Published : 04 Sep 2025, 04:14 PM
এখন কেবল ক্রিপ্টো টোকেন তৈরি করেই থেমে নেই, বরং মাইনিং বা নতুন ক্রিপ্টো কয়েন তৈরিসহ আরও নানা দিকেও পা বাড়াচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিবার।
প্রথমবারের মতো বাজারে এল ‘ডব্লিউএলএফআই’ নামের টোকেন, যা ট্রাম্পের দুই ছেলের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ক্রিপ্টো ব্যবসার অংশ। টোকেনের বাজারে আগমন ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো দুনিয়ায় বাড়তে থাকা আগ্রহকে সবার নজরে এনেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বর্তমানে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রিপ্টোমুদ্রা। তবে সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প নিজেই যেখানে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী বানাতে’ চান, সেখানে তার পরিবার এখন এ খাতে ব্যবসা করছে, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে।
তবে উল্টো সুরে কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ কাজে কোনো ধরনের ভুল বা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের শত কোটি ডলারের রিয়াল এস্টেট, গলফ, মিডিয়া ও অন্যান্য ব্যবসা এমন এক ট্রাস্টের আওতায় রয়েছে, যা তার সন্তানরা পরিচালনা করছে। ফলে এখানে ট্রাম্প সরাসরি জড়িয়ে নন।
নৈতিক আচরণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের নিয়ম কার্যকর করা কঠিন। কারণ, তিনি সরকারের এতগুলো বিষয় তদারকি করেন যে, তার বিরুদ্ধে এসব আইন কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয়। এ সিস্টেম নির্ভর করে প্রেসিডেন্টের সৎ ইচ্ছার ওপর, দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেমন বলেছিলেন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দেশের স্বার্থকে আলাদা রাখার চেষ্টা করবেন তিনি।
এখন পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পে যে যে মূল উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাম্প পরিবার, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে–
ট্রাম্প মিডিয়া
‘ট্রুথ সোশাল’-এর মালিক ‘ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ’ মে মাসে বলেছিল, বিটকয়েন কেনার জন্য শেয়ার ও বন্ড বিক্রি করে আড়াইশ কোটি ডলার জোগাড় করেছে তারা। কোম্পানিটির সিইও ডেভিন নুনেস বলেছেন, বিটকয়েন হচ্ছে ‘আর্থিক দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় স্বাধীনতার প্রতীক’।
ট্রাম্পের কোম্পানিটি পরিকল্পনা করছে বিটকয়েন কিনে তা নিজেদের সম্পদ হিসেবে জমা করে রাখতে, যেমনটি অনেক আগে থেকেই মাইকেল সেলর নিজের কোম্পানিতে করে আসছেন। তার এ কৌশলটি অনেক দিন ধরেই জনপ্রিয়।
ট্রাম্প মিডিয়ার মোট শেয়ারের মধ্যে ৪১ শতাংশ মালিকানা ট্রাম্পের ছেলে ডনাল্ড জুনিয়রের নামে একটি ট্রাস্টে রাখা হয়েছে। কোম্পানির জমা দেওয়া নথি অনুসারে, শুক্রবার বাজার বন্ধ হওয়ার সময় এসব শেয়ারের মূল্য ছিল দুইশো কোটি ডলার।
ট্রাম্প মিডিয়া গ্রুপ ক্রো স্ট্র্যাটেজি
নতুন উদ্যোগ শুরু করতে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত কোম্পানি বা এসপিএসি’র সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে ট্রাম্প মিডিয়া ও ‘ক্রিপ্টোডটকম’, যার নাম ‘ট্রাম্প মিডিয়া গ্রুপ ক্রো স্ট্র্যাটেজি’। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, ‘ক্রিপ্টোডটকম’-এর নিজস্ব ক্রিপ্টো টোকেন ‘ক্রো’কে নিজেদের ব্যালেন্স শিটে জমা বা সম্পদ হিসেবে ধরে রাখা।
নতুন কোম্পানির জন্য প্রত্যাশিত তহবিলের মধ্যে রয়েছে ছয়শ ৩০ কোটি ক্রো টোকেন, ২০ কোটি ডলার নগদ অর্থ, ২২ কোটি ডলারের ওয়ারেন্টস বা বিনিয়োগ পত্র এবং পাঁচশ কোটি ডলারের ‘ইকুইটি লাইন অফ ক্রেডিট’ বা ঋণ সুবিধা। আর এ ঋণ সুবিধা দেবে ‘ইয়র্কভিল’ নামের এক বিনিয়োগ কোম্পানি, যারা এসপিএসি-এরও পৃষ্ঠপোষক।
ইয়র্কভিল, ট্রাম্প মিডিয়া ও ক্রিপ্টোডটকম এ তিনটি কোম্পানি মিলিয়ে নতুন কোম্পানি ‘ট্রাম্প মিডিয়া গ্রুপ ক্রো স্ট্র্যাটেজি’-এর অধিকাংশ শেয়ার বা মালিকানা ধরে রাখবে।
কয়েনগেকোর তথ্য অনুসারে, বুধবার পর্যন্ত ক্রো টোকেনের বাজার মূল্য ছিল আটশ ৭০ কোটি ডলার।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল
‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ কোম্পানিটিকে নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে জড়িত ‘ডিটি মার্কস ডিএফআই এলএলসি’ নামের একটি কোম্পানি, যেটি প্রায় ৩৮ শতাংশ মালিকানা ধরে রেখেছে কোম্পানিটির। তাদের ওয়েবসাইট অনুসারে, রাজস্বের সিংহভাগ পাওয়ার অধিকারও রাখে তারা।
এ ছাড়াও আরও দুই হাজার দুইশো ৫০ কোটি ‘ডব্লিউএলএফআই’ টোকেন ধরে রেখেছে ‘ডিটি মার্কস ডিএফআই এলএলসি’, যা তৈরি করেছে ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’। সোমবার বাজারে আসার পর থেকে এসব টোকেন ২১ শতাংশ পতন হয়েছে।
কয়েনগেকোর-এর তথ্য অনুসারে, বুধবারের শেষ অবস্থায় এসব টোকেনের মূল্য ছিল ছয়শ ৭০ কোটি ডলার।
চুক্তি অনুসারে, ট্রাম্পের সঙ্গে জড়িত এ কোম্পানিটি এসব টোকেন বিক্রি থেকে আসা অর্থের ৭৫ শতাংশ পাবে। তবে এর আগে কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ ও রিজার্ভ হিসেবে আলাদা রাখতে হবে।
রয়টার্সের হিসাব অনুসারে, ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ প্ল্যাটফর্ম চালুর পর থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় করেছে ট্রাম্প পরিবার। কোম্পানির শর্তাবলী, ক্রিপ্টো বিশ্লেষক বিভিন্ন কোম্পানি যে লেনদেন করেছে এবং প্রকাশ্যে দেওয়া চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এ হিসাব করেছে রয়টার্স।

‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ নিজেদেরকে ‘ডিসেন্ট্রালাইজড ফাইন্যান্স’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে প্লাটফর্মটির ওয়েবসাইটে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাম রয়েছে প্রেসিডেন্টের ছেলে এরিক, ডোনাল্ড জুনিয়র ও ব্যারনের।
কয়েনগেকোর-এর তথ্য অনুসারে, ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ এমন এক স্টেবলকয়েনও তৈরি করেছে, যার দাম এক মার্কিন ডলারের সমান এবং এর মোট বাজার মূল্য প্রায় আড়াইশ কোটি ডলার।
মিমকয়েনস
জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের আগে ‘ট্রাম্প’ ও ‘মেলানিয়া’ নামের দুটি মিমকয়েন চালু করেন ট্রাম্প ও তার স্ত্রী। ওই সময় এ মিমকয়েন মানুষ দলে দলে কিনতে শুরু করেছিলেন। তবে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনাও হয়েছিল।
মিমকয়েন এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা, যার মূল্য প্রযুক্তিগত কাজ বা ভিত্তির ওপর নয়, বরং ইন্টারনেটে আলোচনার পরিমাণ বা সংস্কৃতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক তার ওপর নির্ভর করে। এসব কয়েনের দাম খুব দ্রুত ওঠানামা করে। ফলে বড় মুনাফার পাশাপাশি ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে।
কয়েনগেকো বলছে, ট্রাম্প ও মিমকয়েনের বাজারমূল্য এখন কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে একশ ৭০ কোটি ডলার ও ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারে। অথচ মিমকয়েন দুটি চালুর কিছুদিন পরেই এদের মূল্য ছিল নয়শ কোটি ও একশ ৬০ কোটি ডলার।
ট্রাম্পের মিমকয়েন সবচেয়ে বেশি পরিমাণে যারা কিনেছিলেন মে মাসে এমন দুইশো ২০ জন বিনিয়োগকারীকে নিজের ব্যক্তিগত কান্ট্রি ক্লাবে এক বিশেষ নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট।
এনএফটি
২০২২ সালে এনএফটি বাজারে প্রবেশ করেন ট্রাম্প। ওই সময় বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু করেছিলেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ডিজিটাল ট্রেডিং কার্ড ও নিজের নামে কিছু পণ্য চালুর মতো বিষয়, যেগুলো মানুষ চাইলে সংগ্রহ করতে পারবে।
এনএফটির পূর্ণ রূপ হচ্ছে ‘নন-ফাঞ্জিবল টোকেন’। এটি এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যার দ্বিতীয়টি নেই। এগুলো সাধারণত ইন্টারনেটে বিক্রি ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে মালিকানা নিশ্চিত করা হয়।
এ বছরের জুনে নিজের এনএফটি ও ডিজিটাল ট্রেডিং কার্ড থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন ট্রাম্প। এদিকে, নিজের এনএফটি সংগ্রহ থেকে প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার সাতশ ডলার লাইসেন্স ফি পেয়েছেন মেলানিয়া ট্রাম্প।
আমেরিকান বিটকয়েন
ট্রাম্পের দুই পুত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি নতুন বিটকয়েন মাইনিং কোম্পানি ‘আমেরিকান বিটকয়েন’ এ মাসে ‘গ্রিফন ডিজিটাল মাইনিং’-এর সঙ্গে শেয়ার বিনিময়ের মাধ্যমে ‘নাসডাক’ স্টকে তালিকাভুক্ত হবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
এরিক ও তার ভাই ডনাল্ড জুনিয়র এবং ক্রিপ্টো মাইনিং কোম্পানি ‘হাট ৮’ একসঙ্গে মিলে নতুন এই কোম্পানির ৯৮ শতাংশ মালিকানা রাখবেন।
এ বছরের মার্চে ‘আমেরিকান বিটকয়েন’ চালু করে ‘হাট ৮’। ওই সময় মাইনিং কোম্পানিটি ঘোষণা করেছিল, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও কার্যকর বিটকয়েন মাইনিং কোম্পানি’ হবে তারা।
ক্রিপ্টো ইটিএফএস
ইয়র্কভিলের সঙ্গে মিলিয়ে কম করে হলেও তিনটি ‘এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড’ বা ইটিএফএস চালুর পরিকল্পনা করেছে ট্রাম্প মিডিয়া। যার মধ্যে একটি কেবল বিটকয়েনের ওপর, আরেকটি বিটকয়েন ও ইথেরিয়াম নিয়ে এবং তৃতীয়টি বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, সোলানা, এক্সআরপি ও ক্রো-কে একসঙ্গে কভার করবে।
ডমিনারি হোল্ডিংস
এলএসইজি-এর তথ্য অনুসারে, এরিক ও ডনাল্ড জুনিয়র দুজনেরই ক্রিপ্টো ট্রেজারি কোম্পানি ‘ডমিনারি হোল্ডিংস’-এ প্রায় ছয় দশমিক তিন শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধের সময় তাদের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল ৬০ লাখ ডলার।