ভিনগ্রহ থেকে বার্তা আসবে কখন? নতুন তথ্য দিলেন বিজ্ঞানীরা
মহাকাশের এ অংশ বেছে নেওয়ার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন ধারণার সাহায্য নিয়েছেন, যা এরইমধ্যে দূরবর্তী গ্রহ আবিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ভিনগ্রহের প্রাণীদের সন্ধান ও এরা কখন পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে তা বের করতে এক নতুন কৌশল আবিষ্কারের দাবি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
ভিনগ্রহের প্রাণ নিয়ে গবেষণাকারী অলাভজনক কোম্পানি ‘সেটি ইনস্টিটিউট’-এর বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় গেইম থিওরির ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে।
এর মাধ্যমে কেবল ভিনগ্রহবাসীরা কোন স্থান থেকে বার্তা পাঠাতে পারে তা নয়, বরং এরা কখন সেই বার্তা পাঠাতে পারে সেটাও অনুমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভিনগ্রহের বার্তা পেতে মহাকাশের সঠিক দিকে টেলিস্কোপ তাক করলেই হয় না, বার্তাটি মিস না করতে চাইলে সঠিক সময়েও কান পাততে হবে।
গেইম থিওরির ‘শেলিং পয়েন্ট’ বা ফোকাল পয়েন্ট ধারণার ওপর ভিত্তি করে এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এ তত্ত্ব অনুসারে, দুটি পক্ষ যোগাযোগ বা সমন্বয় করতে না পারলেও স্বাধীনভাবে একই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া দুজন মানুষ যদি যোগাযোগের বাইরে থাকেন, তবে তারা দুপুরের দিকে গ্র্যান্ড সেন্টার স্টেশনে দেখা করার কথা ভাবতে পারেন।
কারণ, অন্য পক্ষের সঙ্গে কথা না হলেও প্রত্যেকেরই স্বাধীনভাবে এই বিশেষ স্থান ও সময় বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এমন নির্দিষ্ট স্থান ও সময় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
এ জন্য তারা মহাকাশের নির্দিষ্ট অংশ, ‘অ্যান্টি-সোলার পয়েন্ট’ বা সূর্য-বিপরীত বিন্দু ওপর নজর দিয়েছেন, যা অন্য কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দারাও নিজেদের মতো করে বেছে নিতে পারে।
এই নতুন গবেষণায় এখন পর্যন্ত ভিনগ্রহের কোনো সংকেত পাওয়া না গেলেও একে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এটা মহাকাশের ওই নির্দিষ্ট অংশে পরিচালিত প্রথম পর্যবেক্ষণমূলক অনুসন্ধান তো বটেই, পাশাপাশি ভিনগ্রহীদের খোঁজার এমন নতুন পদ্ধতির সূচনা করেছে, যা একদিন এ ধরনের সিগনাল খুঁজে পেতেও সাহায্য করতে পারে।
মহাকাশের এ অংশটি বেছে নেওয়ার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন ধারণার সাহায্য নিয়েছেন, যা এরইমধ্যে দূরবর্তী গ্রহ আবিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কোনো গ্রহ যখন এর তারার সামনে দিয়ে পেরোয় তখন তাকে ‘ট্রানজিট’ বলে। এ প্রক্রিয়ায় তারার আলো সামান্য ম্লান হয়, যা কেবল গ্রহটির অস্তিত্বই প্রমাণ করে না বরং এর কক্ষপথ ও তারার সাপেক্ষে এর অবস্থান বুঝতেও সাহায্য করে।
পৃথিবী নিয়ে একই ধরনের গবেষণা চালানো কোনো ভিনগ্রহের কাছে পৃথিবী ওদের ও আমাদের সূর্যের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করবে। পৃথিবী থেকে দেখলে সেই গ্রহটিকে সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকে দেখা যাবে, যাকে বলে ‘অ্যান্টি-সোলার পয়েন্ট’ বা সূর্য-বিপরীত বিন্দু।
এর মানে, আমাদের নিজেদের ও কোনো তাত্ত্বিক ভিনগ্রহের সভ্যতা উভয় পক্ষই কোনো ধরনের যোগাযোগ ছাড়াই মহাকাশের নির্দিষ্ট অংশ বেছে নিতে পারে ও প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে সেই অ্যালাইনমেন্ট বা বিন্যাসটি বুঝতে পারবে।
আগে থেকে কোনো বার্তা আদান-প্রদান করা ছাড়াই যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটা কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো ভিনগ্রহীর এ পয়েন্টটি বেছে নেবেই বা তারা তা করছে এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তবে মহাকাশে ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান করার উপায় নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দিচ্ছে এই গবেষণা।
‘সেটি ইনস্টিটিউট’-এর গবেষণা বিজ্ঞানী ও এ গবেষণাপত্রের সহ-লেখক সোফিয়া শেখ বলেছেন, “সেটির ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ কেবল টেলিস্কোপ কোথায় তাক করতে হবে তা নির্ধারণ করা নয়।
“বরং অন্য কোনো সভ্যতা বার্তা পাঠানোর জন্য কোন স্থান ও সময়টি বেছে নিতে পারে তা খুঁজে বের করা। অ্যান্টি-সোলার পয়েন্ট আমাদের কেবল একজন প্রাপক হিসেবে নয়, বরং একজন সম্ভাব্য প্রেরকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ করে দিয়েছে।”
সেটি’র অনুসন্ধানে বিশেষভাবে কোনো তারা বা এর আশপাশের গ্রহমণ্ডলীকে বেছে নেওয়া হয়। তবে নতুন গবেষণাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ না করে বরং এমন অ্যালাইনমেন্ট বা বিন্যাসের ওপর নজর দেওয়া হয়েছে, যা দূরবর্তী ওই গ্রহের বাসিন্দারাও হিসাব করে বের করতে পারে।
গবেষকরা এরইমধ্যে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার ‘হ্যাচ ক্রিক রেডিও অবজারভেটরি’তে অবস্থিত ‘সেটি ইনস্টিটিউট’-এর ‘অ্যালেন টেলিস্কোপ অ্যারে’ ব্যবহার করে এই তত্ত্বটি পরীক্ষা করেছেন।
তারা প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন রাত এই পর্যবেক্ষণ চালানোর পরিকল্পনা করেছেন, যার মাধ্যমে চার বছরে পৃথিবীর কক্ষপথের সব গুরুত্বপূর্ণ অংশ কভার করা সম্ভব হবে বলে দাবি তাদের।
এ থেকে বিপুল পরিমাণ ডেটা পাওয়া যাবে, যার মধ্য থেকে কাজের সিগনাল খুঁজে বের করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন। ফলে তারা স্বয়ংক্রিয় এক পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা ডেটার মধ্য থেকে সম্ভাব্য ভিনগ্রহের প্রযুক্তির নিদর্শন খুঁজে বের করতে ও পৃথিবীর নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার রেডিও ইন্টারফারেন্সের মতো বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলোকে ফিল্টার করে বাদ দিতে পারে।
বড় এই অভিযান শুরুর আগে গবেষণা দলটি ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে পদ্ধতিটি কাজ করে কি না তা দেখার জন্য তিন রাতের একটি পাইলট সার্ভে পরিচালনা করে।
১৭ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে তারা ৩২ টেরাবাইট ডেটা সংগ্রহ করেন, যার ফলে প্রায় ১৯ লাখ ডিটেকশন বা সিগনাল ধরা পড়েছে। তবে সেগুলোর সবই মানুষের তৈরি বিভিন্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এ ফলাফল হতাশাজনক হলেও তা গবেষকদের মানুষের তৈরি সিগনাল ফিল্টার করে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ও নির্দিষ্ট দিকে সিগনাল খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
একটি সিগনাল মহাকাশ পাড়ি দিয়ে কতদূর থেকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে তা-ও তারা হিসাব করে বের করেছেন।
তাদের ধারণা, ভিনগ্রহীদের কাছে বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরেসিবো’ রেডারটির মতো শক্তিশালী ট্রান্সমিটার থাকে, তবে ১২৪ আলোকবর্ষ দূর থেকেও এদের বার্তা শোনা যাবে।
‘এ লার্জ-স্কেল টেকনোসিগনেচার সার্ভে অফ দ্য অ্যান্টি-সোলার পয়েন্ট উইথ দ্য অ্যালেন টেলিস্কোপ অ্যারে: সার্ভে ডিজাইন অ্যান্ড পাইলট রেজাল্টস’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল’-এ।
