধ্যে আকাশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানি তৈরি করেছে।

বিবিসি লিখেছে, আবহাওয়া পরিবর্তনের এ পদ্ধতিটি ৮০ বছরেরও বেশি পুরনো। এ প্রক্রিয়ায় প্লেন বা ড্রোনের সাহায্যে মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইডের মতো যৌগ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা বরফ স্ফটিক তৈরি করে।

নিচের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে এসব স্ফটিক পরবর্তীতে বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে মাটিতে ঝরে পড়ে। ক্লাউড-সিডিং মেঘের ভেতরে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করে।

এরপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সেসব স্ফটিককে টেনে মাটিতে নামিয়ে আনে। তবে এ প্রযুক্তির জন্য আলাস্কার মতো পাহাড়ি বা ঠান্ডা অঞ্চলের মতো অনুকূল জলবায়ু পরিবেশের প্রয়োজন হয়।

‘সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি’র আলাস্কা অঞ্চলের পরিচালক ফ্রিম্যান কেবল এ কারণেই উদ্বিগ্ন নন যে, হোমার শহরের বাসিন্দাদের এসব পরীক্ষা সম্পর্কে আগে থেকে জানানো হয়নি, বরং মেঘের মধ্যে ঠিক কী ছিটানো হয়েছে এবং তা স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশের জন্য কতটা নিরাপদ ছিল সে নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

“এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, এই সিলভার আয়োডাইড ব্যবহারে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব যাচাইয়ের জন্য পরে কোনো সমীক্ষা চালানো হয়েছিল।

“বাইরের কোনো কোম্পানিকে দিয়ে এই সিডিং করানোর মাধ্যমে আমাদের পানির সংকট দূর হবে না, বরং মনে হচ্ছে এটা পানি সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত জরুরি বিষয়গুলোর সমাধান থেকে আমাদের মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে।”

বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। জুলাইয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, “বিশ্বে সুপেয় পানি যে গতিতে রিসাইকেল হচ্ছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে সুপেয় পানি খরচ হচ্ছে।”

তার বক্তব্যটি এমন সব প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে, যেখানে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে নদীগুলোতে গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ খরা চলছে।

‘ক্লাউড-সিডিং’ প্রযুক্তি হয়ত সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো। কারণ এটা প্রলয়ংকরী কোনো বৃষ্টিঝড় তৈরি করতে পারে না। যেমন, রেইনমেকার্সের ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন পানি ২৫৯ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে কেবল প্রায় ০.০১ ইঞ্চি বৃষ্টির সমান।

এরপরও, বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ আবহাওয়া পরিবর্তনের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে ও একদল নতুন স্টার্টআপ কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি তৈরির নানা সিস্টেম তৈরি করছে।

উদ্ভাবনী ক্ষেত্রটি যতটুকুই উন্নত বা সম্ভাবনাময় হয়ে উঠুক না কেন, এসব কোম্পানি এখনও নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে নানা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ফলে মেঘে কোন উপাদানটি স্প্রে করা হবে ও কীভাবে হবে সে বিষয়ে তারা নিত্যনতুন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

রেইনমেকার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অগাস্টাস ডরিকো তার কোম্পানি সিলভার আয়োডাইড যৌগ কীভাবে ব্যবহার করে ও এর ফলাফল কী হতে পারে সে সম্পর্কে যে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে সবসময় প্রস্তুত। কারণ, আগেও তিনি রাসায়নিকের নিরাপত্তা নিয়ে বহুবার প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেছেন, রেইনমেকার্স প্রতি ফ্লাইটে কেবল ২০ গ্রাম এ ধরনের সিলভার ব্যবহার করে, যা হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাক জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। “ফলে মাটিতে যে পরিমাণ ঘনত্ব বাড়ে তা ‘পার্টস পার কোয়াড্রিলিয়ন’ পর্যায়ে থাকে, যা ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফডিএ-এর নির্ধারিত অনুমোদিত সীমার অনেক নিচে।”

ক্লাউড-সিডিং প্রক্রিয়ার মূল সীমাবদ্ধতাগুলোর একটির কথা উল্লেখ করে ডরিকো বলেছেন, রেইনমেকারের ড্রোনগুলো মেঘের ভেতর উড়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়, কারণ মেঘ না থাকলে ‘আমরা কিছুই করতে পারি না’।

কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি ঝরানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে মেঘ তৈরি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যাতে সেগুলোকে প্রলুব্ধ করে বৃষ্টি নামানো যায়।

তাদের ড্রোনগুলোতে সিলভার আয়োডাইডের ফ্লেয়ার বা বাতি লাগানো থাকে। এগুলো জ্বালানো হলে উৎপন্ন উত্তাপে পানির কণাগুলো এমন ক্ষুদ্র আকারে রূপান্তরিত হয় যে সেগুলো হিমায়িত মেঘের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে স্ফটিক ও বৃষ্টিতে পরিণত হয়।

রেইনমেকার্স বর্তমানে আইডাহো, ইউটাহ, কলোরাডোর মতো মার্কিন অঙ্গরাজ্য ও জর্ডানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ডরিকো বলেছেন, “পানির চরম সংকটের কারণে জর্ডানের বাসিন্দারা অনেক সময় সপ্তাহে কেবল কয়েক ঘণ্টা ইউটিলিটি বা পানি সরবরাহ পান। এ অঞ্চলের মানুষের সহায়তার চেষ্টা করাটা আমাদের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়।”

১৯৪৬ সালে ‘ক্লাউড-সিডিং’-এর সূচনা হয়েছিল। ওই সময় ‘জেনারেল ইলেকট্রিক রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র গবেষকরা প্রথম সিডিং এজেন্ট হিসেবে শুকনো বরফ ব্যবহার করেছিলেন।

এর এক বছর পর দেখা যায় শুকনো বরফ দ্রুত গ্যাস হয়ে উড়ে যাওয়ার চেয়ে সিলভার আয়োডাইড বেশি কার্যকর।

সিডিং এজেন্টগুলোর মাধ্যমে বৃষ্টিপাত কিছুটা বাড়লেও এগুলো সার্বিক পরিস্থিতিতে খুব একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা কতটা সীমিত ও অনিয়মিত হতে পারে হতাশাজনক কিছু পরিসংখ্যানও সে কথাই বলে।

‘ইউটাহ ক্লাউড সেন্টার’-এর সহকারী স্টেট জলবায়ুবিদ জন মেয়ার বলেছেন, “উপযুক্ত আবহাওয়া পেলে ক্লাউড-সিডিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব।”

ক্লাউড-সিডিং খাতের জন্য সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক ছিল ২০১৭ সালের একটি গবেষণা। ওই গবেষণায় রেডার ও রেইন গেজ ব্যবহার করে ক্লাউড-সিডিংয়ের কার্যকারিতা বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সিলভার আয়োডাইড ঠিক যেভাবে কাজ করার কথা সেভাবেই কাজ করছে।

গত কয়েক বছরে রেইনমেকার্সের মতো বিভিন্ন কোম্পানি এই পুরনো শিল্পে নতুনত্ব নিয়ে আসায় জন মেয়ার বেশ আশাবাদী।

“ড্রোন (যেমন রেইনমেকার্সের পণ্যগুলো) আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে এবং এটা কাঙ্ক্ষিত মেঘগুলোতে আরও নিখুঁত ও লক্ষ্যভিত্তিক সেবা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।”

মেঘে ঠিক কী স্প্রে করা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। স্যান ফ্রান্সিসকোর ‘রিসাস্ট সিস্টেমস’-এর প্রধান নির্বাহী অলিভিয়া লি বলেছেন, তারা মাটি থেকে সংগৃহীত অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি এক ধরনের প্রোটিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন।

‘টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি’তে এর পরীক্ষা এখনো চলমান থাকলেও এই নতুন সিডিং এজেন্টটি সিলভার আয়োডাইডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে।

অলিভিয়া লি বলেছেন, “এটা নিরাপদ, জৈবপ্রয়োগযোগ্য ও সিলভার আয়োডাইডের তুলনায় বেশি সক্ষমতার সঙ্গে বরফ স্ফটিক তৈরি করতে পারে।”

তার কোম্পানি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে মেঘে বৃষ্টি ঝরাতে সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করছে।

এই প্রযুক্তির অগ্রগতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে জন মেয়ার আশাবাদী।

“যেহেতু অনেক অঞ্চলই তীব্র পানির সংকটের মুখে পড়ছে ফলে এসব সেবার চাহিদা আরও বাড়বে এবং পানির ঘাটতি পূরণের উপায় খুঁজতে তারা এই প্রযুক্তির শরণাপন্ন হবে।”