এ মন্দার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ব্যাঘাতসহ বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
Published : 04 Mar 2025, 05:12 PM
অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর গলে যাওয়ার ফলে ধীর হয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সমুদ্রের স্রোত– এমনই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সমুদ্রের স্রোত হিসেবে পরিচিত ‘অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার কারেন্ট’ বা সংক্ষেপে এসিসি। এ স্রোতকেই অ্যান্টার্কটিকার গলে যাওয়া বরফ ধীর করে দিচ্ছে।
এ মন্দার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ব্যাঘাতসহ বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
কেন এমন হচ্ছে?
‘ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন’ ও নরওয়েজিয়ান গবেষণা কেন্দ্র ‘নরস’-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেশি থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার স্রোতের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বরফের চাদর গলে দক্ষিণ মহাসাগরে অনেক পরিমাণে মিঠা পানি বয়ে চলেছে। ফলে পরিবর্তন ঘটচ্ছে সমুদ্রের লবণের মাত্রা ও ঘনত্বের, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে সমুদ্র স্রোতের প্রবাহের ওপর।
উচ্চ-রেজোলিউশনের জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও বাতাসের ধরন কীভাবে সমুদ্রের স্রোতকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার স্রোত দুর্বল হয়ে পড়লে এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আরও চরম মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনা ঘটাতে পারে এবং সমুদ্রের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের সক্ষমতা কমিয়ে আনতে পারে। এতে বাড়তে পারে বৈশ্বিক উষ্ণতাও।
উপসাগরীয় স্রোত প্রবাহের চেয়ে চারগুণ শক্তিশালী অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার স্রোত এবং গোটা বিশ্বে সমুদ্রের পানি সঞ্চালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি।
গবেষকরা বলছেন, আটলান্টিক মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে তাপ, কার্বন ডাই অক্সাইড ও পুষ্টি পরিবহন করে এই স্রোত।
এ স্রোতের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে বাধা হিসেবে কাজ করা, যা ক্ষতিকর বিভিন্ন প্রজাতিকে বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের ক্যাল্প, চিংড়ি ও মলাস্ককে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছাতে বাধা দেওয়া।
এ স্রোত দুর্বল হয়ে পড়লে এসব প্রজাতি অ্যান্টার্কটিকার বাস্তুতন্ত্রে আক্রমণ করতে পারে, যা পেঙ্গুইন ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য সরবরাহকে প্রভাবিত করবে, বলছেন গবেষকরা।
এ গবেষণায় জলবায়ু মডেল পরিচালনার জন্য ‘জিএডিআই’ নামের অস্ট্রেলিয়ার দ্রুততম সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানীরা। যার ফলাফল বলছে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলতে থাকলে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমে গেলেও গতি ধীর হয়ে যাবে এ স্রোতের।
গবেষক ও জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. তাইমুর সোহেল বলেছেন, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়াকে প্রাক-শিল্প স্তরের ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা।
তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এরইমধ্যে আমরা তাপমাত্রার এই সীমায় পৌঁছে গেছি এবং তাপমাত্রা আরও বাড়তেই থাকবে।
“আমরা যত বেশি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটতে দেব, তত বেশি অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলবে, যা এ স্রোতের গতি আরও কমিয়ে দেবে। এই মন্দা ঠেকাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেছেন ড. সোহেল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স’-এ।