Published : 12 Sep 2025, 05:15 PM
শিশুর কান্না শুনে মানুষের দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষকরা বলছেন, কাঁদতে থাকা কোনো অসহায় শিশুর কান্না পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই দ্রুত এক ধরনের আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া বা সাড়া তৈরি করে, যা মানবদেহের তাপমাত্রা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় তাপমাত্রা নির্ণায়ক যন্ত্র ‘থার্মাল ইমেজিং’-এর মাধ্যমে দেখা গিয়েছে, মানুষকে যখন শিশুর কান্নার রেকর্ড শোনানো হলে তাদের মুখের রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে তাদের ত্বকের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যখন বেশি কষ্টে থাকে, তখন তাদের কান্না আরও উচ্চকণ্ঠ ও বেসুরো শোনায়। কারণ সেই সময়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে এবং আরও তীব্রভাবে কাজ করে। এতে বোঝা যায়, শিশুর কান্নায় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যা ব্যথা পেলে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেই কান্নার শব্দে সাড়া দেন।
ফ্রান্সের ‘ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট-এটিয়েন’-এর অধ্যাপক নিকোলা ম্যাথেভঁ বলেছেন, “শিশুর কান্নার প্রতি আমাদের আবেগগত সাড়াদানের বিষয়টি নির্ভর করে এদের কান্নার ‘অ্যাকিউস্টিক রাফনেস’ বা শব্দের খসখসে ভাবের ওপর, যা আমাদের মনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব শব্দে শিশুর কষ্ট বা ব্যথার মাত্রা বোঝা যায়, আর আমরা সেই কষ্ট বুঝে খুব দ্রুত আবেগী বা সংবেদনশীল হয়ে পড়ি।”
প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে শিশু এমন ধরনের কান্না পেয়েছে, যা মানুষের পক্ষে সহজে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ এদের সব ধরনের প্রয়োজনীয় যত্ন পেতে হয়। তবে সব শিশুর কান্না একরকম নয়। যখন কোনো শিশু সত্যিই কষ্টে থাকে তখন এরা জোরে জোরে নিজেদের পাঁজরের খাঁচা সংকুচিত করে ফেলে। এতে বায়ুর চাপ বেড়ে যায় ও এদের কণ্ঠস্বরের তারে বিশৃঙ্খল কম্পন তৈরি হয়। ফলে ‘অ্যাকিউস্টিক রাফনেস’ বা প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘ননলিনিয়ার ফেনোমেনা’ বা এনএলপি অর্থাৎ বেসুরো ও বিশৃঙ্খল শব্দ হয়।
পুরুষ ও নারী কীভাবে শিশুর কান্নার প্রতি সাড়া দেন তা এ গবেষণায় খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। এজন্য গবেষণায় এমন অংশগ্রহণকারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে যাদের শিশু দেখাশোনায় খুব কম বা কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। তাদের শিশুর কান্নার রেকর্ডিং শোনান গবেষকরা।
এ রেকর্ডিং শোনার সময় অংশগ্রহণকারীদের মুখের তাপমাত্রার ছোট ছোট পরিবর্তন ধরতে থার্মাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন তারা। এ ক্যামেরায় তাদের মুখের তাপমাত্রার সূক্ষ্ম বিভিন্ন পরিবর্তন ধরা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান।
বয়স্করা চারটি সেশনে মোট ১৬টি ভিন্ন ধরনের শিশুর কান্নার রেকর্ড শুনেছেন এবং প্রতিটি কান্নার ওপর নির্ভর করে তারা বিচার করেছেন শিশুটি কি কেবল অস্বস্তিতে রয়েছে, না কি গুরুতর ব্যথায় কাঁদছে।
গবেষকরা বিভিন্ন মাত্রায় কষ্টে থাকার সময় শিশুর কান্নার এসব রেকর্ড করেছেন। যেমন– এদের স্নানের সময় অস্বস্তি থেকে শুরু করে টিকাদানের সময় সুইয়ের ব্যথা পর্যন্ত রেকর্ড করেছেন তারা।
থার্মাল ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গিয়েছে, পুরুষ ও নারীরা শিশুর কান্নার প্রতি প্রায় একই রকম সাড়া দিয়েছেন। শিশুদের যেসব কান্নায় সবচেয়ে বেশি ননলিনিয়ার ফেনোমেনা রয়েছে অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল ও বেসুরো শব্দ, সেগুলো এদের কান্নার অন্যান্য স্বরের থেকে আলাদা। এসব কান্নাকেই শিশুর সত্যিকারের ব্যথার সংকেত হিসেবে ধরে নিয়েছেন গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা, যা তাদের মুখের তাপমাত্রায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ দ্যা রয়্যাল সোসাইটি ইন্টারফেইস’-এ।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শিশুর কান্নায় থাকা ননলিনিয়ার ফেনোমেনা পুরুষ ও নারীদের মধ্যে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করে। মানুষ শব্দের এসব বৈশিষ্ট্য থেকে সহজেই বুঝতে পারে কোন শিশুটি কেবল অস্বস্তিতে ও কে সত্যিকারের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে।
গবেষক ম্যাথেভঁ বলেছেন, “যত বেশি ব্যথা কান্নায় প্রকাশ পায়, আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের স্বয়ংক্রিয় সাড়া দেওয়ার বিষয়টি ততই জোরালো হয়ে ওঠে, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, আমরা কান্নায় লুকানো ব্যথার বিষয়টিকে আবেগ দিয়ে অনুভব করি।
“এর আগে কখনো আমরা এত স্পষ্টভাবে কান্নার প্রতি আমাদের সাড়া দেওয়ার বিষয়টি মাপিনি। তবে এখনও বলা কঠিন, ভবিষ্যতে আমাদের বাস্তব জীবনে এ বিষয়টিকে কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।”
গবেষণাটি গত মাসে ডেনমার্কের গবেষকদের একটি কাজের পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, শিশুদের কান্নায় পুরুষদের চেয়ে সহজে ঘুম থেকে জাগেন নারীরা– এ ধারণাটি ঠিক নয়।
ওই গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মায়েদের ঘুম থেকে উঠে শিশুর যত্ন নেওয়ার সম্ভাবনা তিনগুণ হলে পুরুষেরাও নারীদের মতোই শিশুর কান্নায় ঘুম থেকে জাগার সম্ভাবনা রাখেন।