মেটার স্মার্ট চশমায় ধারণ করা ‘আপত্তিকর’ দৃশ্য দেখতে হয়েছে তাদের
ওই কোম্পানির কর্মীরা দুটি সুইডিশ সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, স্মার্ট চশমা ব্যবহারকারীরা টয়লেটে যাচ্ছেন ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের দৃশ্যও তাদের দেখতে হয়েছে।
স্মার্ট চশমার মাধ্যমে ধারণ করা ‘ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর’ ভিডিও কাজের অংশ হিসাবে দেখতে হয়েছ। এর প্রতিবাদ করায় কাজ হারিয়েছেন মেটায় এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া কেনিয়াভিত্তিক এক কোম্পানির এক হাজারের বেশি কর্মী।
এ ঘটনায় এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া ‘সামা’ নামের ওই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা। প্রাইভেসি লঙ্ঘন ও প্রতিহিংসামূলক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ ঘিরেই শুরু হয়েছে এ তোলপাড়।
বিবিসি লিখেছে, কেন কোম্পানিটি এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া ওই কোম্পানির সঙ্গে বড় চুক্তি বাতিল করেছে সেই ব্যাখ্যা নিয়ে বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে সামাজিক যোগাযোক মাধ্যম জায়ান্টটি।
কেনিয়াভিত্তিক কিছু কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা মেটার স্মার্ট চশমায় ধারণ করা ‘আপত্তিকর ও গ্রাফিক ভিডিও’ দেখতে বাধ্য হয়েছেন। এ ঘটনার পরই কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে মেটা।
গেল ফেব্রুয়ারিতে সামা কোম্পানির কর্মীরা দুটি সুইডিশ সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, চশমা ব্যবহারকারীরা টয়লেটে যাচ্ছেন বা শারীরিক সম্পর্ক করছেন এমন দৃশ্যও তাদের দেখতে হয়েছে।
এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সামার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে মেটা। সামা বলেছে, এর ফলে ১ হাজার ১০৮ জন কর্মী ছাঁটাইয়ের শিকার হবেন।
মেটার দাবি, সামা তাদের কাজের মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সামা এ সমালোচনা মানতে নারাজ। কেনিয়ার এক শ্রমিক সংগঠন অভিযোগ করেছে, কর্মীরা প্রতিবাদ করায় এবং এসব তথ্য ফাঁস করে দেওয়ায় মেটা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেটা।
তবে এক বিবৃতিতে মেটা বলেছে, “সামা আমাদের মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অন্যদিকে, সামা তাদের কাজের মান ও সক্ষমতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
এক বিবৃতিতে সামা বলেছে, “সামা ধারাবাহিকভাবে মেটাসহ আমাদের সকল ক্লায়েন্টের প্রয়োজনীয় অপারেশনাল, নিরাপত্তা ও মানের মানদণ্ড বজায় রেখে এসেছে।
“কোনো সময়েই আমাদের জানানো হয়নি, আমরা সেই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আমাদের কাজের মান ও সততার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছি।”
‘নগ্ন দেহ’
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে সুইডিশ সংবাদপত্র ‘সভেনস্কা দাগব্লাডেট’ ও ‘গোটেবর্গস-পোস্টেন’ এক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়, যাদের মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে ধারণ করা ভিডিও যাচাইয়ের কাজ দেওয়া হয়েছিল।
একজন কর্মী বলেছেন, “আমরা লিভিং রুম থেকে শুরু করে নগ্ন দেহ পর্যন্ত সবকিছুই দেখি।”
এ প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় মেটা স্বীকার করেছিল, ব্যবহারকারীরা যখন মেটা এআইয়ের সঙ্গে কোনো কিছু শেয়ার করেন তখন সাব-কন্ট্রাক্টে থাকা কর্মীরা মাঝেমধ্যে সেসব ভিডিও পর্যালোচনা করতে পারেন।
মেটা বলেছে, বিষয়টি গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে করা এবং অন্যান্য কোম্পানিতেও এমন ঘটনা সাধারণ এক প্রক্রিয়া। তবে এসব তথ্য সামনে আসার পর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।
সুইডিশ সংবামাদ্যম সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই যুক্তরাজ্যের ডেটা সুরক্ষা সংস্থা ‘ইনফরমেশন কমিশনার্স অফিস’ বা আইসিও এ প্রতিবেদনটিকে ‘উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে মেটাকে চিঠি দিয়েছে।
এ স্মার্ট চশমার মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রাইভেসি লঙ্ঘনের আশঙ্কায় তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে কেনিয়ার ডেটা প্রোটেকশন কমিশনারের কার্যালয়ও।
কর্মী ছাঁটাইয়ের খবরের প্রতিক্রিয়ায় মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, “গেল মাসে আমরা সামার সঙ্গে আমাদের কাজ স্থগিত রেখেছিলাম। এ সময় আমরা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছিলাম।
“আমরা এসব বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে নেই। ব্যবহারকারীদের ছবি ও ভিডিওগুলো একান্তই ব্যক্তিগত। পণ্যের মানোন্নয়নের জন্য মানুষ দিয়ে এআই কনটেন্ট যাচাই করা এবং এর জন্য আমরা ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে স্পষ্ট সম্মতি নিয়ে থাকি।”
‘প্রাইভেসির মানদণ্ড’
গেল সেপ্টেম্বরে রে-ব্যান এবং ওকলি ব্র্যান্ডের সঙ্গে পার্টনারশিপে একগুচ্ছ এআইচালিত চশমা বাজারে আনে মেটা।
এ চশমার ফিচারের মধ্যে রয়েছে টেক্সট অনুবাদ বা ব্যবহারকারী কী দেখছেন সে সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো বিষয়, যা অন্ধ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। তবে এসব ডিভাইস যত জনপ্রিয় হচ্ছে সেগুলোর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে।
সুইডিশ সংবাদপত্রের সঙ্গে কথা বলা কর্মীরা ছিলেন ‘ডেটা অ্যানোটেটর’। তারা বিভিন্ন ছবি হাতে-কলমে লেবেলিংয়ের মাধ্যমে মেটার এআইকে ছবি চিনতে সাহায্য করতেন।
কর্মীরা বলেছেন, তারা এআইয়ের সঙ্গে মানুষের আলাপের প্রতিলিপিও পর্যালোচনা করতেন, যাতে এআই বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রতিবেদনে এক কর্মী বলেছেন, একটি ঘটনায় দেখা গেছে, এক ব্যক্তির চশমা বেডরুমে রেকর্ডিং মোডে চালু ছিল। পরে সেখানে একজন নারীর (সম্ভবত ওই ব্যক্তির স্ত্রী) পোশাক পরিবর্তনের দৃশ্য রেকর্ড হয়ে যায়।
মেটার চশমার ফ্রেমের এক কোণে ছোট একটি লাইট থাকে, যা ক্যামেরা রেকর্ডিংয়ের সময় জ্বলে ওঠে। তবে এ চশমার অপব্যবহার ও কেনিয়ায় নারীদের সম্মতি ছাড়াই গোপনে ভিডিও ধারণ করার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে এর যোগসূত্র মিলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সদর দপ্তরে অবস্থিত আউটসোর্সিং কোম্পানি সামা অলাভজনক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিখাতে কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা। বর্তমানে ‘নৈতিক’ বি-কর্প হিসেবে পরিচিত কোম্পানিটি।
তবে মেটার সঙ্গে সামার চুক্তিতে তিক্ততা তৈরি হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ফেইসবুকের পোস্ট মডারেট বা যাচাইয়ের এক চুক্তিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
ওই সময় সাবেক কর্মীদের আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, তাদের বীভৎস ও মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক ভিডিও দেখতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে সামা বলেছিল, তারা সেই কাজটি করার জন্য অনুতপ্ত।
‘আফ্রিকা টেক ওয়ার্কার্স মুভমেন্ট’ এর নাফতালি ওয়ামবালো ওই মামলায় চলমান আইনি প্রক্রিয়ার একজন আবেদনকারী। তিনি বলেছেন, স্মার্ট চশমা চুক্তির সঙ্গে জড়িত কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি।
ওয়ামবালো বলেছেন, মেটার এ কাজ বন্ধের আসল কারণ স্মার্ট চশমায় ধারণ করা কনটেন্ট যে মাঝেমধ্যে মানুষের মাধ্যমে যাচাই হয় সে বিষয়ে কর্মীরা যেন মুখ না খোলেন।
“আমি মনে করি তারা এখানে যে মানদণ্ডের কথা বলছে তা আসলে প্রাইভেসির মানদণ্ড।”
এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেটা।
