Published : 07 Feb 2026, 10:41 AM
বিটকয়েনের দামের দ্রুত ওঠানামা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সব ঘোষণা মিলিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়া এখন আলোচনার তুঙ্গে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে ব্লকচেইন, ইটিএফ, মিম কয়েন ও স্টেবলকয়েনের মতো শব্দ আজও অনেকের কাছে অপরিচিত।
বিবিসি লিখেছে, বিটকয়েনের দাম ৭০ হাজার ডলারের নিচে নেমে যাওয়ায় ক্রিপ্টোকারেন্সির এ জমজমাট দুনিয়া আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এই ডিজিটাল মুদ্রার দাম যখন আকাশছোঁয়া হয় বা একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে তখনই তা সংবাদের শিরোনাম হয়।
তবে পুরো ক্রিপ্টো বাজারটি ইটিএফ, ব্লকচেইন ও স্টেবলকয়েনের মতো নানা জটিল শব্দে ভরপুর, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টিকে কিছুটা গোলমেলে করে তুলতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতির এই গোলমেলে জগতকে সহজভাবে জেনে নেওয়া যাক–
বিটকয়েন
ক্রিপ্টোকারেন্সির সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বুঝতে অনেকের সমস্যা হলেও এর সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম ‘বিটকয়েন’-এর কথা শোনেননি এমন মানুষ কমই আছেন।
বিটকয়েন হচ্ছে এক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা। প্রচলিত বিভিন্ন মুদ্রার মতো বিটকয়েন কোনো কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় না। কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের অধীনে নয় বলে যারা ‘আর্থিক স্বাধীনতা’ চান তাদের কাছে বিটকয়েন বেশ জনপ্রিয়।
তবে এ কারণেই বিটকয়েন অত্যন্ত অস্থিতিশীল। ক্রেতা-বিক্রেতাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে এর দাম হুটহাট আকাশছোঁয়া হয় আবার কখনো ধসে পড়ে। ট্রাম্প একসময় বিটকয়েনকে ‘প্রতারণা’ বা স্ক্যাম বললেও এখন সুর বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ‘ক্রিপ্টো রাজধানী’ বানানোর অঙ্গীকার করেছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিটকয়েনের দাম বহুল প্রতীক্ষিত ১ লাখ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছিল। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যখন মার্কিন রাজনীতিবিদেরা ডিজিটাল সম্পদ নিয়ন্ত্রণের বিল নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওই সময় এর দাম আরও বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছায়।
তবে বিটকয়েনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যত দ্রুত মুদ্রাটি ওপরে ওঠে ঠিক তত দ্রুতই এর পতন ঘটতে পারে। এ বছরের বৃহস্পতিবার বিটকয়েনের দাম ৭০ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায় ও পরে তা আরও কমে ৬৭ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকে। ফলে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিটকয়েন যে বাড়তি দাম পেয়েছিল তার পুরোটাই কার্যত মুছে গেছে।
ব্লকচেইন
ব্লকচেইন হচ্ছে এমন প্রযুক্তি, যা সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এনএফটি’র মতো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
সহজ কথায়, ভার্চুয়াল স্প্রেডশিট বা হিসাবের খাতা ব্লকচেইন, যেখানে ক্রিপ্টো কেনা-বেচার সব তথ্য রেকর্ড হয়। এসব তথ্য একেকটি ‘ব্লক’-এ সাজানো থাকে ও ব্লকগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগ হয়ে বড় আকারের চেইন তৈরি করে। আর এ কারণেই এর নাম ‘ব্লকচেইন’।
ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেন একদল বিশাল স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আলাদাভাবে ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ হয়। কম্পিউটার প্রোগ্রামের সাহায্যে প্রতিটি লেনদেনের সত্যতা যাচাই করেন তারা।
বিটকয়েন নেটওয়ার্কে এ কাজটির পেছনে বিশেষ এক উৎসাহ বা পুরস্কার রয়েছে। যেমন, যিনি সবার আগে এসব লেনদেন যাচাই করতে পারেন পুরস্কার হিসেবে বিটকয়েন পান তিনি। এ লাভজনক প্রক্রিয়াটিকে বলে ‘মাইনিং’।
তবে এ প্রক্রিয়াটি বেশ বিতর্কিত। কারণ বিশ্বের অসংখ্য মানুষ ব্লকচেইন আপডেটের এ প্রতিযোগিতায় নামায় এতে বিস্ময়কর পরিমাণে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি শক্তি খরচ হচ্ছে।

ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ
এক ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, যেখানে বিনিয়োগকারীরা ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা-বেচা ও লেনদেন করতে পারেন। বিষয়টি অনেকটা সাধারণ শেয়ার বাজারের ব্রোকারেজ হাউজের মতো কাজ করে।
এখানে মানুষ পাউন্ড বা ডলারের মতো প্রচলিত মুদ্রা জমা দিয়ে তার বিনিময়ে বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারেন।
সাধারণত প্রতিটি লেনদেনের জন্য এক্সচেঞ্জগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি বা চার্জ নিয়ে থাকে।
ক্রিপ্টো ওয়ালেট
ক্রিপ্টো ওয়ালেট এমন এক জায়গা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা তাদের ক্রিপ্টোকারেন্সি জমা রাখেন। ‘হট ওয়ালেট’ ও ‘কোল্ড ওয়ালেট’ নামের দুই ধরনের হয় ক্রিপ্টো ওয়ালেট রয়েছে।
হট ওয়ালেট ইন্টারনেটের সঙ্গে যোগ থাকে, যা দ্রুত লেনদেনের জন্য ও সহজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ সুবিধাজনক।
অন্যদিকে, কোল্ড ওয়ালেট হচ্ছে ফিজিকাল ডিভাইস, যেমন বিশেষভাবে তৈরি ইউএসবি স্টিক, যা ক্রিপ্টোকারেন্সি অফলাইনে জমা রাখে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও বাড়তি নিরাপত্তার জন্য এ ওয়ালেটের ব্যবহার হয়।
ইথেরিয়াম
ইথেরিয়াম শব্দটি দিয়ে মূলত দুটি বিষয়কে বোঝানো হয়। একটি, বিটকয়েনের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি, যার টোকেনের নাম ‘ইথার’। দ্বিতীয়টি এর পেছনের মূল প্রযুক্তি বা ব্লকচেইন। এ ব্লকচেইনটি বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ ও ডিজিটাল সম্পদ বা এনএফটি তৈরির কাজ সমর্থন করে।
বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মতোই কাজ করে ইথেরিয়াম। ২০২২ সালে ইথেরিয়াম পরিবেশবান্ধব অপারেটিং সিস্টেমে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে মুদ্রাটি চালাতে এখন আগের তুলনায় অনেক কম কম্পিউটার ও বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয়।
ইটিএফ
ইটিএফ হলো এক ধরনের বিনিয়োগের প্যাকেট। ধরা যাক, কেউ একজন আলাদা আলাদা করে সোনা, রূপা বা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনতে চান না। এমন লোকদের জন্য একসঙ্গে অনেক কিছুর ওপর বিনিয়োগের সুযোগ দেয় ইটিএফ। এটি শেয়ার বাজারে শেয়ারের মতোই কেনা-বেচা হয়।
ইটিএফের দাম বাড়ে বা কমে ভেতরে থাকা সব কিছুর মোট ফলাফলের ওপর। যেমন, কোনো ইটিএফে যদি সোনা আর রূপা থাকে, তাহলে সোনা-রূপার দাম বাড়লে ওই ইটিএফের দামও বাড়তে পারে।
স্পট বিটকয়েন ইটিএফ
স্পট বিটকয়েন ইটিএফ সরাসরি বিটকয়েন কেনে। মানে, সেই সময়ের বাজারদরে বিটকয়েন কিনে রাখে। দিনভর বিটকয়েনের দাম ওঠানামা করলে ইটিএফের দামও সঙ্গে সঙ্গে বদলায়।
এর আগে কিছু ইটিএফে ঘুরপথে বিটকয়েনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিটকয়েন কেনা-বেচা করা যায় এমন কয়েকটি স্পট বিটকয়েন ইটিএফ অনুমোদন দিয়েছে।
এর ফলে বড় বড় বিনিয়োগ কোম্পানি, যেমন ব্ল্যাকরক বা ফিডেলিটি, এখন সহজে বিটকয়েনে বিনিয়োগ করতে পারছে। তাদের আর আলাদা ডিজিটাল ওয়ালেট খোলা বা জটিল ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বোঝার দরকার হচ্ছে না। শেয়ার বাজারের নিয়মেই তারা বিটকয়েনে টাকা খাটাতে পারছে।
মিম কয়েন
মিম কয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সি আগ্রহ ও অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি ও ব্যবহৃত হয়। এগুলো সাধারণত সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড বা ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ‘মিম’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যেমন ইন্টারনেটে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ‘মু ডেং’-এর নামে তৈরি মিম কয়েন।
তবে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রকৃতি ও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত বিভিন্ন মিম কয়েন। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর মান বা দাম বাড়ার সম্ভাবনা খুব একটা থাকে না।
এগুলো প্রায়ই ‘রাগ পুল’ নামের জালিয়াতির শিকার হতে পারে। এ এমন এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সির উদ্যোক্তারা প্রথমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে কয়েনের দাম বাড়িয়ে দেন এবং এরপর হঠাৎ করেই সব লেনদেন বন্ধ করে দিয়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে চম্পট দেয়।
নিজেদের মিম কয়েন বাজারে ছেড়ে পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন অনেক সেলিব্রিটি বা তারকা।
স্টেবলকয়েন
‘স্টেবল’ মানে স্থিতিশীল। এটিও এক ধরনের ক্রিপ্টোমুদ্রা। তবে অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার চেয়ে আলাদা। কারণ এগুলোর উদ্দেশ্য দামের অস্থিরতা বা ওঠানামা কমিয়ে রাখা।
মুদ্রাটি সাধারণত কাজ করে কোনো এক প্রচলিত সম্পদের সঙ্গে দামের সংযোগ রেখে, যেমন ডলার বা ব্রিটিশ পাউন্ডের মতো মুদ্রা। যেসব ক্রিপ্টোকারেন্সির পেছনে কোনো বাস্তব সম্পদ নেই সেগুলোর তুলনায় স্টেবলকয়েনের দাম অনেক স্থিতিশীল হওয়ার কথা।
সরবরাহকারী নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় স্টেবলকয়েন এবং এদের লেনদেন ডিজিটাল লেজার বা খাতায় রেকর্ড হয়।
কেউ কেউ একে আগামীর ‘ভবিষ্যত অর্থব্যবস্থা’ হিসেবে দেখলেও বেশ কিছু বড় স্টেবলকয়েনের দামের আকস্মিক পতন সতর্ক করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে। ফলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ও এ মুদ্রার প্রচলিত ‘স্থিতিশীলতা’ নিয়ে নতুন করে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নজরদারি চলছে।