Published : 21 May 2026, 11:37 AM
বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ও বহুল ব্যবহৃত ফসল তুলার প্রাচীন ইতিহাস উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। মায়া সভ্যতারও হাজার বছর আগে মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে প্রথম এ তুলার চাষ শুরু হয়েছিল বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
আরামদায়ক ও টেকসই হওয়ার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই কাপড় ও অন্যান্য জিনিস তৈরিতে তুলা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাণিজ্যিকভাবে চার প্রজাতির তুলা চাষ করা হলেও একটি প্রজাতিরই আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, যা বিশ্বের মোট তুলা উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বিজ্ঞানীরা এখন জিনগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ‘গসিপিয়াম হিরসুটাম’ বা ‘আপল্যান্ড কটন’ প্রজাতির তুলার চাষযোগ্য ও গৃহে ব্যবহার্য হয়ে ওঠার ইতিহাস উন্মোচন করেছেন।
তারা বলছেন, মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রথম এ তুলার চাষ শুরু হয়েছিল। ওই সময়ে এ অঞ্চলে প্রস্তর যুগের কৃষকরা বসবাস করেছে, যারও অনেক পরে সেখানে সুপরিচিত মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।
‘আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি’র উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও বিবর্তন-জীববিজ্ঞানী জোনাথন ওয়েন্ডেল বলছেন, তুলা চাষের এ সূচনা অন্তত চার হাজার বছর আগে বা সম্ভবত সাত হাজার বছর আগে হয়েছিল।
গবেষকরা চাষযোগ্য তুলার জিনোমের সঙ্গে ইউকাতান, ফ্লোরিডা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ পুয়ের্তো রিকো ও গুয়াদেলুপে পাওয়া বুনো তুলার জিনোমের তুলনা করে ঠিক কোন জায়গায় প্রথম এর চাষ শুরু হয়েছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, চাষযোগ্য এ প্রজাতিটির সঙ্গে ইউকাতানের বুনো তুলার বেশি মিল রয়েছে।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ওয়েন্ডেল বলেছেন, “বুনো তুলা গাছগুলো সাধারণত শক্ত কাঠের ও বহু শাখাবিশিষ্ট ঝোপঝাড় বা ছোট আকৃতির গাছ হয়, যা দীর্ঘকাল বাঁচে। চাষ করা তুলার তুলনায় এগুলোতে ফুল বেশ কম ফোটে এবং এর ফুল, ফল ও বীজ আকারে অনেক ছোট হয়।”
সোমবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ।
ওয়েন্ডেল বলেছেন, “প্রাচীনকালের কোনো মানবগোষ্ঠী নিশ্চয়ই এ বুনো তুলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।” আর তাদের সেই আগ্রহই তুলা চাষের প্রক্রিয়াটি শুরু করেছিল, যা হাজার বছরের ধীর ও ক্রমান্বয় উন্নতির মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক রূপ ধারণ করেছে।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি’র জিনবিজ্ঞানী ও বিবর্তন-জীববিজ্ঞানী করিন গ্রোভার বলেছেন, “প্রাচীনকালের কৃষকেরা নরম উপাদানের উৎস হিসেবে তুলার এ ছড়ানো-ছিটানো গাছ ও এর আঁশওয়ালা বীজের সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন। আদিম যুগের তাঁতিরা হাত দিয়েই এই আঁশ থেকে সুতা তৈরি করতে পারতেন এবং তা দিয়ে কাপড়, মাছ ধরার জাল, দড়ি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস বুনতেন।”
১৬ শতাব্দীতে আমেরিকায় স্প্যানিশ বিজয়ের পর এ তুলা বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে পরিচিত হয়। বর্তমানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের শীর্ষ তুলা উৎপাদনকারী দেশ।
গ্রোভার বলেছেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, বুনো গাছের খাটো, খসখসে ও বাদামী রঙের আঁশকে আজকের এ চমৎকার, সাদা এবং উন্নত মানের টেক্সটাইলে রূপান্তরের পেছনে জটিল এক মেলবন্ধনের মতো বহু জিনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
ওয়েন্ডেল বলেছেন, “এসব আঁশ এককোষী বীজের লোম মাত্র। তবে উদ্ভিদের জগতে এগুলো অন্যতম চমৎকার ও অসাধারণ কোষ।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, চাষযোগ্য তুলা গাছের জিনগত বৈচিত্র্য, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈশিষ্ট্যের যে ভিন্নতা থাকে তার বুনো সমকক্ষ বা বুনো প্রজাতির তুলনায় কম। জিনগত বৈচিত্র্য কম হলে কোনো প্রজাতির পরিবেশগত পরিবর্তন, যেমন বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
গ্রোভার বলেছেন, “আমরা জানি, কৃত্রিম উপায়ে চাষাবাদের কারণে প্রায়শই জিনগত বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। কারণ, প্রাচীন কৃষকরা কেবল তাদের প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যই বেছে নিতেন। পরবর্তীতে ফসলের মান আরও উন্নত করার জন্য আরও নিখুঁতভাবে বাছাই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে এ বৈচিত্র্য আরও কমে যায়।
“এ গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখেছি, তুলার জিনোমের ওপর এর বৈশ্বিক প্রভাব কেমন এবং বুনো প্রকৃতিতে এখনও যে বৈচিত্র্য রয়ে গেছে তার সঙ্গে এর পার্থক্য কতটুকু। আর বুনো প্রজাতির এ বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ।
“কারণ, অনিচ্ছাকৃতভাবে হারিয়ে যাওয়া কিছু বৈশিষ্ট্য, যেমন নির্দিষ্ট কোনো পোকা-মাকড় প্রতিরোধ সক্ষমতা আমাদের আধুনিক জাতের তুলাগুলোতে নতুন করে যোগ করার ক্ষেত্রে দারুণ কাজে আসতে পারে।”
তুলার আরেকটি প্রজাতির নাম ‘গসিপিয়াম বারবাডেন্স’ বা ‘এক্সট্রা-লং স্টেপল কটন’, যা ‘আপল্যান্ড কটন’-এর প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমেরিকার পেরু বা একুয়েডরে চাষযোগ্য করে তোলা হয়েছিল। বর্তমানে এটি বিশ্বের মোট তুলা উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
বাকি উৎপাদন আসে অন্য দুটি প্রজাতি থেকে, যার একটি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা ‘গসিপিয়াম আর্বোরিয়াম’ এবং অন্যটি সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপ থেকে আসা ‘গসিপিয়াম হার্বাসিয়াম’।
তুলা উৎপাদনের পরিমাণ ফ্ল্যাক্স বা তিসি, পাট ও হেম্পের বা গাঁজা জাতীয় গাছ থেকে প্রাপ্ত আঁশের মতো অন্যান্য আঁশজাতীয় ফসলের চেয়ে বেশি।
গ্রোভার বলেছেন, “বছরের ওপর ভিত্তি করে তুলার চাহিদা কিছুটা কম-বেশি হলেও এর সার্বিক চাহিদা সবসময়ই চড়া থাকে এবং তা দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী বলেই মনে হচ্ছে।”
১৮ শতকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘কটন জিন’ নামের এক যন্ত্রের আবিষ্কার হয়, যা তুলার আঁশ থেকে বীজ আলাদা করার কাজটিকে স্বয়ংক্রিয় করে তোলে। যন্ত্রটি তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণের গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং তুলা চাষকে লাভজনক করে তোলে।
এ মূল্যবান ফসল রোপণ, তোলা ও কাটার জন্য অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হওয়ায় তা তৎকালীন দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিস্তারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
গ্রোভার বলেছেন, “তুলার জটিল ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম দাসপ্রথা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে তুলা এমন দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী ফসল, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে।”