Published : 11 May 2026, 03:21 PM
গত ৫০ বছর ধরে মার্কিন বিমান বাহিনীর প্রধান শক্তি হয়ে আছে এফ-১৫ ঈগল যুদ্ধবিমান। এক সময় ‘এফ-১৫এন সি ঈগল’ তৈরির জোরালো পরিকল্পনা থাকলেও কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং ওজনের সমস্যার কারণে তা শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি।
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ‘এফ-১৫ ঈগল’ প্রথম আকাশে ওড়ার সময় থেকেই মার্কিন বিমান বাহিনীর পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে ছিল। পঞ্চম প্রজন্মের অতি-আধুনিক ‘এফ-৩৫ লাইটনিং টু’ আসার পরেও এর গুরুত্ব কমেনি- লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
বর্তমানে ৫০ বছরেরও বেশি পুরানো হয়ে যাওয়ায় এফ-১৫ জেটের অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। বরং মার্কিন বিমান বাহিনীর কাছে এর গুরুত্ব এতই বেশি যে, অন্তত ২০৪০-এর দশক পর্যন্ত সেবা দিয়ে যাবে ‘এফ-১৫ ঈগল’।
এখান থেকেই মজার প্রশ্ন সামনে আসে। ‘এফ-১৫ ঈগল’ যদি বিমান বাহিনীর জন্য এতই সফল যুদ্ধবিমান হয়ে থাকে তবে নৌবাহিনী কেন তা ব্যবহার করল না? কেন তাদের বিমানবাহী রণতরীগুলোতে এর দেখা মিলল না?
এমন প্রশ্ন মোটেও অসম্ভব কোনো চিন্তা নয়। একসময় মার্কিন রণতরীগুলোতে ‘এফ-১৫এন সি ঈগল’ বা সি ঈগল ওড়ানোর বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত নৌবাহিনী ১৯৭০-এর দশকেরই অন্য এক যুদ্ধবিমানকে বেছে নিয়েছিল, যা ছিল ‘এফ-১৪ টমক্যাট’। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এ ফাইটারই ছিল নৌ-এভিয়েশনের মূল ভিত্তি।
আপাতদৃষ্টিতে এফ-১৫ ইগলের বদলে টমক্যাটকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ গ্রুম্যানের তৈরি এফ-১৪ টমক্যাটের তুলনায় ‘এফ-১৫ ঈগল’ ছিল বেশ সাশ্রয়ী।
তবে এফ-১৫-কে সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে অপারেশনের উপযোগী করা কেবল এক ‘অ্যারেস্টর হুক’ বা রণতরীতে ল্যান্ড করার হুক লাগিয়ে দেওয়ার মতো সহজ কাজ নয়, বরং নৌবাহিনীর উপযোগী করতে গেলে প্লেনটির কাঠামোতে যে ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তাতে এর ওজন অনেক বেড়ে যেত। সেই অতিরিক্ত ওজনের কারণে টমক্যাটের মতো আর অতটা কার্যকর বা আকর্ষণীয় থাকত না ‘এফ-১৫ ঈগল’।
কেন ‘সি ঈগল’ প্রকল্প সফল হল না?
১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে ম্যাকডোনেল ডগলাস কোম্পানি সক্রিয়ভাবে এফ-১৫ জেটের এক নৌ-সংস্করণ তৈরির প্রস্তাব দেয়, যা রণতরী থেকে উড্ডয়ন করতে পারবে। এ সংস্করণটির নাম ছিল ‘এফ-১৫এন সি ঈগল’।
নৌবাহিনীর তৎকালীন ত্রুটিপূর্ণ ‘এফ-৪ ফ্যান্টম’কে সরিয়ে সেগুলোর জায়গায় নতুন এই সি ঈগল ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। কাগজে-কলমে এ প্রজেক্টটির যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল এবং একসময় মনে হচ্ছিল, এফ-১৫ সত্যিই নৌবাহিনীতে যোগ হতে যাচ্ছে।
ঈগলের চমৎকার ‘থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও’ বা ওজনের তুলনায় ইঞ্জিনের শক্তি এবং এর নকশা দেখে মনে হয়েছিল, এটি এফ-১৪ টমক্যাটের চেয়ে বেশি দ্রুতগতির ও চটপটে হবে।
দামের দিক থেকেও অনেক সাশ্রয়ী ছিল। ১৯৯৮ সালের ডলারের হিসেবে এফ-১৫ এর দাম ছিল ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা এফ-১৪ টমক্যাটের চেয়ে ১ কোটি ডলার কম। তবে এত সম্ভাবনার পরও শেষ পর্যন্ত এ পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ পায়নি।
সহজভাবে বললে, স্থলভিত্তিক ব্যবহারের চেয়ে নৌ-এভিয়েশনে একটি প্লেন কাঠামোর ওপর বেশি চাপ পড়ে। এফ-১৫-কে নৌবাহিনীর উপযোগী করতে গেলে এর মূলে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন আনতে হত। যেমন, এর ল্যান্ডিং গিয়ার বেশি মজবুত, রণতরীতে ল্যান্ড করার জন্য ‘অ্যারেস্টর হুক’ মেকানিজম যোগ এবং রণতরীর অল্প জায়গায় রাখার সুবিধার্থে ভাঁজ করা যায় এমন ডানা বা ‘ফোল্ডিং উইংস’ তৈরি করা।
সমস্যার মূল জায়গাটি ছিল এখানেই, এসব বাড়তি যন্ত্রাংশ যোগ করার ফলে প্লেনটির ওজন আনুমানিক তিন হাজার পাউন্ড বেড়ে যেত, যা এফ-১৫-কে আগের মতো আকর্ষণীয় বা কার্যকর রাখত না।
তবে ‘এফ-১৫’-এর নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথে এটিই যে একমাত্র বাধা ছিল, তা নয়। প্রতিবন্ধকতা আরও ছিল।
ফাইটার নয়, মিশনই ছিল ভুল
‘এফ-১৫’কে খুব সহজেই নৌ-অপারেশনের জন্য উপযোগী করে নেওয়া গেলেও অন্যান্য কিছু সমস্যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন ছিল। ওই সময় মার্কিন সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রয়োজন ছিল ভিন্ন। নৌবাহিনীর এমন একটি প্লেনের প্রয়োজন ছিল, যা সোভিয়েত বোমারু প্লেন ও জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে।
যার মানে, প্লেনটিকে আকারের আকাশ-থেকে-আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য বড় ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে হত। এ সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজাইন টিম ‘এফ-১৫’কে এমনভাবে পরিবর্তনের কথা ভেবেছিল যাতে তা দূরপাল্লার ‘এইএম-৫৪ ফনিক্স’ ক্ষেপণাস্ত্র বহন ও উৎক্ষেপণ করতে পারে।
তবে সমস্যা দেখা দিল ওজনে; এই ক্ষেপণাস্ত্র ও এর আনুষঙ্গিক হার্ডওয়্যার যোগ করলে তা সাধারণ এফ-১৫এ প্লেনের তুলনায় এর ওজন প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড বেড়ে যেত।
এত ওজনের ভারে প্লেনটি তখন আর ক্ষিপ্রগতির ‘সি ঈগল’ থাকত না, বরং অনেকটা থপথপিয়ে চলা ‘হাঁসের’ মতো ভারী ও ধীরগতির হয়ে পড়ত।
প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই এত বেশি বাধা ছিল যে, প্রজেক্টটি আর সামনে এগোতে পারেনি। তবে এ আলোচনার ইতিবাচক দিক হচ্ছে, নৌ-এভিয়েশনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঠিক করতে নতুন এক স্টাডি দল গঠন হয়েছিল।
এ দলটিই পরবর্তী প্রজন্মের নৌ-ফাইটার জেট তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল, যার ফলশ্রুতিতে এসেছে ‘এফ/এ০১৮ সুপার হর্নেট’, যা বোয়িংয়ের তৈরি অন্যতম সেরা যুদ্ধবিমান হিসেবে স্বীকৃত।
রণতরীর ডেক ভর্তি ‘এফ-১৫ ঈগল’ দেখতে হয়ত দারুণ হত। তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী উভয় পক্ষই এমন প্লেন পেয়েছিল যেগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পেরেছে।