এআই বিনিয়োগে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩%, বড় সুফল এশিয়ায়: আইএমএফ
এআই প্রযুক্তিকে একটি ‘ধীরগতির সুনামির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামোতে জোরালো বিনিয়োগ বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সাহায্য করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ।
রয়টার্স লিখেছে, এ প্রবৃদ্ধির ফলে থাইল্যান্ডের মতো যে সকল এশীয় দেশ প্রযুক্তি খাতের হার্ডওয়্যার সরবরাহ করে, তারা এর মাধ্যমে বড় ধরনের সুফল পাচ্ছে।
সোমবার এই তথ্য জানিয়েছেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
তিনি বলেছেন, এআই খাতে বিনিয়োগের এই জোয়ার এরইমধ্যে ‘চাহিদার ধাক্কা ও বিনিয়োগের ধাক্কা’ তৈরি করেছে। ফলে এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এআই প্রযুক্তির অনিবার্য বাস্তবতার কথা তুলে ধরে জর্জিয়েভা বলেছেন, “এআই পছন্দ করুন আর নাই করুন, এটা কিন্তু চলে এসেছে।”
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের উদ্বোধনী দিনে শত শত অংশগ্রহণকারীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, “জ্বালানি সরবরাহে সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যখন পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে তখনই উচ্চগতির এ পরিবর্তনই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে।”
জুলাইয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল আইএমএফ। সংস্থাটি মঙ্গলবারে তাদের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।
আইএমএফের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাসহ প্রায় ১৮ হাজার ব্যক্তি এ সপ্তাহের এই বৈঠকে অংশ নেবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ও স্পেনের অর্থমন্ত্রী আরকাদি এস্পানিয়াসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী নিজ দেশের ঘরোয়া ও অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন না।
এআই পাল্টে দেবে কাজের ভবিষ্যৎ
এআই প্রযুক্তিকে একটি ‘ধীরগতির সুনামির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন জর্জিয়েভা।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, শ্রমবাজার থেকে পুঁজিভিত্তিক অর্থব্যবস্থার দিকে যে রূপান্তর ঘটছে তা কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও রাজস্ব সংগ্রহের কাঠামোর ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
জর্জিয়েভা বলেছেন, আইএমএফের অনুমান অনুসারে এআই প্রযুক্তির প্রভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরির ধরন বদলে যাবে, মান কমে যাবে বা পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এরইমধ্যে ১০ শতাংশ চাকরির জন্য এআই দক্ষতার প্রয়োজন হচ্ছে। একদিকে যেমন বাঁধাধরা কাজগুলোর পরিধি কমছে, অন্যদিকে নির্মাণ খাত ও ডেটা সেন্টারের মতো কম মজুরিনির্ভর খাতে নিম্ন আয়ের কাজের সুযোগ বাড়ছে।
এই প্রযুক্তির রূপান্তরকারী ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে আইএমএফ প্রধান বলেছেন, “এআই এমন এক রূপান্তরকারী প্রযুক্তি, যা আমরা কীভাবে কাজ করি ও কীভাবে বাঁচি তার পুরোটাই আমূল বদলে দেয়।”
তার নিজস্ব দৈনন্দিন সময়সূচি নির্ধারণে এখন একটি এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ডিজিটাল সহকারী নিয়মিত ৩০ সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠায় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় উৎপাদক হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে এশিয়ার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব দিচ্ছে, বিশেষ করে এ বছরের বার্ষিক বৈঠকের স্বাগতিক দেশ থাইল্যান্ডের ভূমিকার কথা বলেছেন জর্জিয়েভা।
নবীনদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্বব্যাংক ও সিঙ্গাপুর
একই অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ বলেছেন, তার সংস্থা এআইয়ের এই জোয়ারকে কীভাবে টেকসই উপায়ে কাজে লাগানো যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে।
‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএমের ওপর নির্ভর না করে ‘স্মল এআই’ বা ক্ষুদ্র এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কৃষক, স্বাস্থ্যসেবা খাত ও শিক্ষা খাতের উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অজয় বঙ্গ নিজের মেয়াদে কর্মসংস্থান তৈরিকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এদিকে, আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারাতনাম নতুন স্নাতকদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন, সরকারকে এখনই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।
“আমাদের খুব দ্রুত নির্দিষ্ট এক সমস্যার সমাধান করতে হবে... সেটি হচ্ছে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের যে প্রথম ধাপ বা প্রথম চাকরি, সেখানেই এখন চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।”
উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর মধ্যে এআই প্রযুক্তি যাতে বৈষম্যের নতুন দেওয়াল তুলে দিতে না পারে সে বিষয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট।
“আমরা যদি নিষ্ক্রিয় বসে থাকি তবে এআই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে দেবে। ফলে এআইয়ের মধ্যেও মানুষ যাতে নিজস্ব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ভালো চাকরি পায় ও ক্যারিয়ারের উঁচুতে উঠতে পারে, আমাদের প্রথম থেকেই সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
